
স্টাফ রিপোর্টার ॥
খুব ব্যস্ত সংসার। স্বামী, চার সন্তান নিয়ে তার সংসার জীবন। সঙ্গে সবজি ক্ষেত, গরুও রয়েছে। ক্ষেতের সবজি গাছ দেখা শোনা, পরিচর্যা, গরুর জন্য ঘাস কাটা, গরুকে খেতে দেয়া, সন্তানদের দেখভাল করা-সবকিছু লাকি বেগমকে করতে হয়। তিনবেলা রান্নাতো আছেই। বেশকিছু দিন ধরে স্বামী সংসারের কোন কাজ করতে পারছেন না। তিনি (স্বামী) অন্য একটি ভালো কাজে ব্যস্ত। গ্রামের-মানুষের জন্য কাজ করছেন তিনি।
একদিন প্রচন্ড গরম। সারাদিনের কাজ শেষ করেছেন। রাতের রান্নাও শেষ। সন্তানদের খাওয়া শেষ করে ঘুম আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। এরমধ্যে রাত ১১ টা বেজে গেছে। তখনও লাকি বেগমের স্বামী বাড়ি আসেননি। তিনি সেই ভালো কাজে ব্যস্ত। ক্লান্ত শরীর ভেঙে যাচ্ছিল ঘুমে। এক সময় তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। রাত ১২ টার দিকে স্বামী এসে তাকে ডেকে তুলে বললেন, ভাইয়েরা চলে গেছে। আমি একা কাজ করছি। চল, আমাকে একটু সাহায্য করবে। কোন কথা না বলে তিনি চলে গেলেন স্বামীর সঙ্গে। গ্যাসলাইটের আলো জ্বালিয়ে স্বামী-স্ত্রী কাজ করে যান মানুষের উপকারের জন্য। রাত ৩টা পর্যন্ত তারা কাজ করেন। এই গল্পটি টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার চকগগাধর গ্রামের গৃহবধূ লাকি বেগমের। আর সে গল্পের নায়ক হলেন তার স্বামী ছইনুদ্দিন। তারা দুজনের কেউ লেখাপড়া করেননি। অথচ তারা গ্রামের মানুষের জন্য মহৎ কাজ করেছেন।
গ্রামের মানুষের যাতায়াতের জন্য কোন রাস্তা ছিল না। ভীষণ কষ্টে ক্ষেতের আইল ধরে প্রায় দেড়-দুই কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ধুনাইল পাকা রাস্তায় উঠে তাদের নাগরপুর যেতে হতো। বৃষ্টি এবং বর্ষার সময় অবস্থা আরো ভয়াবহ হতো। রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হতো তাদের। এ অবস্থা দেখে লাকি বেগমের স্বামী ছইনুদ্দিন চিন্তা করলেন মানুষের উপকার করতে হবে। সেজন্য গ্রামের ভেতর দিয়ে তৈরি করতে হবে রাস্তা। ৫ বছর আগে নিজে একাই কাজ শুরু করেন। এ কাজ করতে গিয়ে লাকি বেগমের সংসার জীবনে তৈরি হয় নানা গল্প। সেই গল্প বলেন লাকি বেগম, স্বামীর পৈত্রিক জমির মাটি এবং রাস্তার সাথের ক্ষেতের মাটি কাইটা কাইটা রাস্তা বানাতে থাকেন। আস্তে আস্তে সংসারের সব কাম পরে আমার উপর। দিনের বেশির ভাগ তিনি রাস্তার কাম করেন। রাতেও বাদ দেন না। সন্ধ্যা থেকে শুরু কইরা রাত ১০/১১ টা পর্যন্ত কামের পর তখন বাড়িতে এসেছিলেন। খাইয়া আবার চলে গিয়েছিল। কখনো রাত ২ টা, কখনো রাত ৩ টা, আবার কখনো ফজরের আজানের আগ দিয়ে বাড়িতে এসছিলো। এমনে কইরা যে কত রাত কাটছে তার হিসাব নেই। প্রায়ই তিনি আমাকে রাতে ডাইকা নিয়ে গ্যাছেন। আমি মাটির টুপড়ি তার মাথায় তুইলা দিতাম। তিনি সেগুলো নিয়া রাস্তায় ফালাইছেন।
এরকম অনেক গল্প তৈরি হয়েছে গত ৫ বছরে। অনেকগুলো লাকি বেগমের মন থেকে হারিয়েও গেছে। তাদের সবার চিন্তা ছিল একটাই-কিভাবে রাস্তার কাজটা শেষ করা যায়। লাকি বেগম টাঙ্গাইল নিউজকে জানান, গ্রামে কত পরিবার, কত মানুষ। অথচ তারা কেউ তার স্বামীর এ কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। উল্টো কেউ কেউ বাধা দিয়েছে, জায়গা দিতে চায় নাই, মাটি কাটতে বাধা দিয়েছে। তাদের অনেক বুঝিয়ে, পায়ে ধরে রাজি করানো হয়েছে। প্রথমদিকে তার স্বামী একাই কাজ করেছেন। পরে তার আরো পাঁচ ভাই তাকে সাহায্য করেছেন। এক ভাই সৌদী প্রবাসী। তিনি টাকা দিয়ে সাহায্য করেছেন। অপর তিন ভাই টাকা ও শ্রম দিয়ে রাস্তা নির্মাণে সহযোগিতা করেছেন।
