
সাদ্দাম ইমন ॥
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, গণপরিষদের সাবেক সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য, টাঙ্গাইল জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সভাপতি একুশে পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ জননেতা ফজলুর রহমান খান ফারুক শনিবার (১৯ অক্টোবর) সকালের দিকে টাঙ্গাইল শহরের থানাপাড়ায় নিজ বাসভবনে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে দ্রুত তাকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হলে সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তিনি এক ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং রাজনৈতিক সহকর্মীসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
গত (৫ আগস্ট) শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে টাঙ্গাইল থানায় দায়েরকৃত দুটি মামলায় তাকে আসামী করা হয়েছিল। তার একমাত্র ছেলে টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য।
ফজলুর রহমান খান ফারুকের ভাগ্নে গণসঙ্গীত শিল্পী এলেন মল্লিক জানান, গত (৫ আগস্ট) শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮০ বছর বয়সী ফজলুর রহমান খান ফারুক টাঙ্গাইল ত্যাগ করেছিলেন। তিনি বাধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত ছিলেন। মাঝে ঢাকার একটি বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কয়েকদিন আগে তাকে টাঙ্গাইল শহরের থানাপাড়া এলাকার নিজ বাসায় আনা হয়। শনিবার (১৯ অক্টোবর) সকালে তার অবস্থার অবনতি হয়। পরে তাকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষনা করেন।
মরহুমের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় গোরস্থান জামে মসজিদে (বেবিস্ট্যান্ড) শনিবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে বাদ আছর ৫টার সময় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। একুশে পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়নি। পরে তাঁকে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় সামাজিক গোরস্থানে সাধারণভাবে দাফন করা হয়।
টাঙ্গাইল পুলিশ বিভাগ সূত্র জানায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতার আন্দোলনে গত (৪ আগস্ট) টাঙ্গাইল শহরের বটতলা এলাকায় মিছিলে গুলি ও হামলার ঘটনা ঘটে। এ হামলায় আহত এক ব্যক্তি বাদি হয়ে গত (৩১ আগস্ট) টাঙ্গাইল সদর থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় ফজলুর রহমান খান ফারুককে প্রধান আসামী করা হয়। এছাড়া টাঙ্গাইলে মওলানা ভাসানীর কবরে শ্রদ্ধা জানাতে এসে বিগত ২০২১ সালের (১৭ নভেম্বর) গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক হামলার শিকার হন। এ ঘটনায় গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাকিল উজ্জামান বাদি হয়ে গত (১ সেপ্টেম্বর) টাঙ্গাইল সদর থানায় আরও একটি মামলা করেন। সেই মামলাতেও ফজলুর রহমান খান ফারুককে আসামী করা হয়।
ফজলুর রহমান খান ফারুক ১৯৬০ সালে ছাত্রলীগের রাজনীতি শুরু করেন। বিগত ১৯৬২ সালে টাঙ্গাইল মহকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৬৫ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। বিগত ১৯৭০ সালে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭০ সালের গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ৬ দফা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণসহ তৎকালীন সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসাবে টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে বাকশাল গঠিত হলে টাঙ্গাইল জেলা বাকশাল এর যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।
বিগত ১৯৮৪ সাল থেকে ২০১৫ সালের (১৭ আক্টাবর) পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বিগত ২০১৭ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের টাঙ্গাইল জেলা শাখার সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। বিগত ১৯৮৬ সালের তৃতীয় ও ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন। তিনি একাধিকবার টাঙ্গাইল জেলা পরিষদের প্রশাসক ও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বিগত ২০২১ সালে একুশে পদক প্রদান করেন। ফজলুর রহমান ফারুক বিগত ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার টাঙ্গাইল প্রতিনিধি, টাঙ্গাইল মহকুমা প্রেসক্লাব এবং টাঙ্গাইল মহকুমা মফস্বল সংবাদদাতা সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি টাঙ্গাইলের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন।