
কাজল আর্য ॥
আজ ১০ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯৭১ সালে এ দিনেভারতীয় মিত্র বাহিনীর এক ব্যাটালিয়ন ছত্রীসেনা টাঙ্গাইলে অবতরণ করেন। ফলে পাকিস্তানী হানাদারদের মনোবল ভেঙে যায়। ছত্রী সেনাদেরদ্রুত ঢাকার দিকে এগিয়ে যাওয়ায় পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পন এবং আমাদের সার্বিক বিজয় ত্বরান্বিত হয়। ভারতীয় ছত্রীসেনাদের অবতরণ এবং ঢাকার পথে অগ্রযাত্রার সহযোগিতায় ছিলেন কাদেরীয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা।ভারতীয় ছত্রীসেনাদের অবতরণমুক্তিযুদ্ধের বিশেষ টার্নিং পয়েন্ট।স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি করেছেন দাবি এলাকাবাসী। দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায়এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর জেলা প্রশাসন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
১৯৭১ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন মেজরক্যাপ্টেন পিটার (ছদ্দ নাম) বাংলাদেশে আসেন। তার মূল্য উদ্দেশ্য ও কাজ ছিল কাদেরীয়া বাহিনীর নিয়ন্ত্রনাধীন মুক্ত এলাকায় ছত্রীবাহিনীর নামানোর জায়গা নির্ধারণ ও ম্যাপ পয়েন্ট হাইকমান্ডের কাছে পাঠানো। টাঙ্গাইল ময়মনসিংহে হানাদারদের অবস্থান, সামর্থ্য এবং আক্রমনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাদি জানা। এসব বিষয়ে ক্যাপ্টেন পিটার কাদেরীয়া বাহিনীর প্রধান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সাথে আলোচনা করেন। তাদের সহযোগিতায় ছিলেন কাদেরীয়া বাহিনীর ব্রেইন হিসেবে খ্যাত ড. নুরুন নবী এবং বিদেশ মন্ত্রী খ্যাত বাদশা মিয়া মেম্বার প্রমুখ। পরে প্রাথমিকভাবে অবতরনের ৩ টি স্থান নির্ধারণ করা হয়। চলতে থাকে আলোচনা এবং তথ্য্যের আদান প্রদান।
১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর বিকেল থেকে নামতে শুরু করেনমিত্র বাহিনীর সেনারা। ঢাকা-টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ রোডের কালিহাতী উপজেলার পৌলী, মহেলা, মান্দুরিয়া, নিগৈর, দক্ষিণ চামুরিয়া, ফটিকজানী এলাকায় বিমানযোগে প্যারাসুটের মাধ্যমে অবতরণ করেন তাঁরা। সাথে ছিল বিভিন্ন প্রকার অস্ত্রসস্ত্র। তাদের অবতরণেপ্রথমে গ্রামবাসী আতংকিত হয়ে যায়। জয়-বাংলা স্লোগানে ছত্রীসেনারা এলাকাবাসীকে জানান দেন তারা বাংলাদেশের পক্ষে এসেছেন। এক ব্যাটালিয়ন মানে ৮০০ থেকে ১ হাজার প্যারাট্রুপার বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। পৌলী ব্রীজের পূর্ব পাশে নদী তীরবর্তী এলাকায় পজিশন নিয়ে রাতেই তারা হানাদারদের উপর যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ঢাকা ও টাঙ্গাইলমুখী হানাদাররা আর অগ্রসর হতে পারে নি। এখানকার যুদ্ধে বেশ কিছু হানাদার , নিরীহ গ্রামবাসী এবং ছত্রীসেনা মারা যান। ১১ ডিসেম্বর থেকে মিত্রবাহিনী এবং কাদেরীয়া বাহিনীর যোদ্ধারা যৌথভাবে ঢাকা মুখে মার্চ করতে শুরু করেন। এ দিনই কাদেরীয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা টাঙ্গাইলকে হানাদারমুক্ত ঘোষণা করেন।