লাকি বেগম টাঙ্গাইল নিউজকে আরও বলেন, গ্রামের মানুষ আগে অনেক কতা কইছে। তারে (স্বামীরে) কেউ পাগলও কইছে। আমি কিছুই মনে করি নাই। সংসারের কাম বাদ দিয়া সে রাস্তা বানাইছে। তাও আমি খুশি। আমিওতো তার লগে কাম করছি। ম্যালা রাইতেও কাম করছি। আবার কোন কোন দিন রাত ১ টা নাই ২ টা নাই ঘুম থিকা উইঠা রানছি। কাম কইরা তাগো খিদা লাগছে। আমিও মাটি কাটছি। সাতদিনের মইধ্যে পাচদিন রাস্তার কাম করছি। আমি কষ্টরে কষ্ট মনে করি নাই। হেতো (স্বামী) খারাপ কাম করে নাই। মানুষের ভালর জন্য কাম করছে। এহন গ্রামের মানুষের কত আরাম হইছে। তারা এহন খুব খুশি। তাগো খুশিতে আমিও খুশি। অবশ্য এখন একটা চিন্তা আছে, বৃষ্টি আর বর্ষার সময় রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ হয়। আমাগো কাম আমরা করছি। এহন যদি সরকার রাস্তাডারে পাকা কইরা রক্ষার ব্যবস্থা করে তাইলে মানুষের খুব উপকার হইবো।
ছইনুদ্দিনের বড় মেয়ে কলেজছাত্রী ফাহিমা জান্নাত সোনিয়া টাঙ্গাইল নিউজকে বলেন, বাপ-চাচাদের আমরাও সাহায্য করেছি। তাদের খাবার দিয়ে আসা, গরমের মধ্যে পানি, শরবত করে দিয়েছি। তারা রাত ৩ টা পর্যন্তও রাস্তার কাজ করেছেন। আমরা খুব খুশি। কিন্তু রাস্তাটা এখনও পরিপূর্ণতা পায়নি। বর্ষায় রাস্তাটি ডুবে যেতে পারে। একে পরিপূর্ণ করতে এখন পাকা করা খুব জরুরি। আমরা এ কাজটা করতে পারছি না।
লাকি বেগমের স্বামী ছইনুদ্দিন টাঙ্গাইল নিউজকে বলেন, ভালো কাজ করার আকাঙ্খা ছিল আমার। আমি দেখছি, রাস্তা না থাকায় গ্রামের মানুষের কত কষ্ট হইছে। তাই চিন্তা করলাম রাস্তা করমু। প্রথম প্রথম কেউ সাহায্য করলো না। অনেকেই বাধা দিছে। কারো কথা শুনি নাই। ৫ বছর আগে ধুনাইল পাকা রাস্তা থেকে ডান দিকে গ্রামের ভেতরে রাস্তার কাম ধরি। কিছুদূর করার পর জমির মালিকরা বাধা দেয়। অনেক চেষ্টা করেও তাগো রাজি করাতে পারি নাই। এ নিয়া রাতে ঘুম হয় না। পরে অন্য জায়গা দিয়া ঘুরাইয়া আবার কাম শুরু করি। সেখানেও একজন বাধা দেয়। একদিন তার পা ধরে বসে পড়ি। জাগা না দিলে পা ছারুম না। আমার বাপের জাগার কাছ দিয়া গেছে তার জাগা। কোনমতে তারে রাজি করাতে পারি নাই। পরে রাজি হয়, বলে আগে সামনে থেকে কাম ধর, পরে আমার জমিতে কাম করবি। যখন তার জমির কাছে আসছি তখন সে আবার বাধা দেয়। তখন তারে কইলাম, যদি রাস্তা করবার না দেন তাইলে আমাগো জাগা দিয়া আপনারে যাবার দিমু না। আমাগো জাগা ছাড়া সে বাড়ির বাইরে আসতে পারবো না। তারপর সে রাজি হইলো। এমনি কইরা দেড় কিলোমিটার রাস্তা আমরা করি। কিছুদিন আগে কাম শেষ হইছে। অনেক জাগায় ঘাস গজাইছে। আবার অনেক জাগায় মানুষের পা পরতে পরতে গর্তের মতো হইছে। মাটির রাস্তা এ অবস্থায় বেশিদিন টিকবো না। খুব কষ্ট কইরা রাস্তা বানাইছি। এহন রাস্তা পাকা করা দরকার। এটা আমরা পারমু না। সরকারতো কত রাস্তা ঘাট করে। এই রাস্তাডাও যদি কইরা দিতো।
কিছুদিন আগে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কয়েকজন শ্রমিক দেয়া হয়েছিল। তাদের দিয়ে মাটি কেটে রাস্তা কিছু অংশ একটু উচু করা হয়েছে। তারপর ছইনুদ্দিন আবার নিজের পরিবারের লোকজন নিয়ে বাকি কাজ করতে থাকেন।