
সোহেল রানা, কালিহাতী ॥
সাবেক মন্ত্রী ও টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনের সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ৬ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে কালিহাতী থানা ঘেরাও ও টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ ও জামালপুর মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। এ সময় মহাসড়কের প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। মঙ্গলবার (৯ জানুয়ারি) দুপুরে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কালিহাতী থানা ঘেরাও ও মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। পরে পুলিশ প্রশাসনের আশ^াসের প্রেক্ষিতে দুই ঘন্টা পর অবরোধ তুলে নিলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়ে আসে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রবিবার নির্বাচনের দিন কালিহাতী উপজেলার নাগবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল কাইয়ুমের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সোমবার থানায় মামলা হয়। সোমবার রাতে এ মামলার এজাহারভুক্ত দু’জনসহ ছয়জনকে আটক করে পুলিশ। তাঁরা সবাই লতিফ সিদ্দিকীর কর্মী ও সমর্থক। আটককৃত অনুসারীদের মুক্তির দাবিতে লতিফ সিদ্দিকী বহু কর্মীসমর্থকদের নিয়ে মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে কালিহাতী থানার সামনে আসেন। এ সময় তিনি আটককৃত কর্মীদের ছেড়ে দিতে বলেন। পুলিশ তাঁদের ছেড়ে না দেওয়ায় লতিফ সিদ্দিকী ও তার কর্মীসমর্থকরা থানার সামনে মহাসড়কে বসে পড়ে অবরোধ শুরু করেন। এ সময় উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে তাঁর কর্মী-সমর্থকরা এসে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন।
লতিফ সিদ্দিকী ও তার কর্মী সমর্থকরা মহাসড়কে বসে প্রতিবাদ জানান এবং গ্রেফতারকৃতদের দ্রুত মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকেন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কালিহাতী থানা পুলিশ ও টাঙ্গাইল পুলিস লাইনস্ থেকে দাঙ্গা পুলিশ ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়। এ সময় টাঙ্গাইল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোঃ শরফুদ্দিনসহ পুলিশের উধ্বর্তন কর্মকর্তারা নবনির্বাচিত এমপি লতিফ সিদ্দিকীকে অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন। জবাবে লতিফ সিদ্দিকী বলেন, যে পর্যন্ত আমার আটককৃত কর্মীদের মুক্তি না দেয়া হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এ অবরোধ চলবেই। নবনির্বাচিত এমপি লতিফ সিদ্দিকী আরও বলেন, আমার কর্মী হাসমত আলীকে বিনা অপরাধে থানায় আটক করে রাখা হয়েছে। এছাড়াও আরও কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। এ সময় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শামীম আল মনছুর আজাদ সিদ্দিকীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীর কালিহাতী থানা ঘেরাও ও মহাসড়ক অবরোধের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন ছোট ভাই কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম। পরে তিনি ঘটনা বিস্তারিত জানেন লতিফ সিদ্দিকীর কাছ থেকে। এরপর কাদের সিদ্দিকী থানার ভিতরে প্রবেশ করে পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনায় বসেন। আলোচনা শেষে কাদের সিদ্দিকী বলেন, পুলিশের সাথে আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যাদের এই মামলার এজাহারে নাম না থাকা আটক চারজন কর্মীকে তাৎক্ষণিক মুক্তি এবং এজাহারে নাম থাকা দুইজন কর্মীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে টাঙ্গাইল আদালতে প্রেরণ করা হবে। এ সিদ্ধান্ত শুনে কাদের সিদ্দিকীর অনুরোধে লতিফ সিদ্দিকী তার কর্মী সমর্থকদের নিয়ে কালিহাতী থানা ও মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।
এসব বিষয়ে কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদার ঠান্ডু বলেন, লতিফ সিদ্দিকী জামাত-বিএনপিকে সাথে নিয়ে কালিহাতীতে অশান্তি করার সৃষ্টি করছে। আমাদের নাগবাড়ী চেয়ারম্যানের বাড়ি ভাংচুর, জেলা পরিষদের সদস্য আয়নালের বাড়ি ভাংচুর, নাগবাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির মাথা ফাটিয়ে দেওয়া এ রকম অসংখ্য ঘটনা ঘটিয়েছে। পরে ইঞ্জিনিয়ার আবদুল কাইয়ুম বিপ্লব বাদী হয়ে থানায় মামলা করলে পুলিশ দোষীদের গ্রেফতার করে। পরে রাস্তা অবরোধ করে যেইটা চরম বেআইনি, সেই চিহ্নিত সন্ত্রাসী আসামী জোর করে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা পুলিশকে ধন্যবাদ জানাই। কারন লতিফ সিদ্দিকী যাই করুক তাঁরা আইনের বাইরে একটুও জানা নাই। আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মী একত্র হয়ে গিয়েছিল তাদেরকে আমরা শান্ত রেখেছিলাম।
এ বিষয়ে কালিহাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ফারুক জানান, রবিবার নির্বাচনের দিন কালিহাতী উপজেলার নাগবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল কাইয়ুমের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা হাসমত আলী একজন এজাহারভুক্ত আসামী। অপরাধ ছাড়া কাউকে আটক করা হয়নি।
টাঙ্গাইল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোঃ শরফুদ্দিন বলেন, বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ৬ জনকে আটক করা হয়। এরা হলেন- বাংড়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান হাসরত আলী, ঘুনী গ্রামের মোহাম্মদ পিন্টু, কোস্তরীপাড়ার মোহাম্মদ খোকা, সাতুটিয়া গ্রামের হৃদয়, রতনগঞ্জ গ্রামের লাট মিয়া ও মনির সওদাগর। এদের মধ্যে ৪ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এজাহারভূক্ত বাকি দুইজন রতনগঞ্জ গ্রামের লাট মিয়া ও মনির সওদাগরকে টাঙ্গাইল আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, লতিফ সিদ্দিকীর মহাসড়ক অবরোধের ফলে মহাসড়কের দুইপাশে কয়েক কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে জনগনের চরম ভোগান্তি হয়েছে। অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁকে অনুরোধ জানিয়েছেন। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।
উল্লেখ্য, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের বহিস্কৃত সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। স্বতন্ত্র (ট্রাক) প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবার তিনি ৭০ হাজার ৯৪০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকার প্রার্থী মোজাহারুল ইসলাম তালুকদার পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৭৫ ভোট পেয়েছেন।