মহেলা গ্রামের জমির উদ্দিন আমিরী বলেন আমি তখন ১০ বছরের বালক। নিজের চোখে ছত্রীসেনাদের অবতরণ দেখেছি। রাতের থেকে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। বোমা গোলাবারুদের বিকট শব্দ আর আলোর ঝলকে পুরো এলাকা কম্পিত হয়ে যায়। থমকে যায় হানাদারদের টাঙ্গাইল-ঢাকার দিকের যাত্রা। হানাদাররা গ্রামে ঢুকে পড়ে।মুক্তিযুদ্ধের এতো বড় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার এখানে কোন স্মৃতিস্তম্ভ নেই। সরকারের কাছেআমাদের প্রাণের দাবি পৌলী এলাকার যেখানে মিত্রবাহিনী অবতরণ করেছে এবং যুদ্ধ হয়েছে সেখানে স্মৃতিফলক নির্মাণ। যাতে নতুন প্রজন্ম অজানা ইতিহাস জানতে পারে।
হিন্নাইপাড়ার দোকানদার হাসেন আলী (৬০) বলেন ভারতীয় সৈন্যরা যেদিন নামে সেইদিনই পাকিস্তানীদের সাথে তুমুল যুদ্ধ হয়। হানাদাররা আমার বড় বোন, চাচী, চাচাতো বোনসহ আমাদের পরিবারের ৬ জনকে মেরে ফেলে। এছাড়া যুদ্ধে বেশ কিছু হানাদার এবং কয়েকজন ভারতীয় সৈন্যও মারা যায়।
দক্ষিণ চামুরিয়া গ্রামের আবদুল আজিজ (৭০) বলেন আমাদের ক্ষেতখোলায় ভারতের সৈন্যরা তাম্বু (প্যারাসুট) দিয়া ঝুইলা ঝুইলা নামে। একটা উড়ো জাহাজ উপর দিয়া ঘুরলো। আমি নিজের চোখে দেখছি। আমার কাছে সেই যুদ্ধে ব্যবহৃত একটি শেল আছে।মান্দুরিয়া গ্রামের মহির উদ্দিন (৬৫) বলেন আমার বাড়ির সামনে যুদ্ধের গাড়ি পড়ে। যুদ্ধের পর প্যারাসুটের কাপড় দিয়ে অনেক গরিব মানুষ জামা কাপড় এবং লোহা দিয়ে চকি চৌকাট বানায়। আয়নুল হক বলেন দেখি ছাতির মতো কি যেনো পড়তেছে, পরে কাছে গিয়ে দেখি সৈন্য। গ্রামবাসী তাদের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করে।
ভারতীয় মিত্রবাহিনীর অবতরণ ও ভূমিকা প্রসঙ্গে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম বলেন আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে ভারতের অবদান অনস্বীকার্য। আমরা চিরকৃতজ্ঞ। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ ডিসেম্বর আমাদের সহযোগিতায় টাঙ্গাইল-এলেঙ্গার মাঝখানে পৌলী অঞ্চলে ছত্রীসেনারা অবতরণ করেন। পরে সেখানে এবং ঢাকায় অগ্রসরের পথে তুমুল যুদ্ধে হানাদাররা পরাস্ত হয়। এতে হানাদারদের মনোবল একেবারে ভেঙে পড়ে। আমাদের সার্বিক বিজয় তরান্বিত হয়। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ভারতীয় সেনাদেরশক্তি-সামর্থ্যের প্রমাণ হয়েছে এবং বিশে^ তাদের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। কাদের সিদ্দিকী আরো বলেন মুক্তিযদ্ধে ছত্রীসেনাদের অবতরণেরএতো বড় একটি পটভূমি টাঙ্গাইলে। এটাকে স্মরণ করে রাখতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা দরকার। শুনেছি মিত্রবাহিনীর কিছু সদস্য দুই বছর আগে এসে অবতরণের স্থান পরিদর্শন করে গেছেন।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ৩০ জন বীর সেনাসদস্য এবং ৬জন চাকরিরত সেনাসদস্যরা পরিবারসহ ২০২১ সালে স্মৃতিবিজড়িত কালিহাতীতে এসে ছত্রীসেনা অবতরণস্থল পরিদর্শন করেন।
টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক কায়ছারুল ইসলাম বলেন ভারতীয় ছত্রীসেনাদের অবতরণ এবং অবদান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ছত্রীসেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান এবং স্মৃতি রক্ষার্থে এখানে যুদ্ধের ইতিহাস-নামসমেত একটি স্মৃতি ফলক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৫৬ লাখ টাকার একটি প্রকল্প তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।স্মৃতিস্তম্ভটি আরো আগেই নির্মাণ করা দরকার ছিল।