
স্টাফ রিপোর্টার, মির্জাপুর ॥
জয়দেবপুর-বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু রেল সংযোগ সড়কের ৫০ নম্বর সেতু রক্ষায় রেলওয়ে বিভাগ স্লিপার পুতে রাস্তা বন্ধ ও বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েও বন্ধ হচ্ছে না অবৈধভাবে মাটি পরিবহন। সেতুটি রক্ষার্থে রেলওয়ের পাকশী বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ বীরবল মন্ডল ও জয়দেবপুরের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী এম রিয়াসাদ ইসলাম বিভিন্ন দপ্তরে পৃথক অভিযোগ দায়ের করেন। কোন ব্যবস্থা না হওয়ায় সেতুটির নিচ দিয়ে স্লিপার তুলে পূর্বের মতই অভারলোড মাটি ভর্তি ভাড়ি ডাম্প ট্রাক চলাচল অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে কি!
জানা গেছে, মির্জাপুর উপজেলার বংশাই নদীর যোগীরকোফা-রশিদ দেওহাটা-কদিম দেওহাটা এলাকায় প্রায় ৪৩ একর ভূমিতে সরকারি বালু মহাল রয়েছে। ভূমিদস্যু একটি চক্র প্রতি বছর ওই বালু মহাল থেকে রাতের আধারে লাখ লাখ টাকার বালু লুট করে বিক্রি করে থাকে। এ বছরও চক্রটি রাতের আধারে বালু লুট করে বিক্রি শুরু করেছে। বালু ভর্তি শত শত অভারলোডের ভাড়ি ডাম্প ট্রাক জয়দেপুর-বঙ্গবন্ধু সেতু রেল সড়কের ৫০ নম্বর সেতুর নিচ দিয়ে চলাচল করায় সেতুটি ঝুকির মধ্যে পড়েছে।
সেতুটির ঝুকি এড়াতে রেলওয়ের পাকশী বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ বীরবল মন্ডল রাস্তাটি বন্ধের নির্দেশ দেন। তার নির্দেশে গত (২৭ জানুয়ারি) রেলওয়ের জমিতে তিনটি ইউএস পিএসসি স্লিপার পুতে অবৈধ রাস্তা বন্ধ এবং রাতে আনসার সদস্যদের দিয়ে পাহারার ব্যবস্থা করেন দায়িত্বরত রেলওয়ের ১১ নম্বর গ্যাং মিস্ত্রি মতিয়ার রহমান। গত (৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে মাটি ব্যবসায়ীরা রাস্তা বন্ধের স্লিপার তুলে অবৈধভাবে বালু ভর্তি অভাররোডের ভাড়ি ডাম্প ট্রাক চলাচল অব্যাহত রাখে। আনসার সদস্য ও রেলওয়ের নাইটগার্ড এতে বাধা প্রদান করলে মাটি ব্যবসায়ীরা তাদের নানাভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ডাম্পট্রাক চালানো অব্যাহত রাখে। যার ফলে উক্ত সেত ঝুকির সম্মুখিন হয়েছে। তাছাড়া ট্রেন চলাচলের জন্য নিরাপত্তার হুমকির কারণ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
রেল সড়কের ৫০ নম্বর সেতুর নিচ দিয়ে অবৈধভাবে মাটির ডাম্প ট্রাক চলাচল বন্ধ করতে গত (৫ ফেব্রুয়ারি) জয়দেবপুরের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী এম রিয়াসাদ ইসলাম রেলওয়ের কমলাপুর থানার অফিসার্স ইনচার্জ বরাবর (স্মারক নং-ই/চুরি/এজাহার/জয়দেবপুর/২০০৪) একটি পত্র দেন। এছাড়া রেলওয়ের পাকশী বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ বীরবল মন্ডল একই দিন (স্মারক নং-৫৪.০১.০০০০.৩০৩.০২.০১০.২০২২-২৩) রেলওয়ের ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার, টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার এবং রেলওয়ের পাকশী বিভাগের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা বরাবর লিখিতভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পত্র দেন। পত্রগুলোর অনুলিপি রেলওয়ের বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
গত (৪ ফেব্রুয়ারি) মির্জাপুর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) মাসুদুর রহমান রেল সেতুটি পরিদর্শন করেন। এছাড়া সরকারি বালু মহালে বালু কাটার অপরাধে দুইজনের কাছ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন। অজ্ঞাত কারণে ওই রাত থেকেই আবার বালু কাটা ও রেল সেতুর নিচ দিয়ে মাটি পরিবহন অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যোগীরকোফা বালু মহাল থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক পর্যন্ত দুরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। আবাদী জমির উপর দিয়ে রাস্তা বানিয়ে রেল সেতুর নিচ দিয়ে ভাড়ি ডাম্প ট্রাকে বালু পরিবহন করা হচ্ছে। যোগীরকোফা-রশিদ দেওহাটা ও কদিম দেওহাটা বালু মহালে স্থানীয় মাটি ব্যবসায়ী শাজাহান মিয়া নামে এক ব্যক্তি দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বালু ও মাটি বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। এ বছরও তিনি বালু ও মাটি বিক্রি শুরু করেছেন। প্রতি বছর ৬/৭টি ভেকু মেশিন দিয়ে বালু কাটা হতো। এবার ৪টি ভেকু মেশিন দিয়ে প্রতিদিন রাতে ২৫০ থেকে ৩০০ ডাম্প ট্রাক বালু বিক্রি করছেন তিনি। প্রতি ডাম্প ট্রাক বালু ১৬০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। ১৬০০ টাকা দরে প্রতিদিন ৩০০ ট্রাক মাটির দাম ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। প্রতি মাসে এক কোটি ৪৪ লাখ টাকা। প্রতি বছর এই বালু মহালে তিন থেকে চার মাস বালু ও মাটি বিক্রির মহোৎসব চলে। শাজাহান মিয়া সরকারি বালু মহাল থেকে লাখ লাখ টাকার বালু বিক্রি করে টাকা হাতিয়ে নিলেও রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছকু রশিদ দেওহাটা গ্রামের কয়েকজন জানান, শুনেছি রেল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেছেন। এরপরও মাটি কাটা বন্ধ হয় না। রেল সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে না কি!
বালু ব্যবসায়ী শাজাহান মিয়ার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
রেলওয়ের ১১ নম্বর গ্যাং এর মিস্ত্রি মতিয়ার রহমান বলেন, আনসার সদস্য ও রেলওয়ের নাইটগার্ড স্লিপার তুলার সময় বাধা দিয়েছিলো। কিন্তু মাটি ব্যবসায়ীরা তাদের নানাভাবে হুমকি দিয়ে স্লিপার তুলে মাটির ট্রাক চলাচল শুরু করে। বিষয়টি কর্তপক্ষকে জানানো হয়েছে।
জয়দেবপুরের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী এম রিয়াসাদ ইসলাম বলেন, রেল কর্তৃপক্ষের পুতে রাখা স্লিপার তুলে রেল সেতুর নিচ দিয়ে প্রতিরাতে মাটি ভর্তি ৫০/৬০টন ওজনের ডাম্প ট্রাক চলাচল করছে। এতে সেতুটি ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যে কোন সময় রেল সড়ক ও সেতুর ক্ষতি হয়ে বড় ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি রেলওয়ের কমলাপুর থানার অফিসার্স ইনচার্জ বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানান।
রেলওয়ের পাকশী বিভাগের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।
রেলওয়ের পাকশী বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী বীরবল মন্ডল বলেন, রেলওয়ের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব সকল নাাগরিকের। রেল সেতুর নিচ দিয়ে ভাড়ি ডাম্প ট্রাক চলাচল করায় স্লিপার পুতে রাস্তা বন্ধ এবং আনসার সদস্য দিয়ে পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্লিপার তুলে মাটি পরিবহন করা হচ্ছে এবং আনসার সদস্যদের হুমকিও দেয়া হচ্ছে বলে তিনি শুনেছেন। এ বিষয়ে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
রেলওয়ের ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন, রেলওয়ে কর্তৃৃপক্ষ ক্ষতি সাধনের মামলা করলে আইনী সহায়তা দেয়া হবে।
টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক কায়ছারুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, প্রতিদিন মির্জাপুরে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। রেলওয়ের পত্র এখনও পাননি। তবে পত্র পাওয়া মাত্রই আইনগত প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ নেয়া হবে বলে তিনি জানান।