আদালত সংবাদদাতা ॥
টাঙ্গাইলে বহুল আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় দুইজনের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এই মামলার প্রধান আসামী টাঙ্গাইল-৩ আসনের সাবেক এমপি আমানুর রহমান খান রানা ও তার অপর তিন ভাইসহ ১০ জনকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত। রবিবার (২ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে টাঙ্গাইলের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মাহমুদুল হাসান চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার রায় ঘোষনা করেন।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দুইজন হলেন- কবির হোসেন ও মোহাম্মদ আলী। মোহাম্মদ আলী বিগত ২০১৪ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ফারুক হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। তার জবানবন্দিতে এই হত্যার সাথে সাবেক এমপি রানা ও তার তিন ভাইদের জড়িত থাকার বিষয়টি বের হয়ে আসে। রানা জামিনে মুক্ত হওয়ার পর গত (৫ আগস্টের) পর আত্মগোপনে চলে যান। অপর দন্ডিত কবির হোসেন ২০১৪ সাল থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন।
বেকসুর খালাসপ্রাপ্তরা হলেন- সাবেক এমপি আমানুর রহমান খান রানা, তার অপর তিন ভাই টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি, ব্যবসায়ী নেতা জাহিদুর রহমান খান কাকন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পা, সানোয়ার হোসেন সানু, নূরু, বাবু, ফরিদ হোসেন, মাসুদুর রহমান, আলমগীর হোসেন চাঁনে। মামলা চলাকালে দুই আসামী আনিসুল ইসলাম রাজা ও সমির কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। রায় ঘোষনার সময় কারাগার থেকে সহিদুর রহমান খান মুক্তিকে হাজির করা হয়। এছাড়া জামিনে থাকা আসামী বাবু ও নূরু হাজির হন।
ওায় ঘোষনার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সাইদুর রহমান স্বপন বলেন, দন্ডিত দুইজনকে ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে আরো এক বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছে আদালত। খালাসপ্রাপ্ত আসামীদের জন্য তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানান।
রায় ঘোষনার পর নিহত ফারুক আহমেদের ছেলে আহমেদ মজিদ সুমন জানান, মামলা দায়ের থেকে তদন্ত, আদালতে অভিযোগ গঠন, সাক্ষী গ্রহণ বিভিন্ন পর্যায়ে আসামিরা বিচার প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করেছেন। এই মামলার আসামিদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন বিএনপি সমর্থিত আইনজীবী নেতারা। তারা গত (৫ আগস্টের) পর আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এই সব আইন কর্মকর্তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেননি। এর আগেও যারা আসামীদের ভয়ে আইনজীবীরা স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি।
প্রসঙ্গত, বিগত ২০১৩ সালের (১৮ জানুয়ারি) জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদের গুলিবিদ্ধ লাশ তাঁর কলেজপাড়া এলাকার বাসার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর তাঁর স্ত্রী নাহার আহমেদ বাদী হয়ে টাঙ্গাইল সদর থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। বিগত ২০১৪ সালের আগস্টে এই হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আনিসুল ইসলাম রাজা ও মোহাম্মদ আলী নামক দুইজনকে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তাঁরা আদালতে জবানবন্দি দেন। তাঁদের জবানবন্দিতে আওয়ামী দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা, তাঁর ভাই টাঙ্গাইল পৌরসভার তৎকালীন মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি, ব্যবসায়ী নেতা জাহিদুর রহমান খান কাকন ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পার নাম বের হয়ে আসে। এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ওয়াহেদ, আবদুল খালেক ও সনি আদালতে জবানবন্দি দেন। তাঁদের জবানবন্দিতেও হত্যার বর্ণনা উঠে আসে। এরপর চার ভাই আত্মগোপনে চলে যান। আমানুর আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তিন বছর হাজতে থাকার পর জামিন লাভ করেন। গত (৫ আগস্টের) পর তিনি আবার আত্মগোপনে চলে যান। অপর দুই ভাই বিগত ২০১৪ সাল থেকে বিদেশে অবস্থান করছেন বলে তাদের ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন।
টাঙ্গাইল জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম মাহফীজুর রহমান বিগত ২০১৬ সালের (৩ ফেব্রুয়ারি) আমানুর রহমান খান রানা ও তার তিন ভাইসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। বিগত ২০১৭ সালের (৬ সেপ্টেম্বর) আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। গত (২৬ জানুয়ারি) ফারুক আহমেদ হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হয়।