
স্টাফ রিপোর্টার, মির্জাপুর ॥
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায় সরকারি দুটি বালু মহাল থেকে বালি ও মাটি রাতের আধারে বিক্রির মহোৎসব চলছে। জয়দেপুর-বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু রেল সড়কের ৫০ নম্বর সেতুর নিচ দিয়ে বালি ও মাটি ভর্তি ভারি ড্রাম ট্রাক চলাচল করায় সেতুটি ঝুকির মধ্যে পড়েছে বলে জানা গেছে।
বালি মহালের বালি ও মাটি বিক্রির লাখ লাখ টাকা কার পকেটে যাচ্ছে তার সঠিক তথ্য জানা না গেলেও কয়েকজন নিয়ন্ত্রণকারীর নাম শোনা যাচ্ছে। ভূমিদস্যু ও মাটি ব্যবসায়ীরা বালি মহালের লাখ-লাখ টাকার বালি বিক্রি করলেও জেলা ও মির্জাপুর উপজেলা প্রশাসন কিছুই জানেন না। বালি বিক্রির এই মহোৎসব চলছে বংশাই নদীর যোগীরকোফা-রশিদ দেওহাটা ও কদিম দেওহাটা এবং গোড়াই মমিননগর বালি মহালে।
এছাড়া একইভাবে বংশাই নদীর গাড়াইল, ত্রিমোহন ফিরিঙ্গিপাড়া, চাঁনপুর এবং লৌহজং নদীর বাইমহাটী, ইচাইল ও বুধিরপাড়া এলাকায় চলছে বালি ও মাটি লুটের মহোৎসব। অন্যদিকে একইভাবে উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে আবাদী জমির মাটি কেটে অনাবাদী করা হচ্ছে। বেপেরোয়াভাবে মাটি কাটায় শুধু নদী পারের ক্ষতিই হচ্ছে না, জয়দেপুর-বঙ্গবন্ধু সেতু রেল সড়কের ৫০ নম্বর সেতুসহ কয়েকটি সেতু, গ্রামের পাকা রাস্তা, আঞ্চলিক সড়ক ও পরিবেশের মারাতœক ক্ষতি হচ্ছে।
জানা গেছে, মির্জাপুরে বংশাই, লৌহজং ও ধলেশ্বরীর শাখা নদী এ উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত। বংশাই নদীর যোগীরকোফা-রশিদ দেওহাটা ও কদিম দেওহাটা (৪৩ একর) ও গোড়াই মমিননগরে (৮৪ একর) দুটি সরকারি বালি মহাল রয়েছে। এই দুই বালি মহাল থেকে ভূমিদস্যুরা রাতের আধারে ভেকু মেশিন দিয়ে শত শত ট্রাক বালি কেটে নিচ্ছে। বালি মহালের বালি ও মাটি বিক্রির লাখ লাখ টাকা কার পকেটে যাচ্ছে তার সঠিক তথ্য জানা না গেলেও কয়েকজন নিয়ন্ত্রণকারীর নাম জানা গেছে। ভূমিদস্যু ও মাটি ব্যবসায়ীরা বালি মহালের লাখ-লাখ টাকার বালি বিক্রি করলেও জেলা ও মির্জাপুর উপজেলা প্রশাসন কিছুই জানেন না। যাগীরকোফা-রশিদ দেওহাটা ও কদিম দেওহাটা বালি মহালের বালি ভর্তি বড় বড় ড্রাম ট্রাক জয়দেপুর-বঙ্গবন্ধু সেতু রেল সড়কের ৫০ নম্বর সেতুর নিচ দিয়ে চলাচল করায় সেতুটি ঝুকির মধ্যে পড়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া বংশাই নদীর গাড়াইল, ত্রিমোহন ফিরিঙ্গিপাড়া, থলপাড়া এবং লৌহজং নদীর বাইমহাটী, ইচাইল ও বুধিরপাড়া এলাকা থেকেও পার কেটে বালি বিক্রির মহোৎসব চলছে। অন্যদিকে এ উপজেলার পৌরসভা, গোড়াই, আজগানা, বহুরিয়া, বাঁশতৈল, তরফপুর, জামুর্কী, ফতেপুর, মহেড়া, লতিফপুর, ভাওড়া, উয়ার্শী, ভাতগ্রাম, আনাইতারা, বানাইল ইউনিয়নে অর্ধশতাধিক ভেকু মেশিন দিয়ে টিলার লাল মাটি, আবাদী জমি ও নদীর পার কেটে মাটি বিক্রির চিত্র দেখা গেছে। এসব মাটি পরিবহনে প্রতিদিন রাতে বিভিন্ন সড়কে চার শতাধিক ড্রাম ট্রাক চলাচল করছে। এতে শুধু নদী পার ও পাহাড়ি এলাকার ক্ষতিই হচ্ছে না, কয়েকটি সেতু, গ্রামের পাকা রাস্তা, আঞ্চলিক সড়ক ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যোগীরকোফা-রশিদ দেওহাটা ও কদিম দেওহাটা বালি মহালে স্থানীয় মাটি ব্যবসায়ী শাজাহান মিয়া নামে এক ব্যক্তি দীর্ঘ দুই যুগ ধরে বালি ও মাটি বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। এ বছরও তিনি বালি ও মাটি বিক্রি শুরু করেছেন। ৫টি ভেকু মেশিন দিয়ে প্রতিদিন রাতে ৩০০ থেকে ৪০০ বড় ড্রাম ট্রাক বালি বিক্রি করে থাকেন। প্রতি ড্রাম ট্রাক বালি ১৬০০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। ১৬০০ টাকা দরে প্রতিদিন ৩০০ ট্রাক মাটির দাম ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। প্রতি মাসে এক কোটি ৪৪ লাখ টাকা। প্রতি বছর তিন থেকে চার মাস এই বালি ও মাটি বিক্রির মহোৎসব চলে। একইভাবে বংশাই নদীর গোড়াই মমিননগর বালি মহালে রাতের আধারে বালি বিক্রির মহোৎসব চলছে। এই বালি মহালে জুবায়ের হোসেন, কাজল ও শাহ আলম বালি ও মাটি বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করছেন। এছাড়া লতিফপুর ইউনিয়নের চাঁনপুর এলাকায় তালেব, লিটন, জুলহাস, কাজল, দেওয়ান রাজীব, শাহিনুর মাটি কেটে রাতের আধারে বিক্রি করছেন। ভূমিদস্যুদের ভয়ে এলাকার মানুষ কোন প্রতিবাদ করতে পারছেন না।
প্রশাসনের নাকের ডগায় উপজেলা পরিষদের ৫০০ গজ দূরে পাহাড়পুর সেতুর পাশে লৌহজং নদীর পার কেটে নিচ্ছে উপজেলা তাঁতী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছানোয়ার হোসেন। পাশের বাড়ির মালিক লাভলু মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, নেতা ছানোয়ার আমার বাড়ির সীমানা ঘেঁষে মাটি কাটতাছেন। বৃষ্টির দিনে আমার বাড়ি যেকোন সময় নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। দেওহাটা তেলিপাড়া এলাকার মাটি ব্যবসায়ী শাজাহান মিয়া জানান, রাতে মাটি কেটে পরিবহন করা হয়। পরের দিন সন্ধ্যায় আমি হিসেব নিয়ে থাকি। যেখান থেকে মাটি কাটা হচ্ছে ওই জমি রেকর্ডীয় মালিকানা ভূমি।
মির্জাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার পাল জানান, এ উপজেলায় ২৮ হাজার হেক্টর আবাদী জমি রয়েছে। এ উপজেলার উৎপাদিত ধান মির্জাপুুর ছাড়াও বাসাইল, সখিপুর ও দেলদুয়ার উপজেলার খাদ্য ঘাটতি মেটাতে সক্ষম। যেভাবে কৃষিজমির মাটি ইটভাটায় নেয়া হচ্ছে এ ধারা অব্যাহত থাকলে এ উপজেলায় কৃষিতে বিপর্যয় নেমে আসবে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন বলে জানান তিনি।
রেলওয়ের পাকশীর বিভাগীয় প্রকৌশলী বীরবন মন্ডলের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে রেলের সম্পদ দেখভালের দায়িত্ব সকল নাগরিকের উল্লেখ করে বলেন, রেল সড়কের সেতুর নিচ দিয়ে যান চলাচলের সুযোগ নেই। মির্জাপুুরের রশিদ দেওহাটা এলাকায় রেল সড়কের দুই পাশে প্রায় এক কিলোমিটার রেলের জমির ওপর দিয়ে রাস্তা বানিয়ে ৫০ নম্বর সেতুর নিচ দিয়ে মাটি ভর্তি ড্রাম ট্রাক চলাচল করে থাকে। মাটি ভর্তি বড় বড় ড্রাম ট্রাক চলাচল করায় যে কোন সময় পিলারে ধাক্কা লাগতে পারে। এতে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে শত শত যাত্রীর প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। তিনটি স্লিপার পুতে রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাকিলা বিনতে মতিন বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান চালিয়ে কয়েকজন মাটি ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক কায়ছারুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, মির্জাপুরে বালি মহাল ও আবাদী জমির মাটি কাটার বিষয়ে জানা নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।