হাসান সিকদার ॥
টাঙ্গাইলের বহুল আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় রোববার (২ ফেব্রুয়ারি) দুইজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। কিন্তু মামলার প্রধান আসামি আওয়ামী লীগ দলীয় টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা ও তাঁর তিন ভাইসহ ১০ জন বেকসুর খালাস পেয়েছেন। এতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন নিহত ফারুক আহমেদের ছেলে ও মেয়ে।
তাদের প্রশ্ন দণ্ডিত মোহাম্মদ আলী আদালতে স্বীকারোক্তিতে বলেছিলেন ফারুক আহমেদকে কবির গুলি করেন। সেখানে আমানুর রহমান খান রানা ও সানিয়াত খান বাপ্পা উপস্থিত ছিলেন। মোহাম্মদ আলী ও আনিসুল ইসলাম রাজার স্বীকারোক্তিতে আরও বের হয়ে আসে যে, এই হত্যার ষড়যন্ত্রের সাথে রানার অপর দুই ভাই সহিদুর রহমান খান মুক্তি ও জাহিদুর রহমান খান কাকন জড়িত। রাজা কারাগারে মারা গেছেন। এই স্বীকারোক্তির কারনে মোহাম্মদ আলী ও কবিরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলো। কিন্তু রানা ও তার ভাইদের কিছুই হলো না কেন?
রায় ঘোষনার পর এই প্রতিবেদকের কথা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদের ছেলে আহমেদ মজিদ সুমনের সাথে। তিনি বলেন, মামলা দায়ের থেকে তদন্ত, আদালতে অভিযোগ গঠন, সাক্ষী গ্রহণ বিভিন্ন পর্যায়ে আসামিরা বিচার প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁরা পদে পদে প্রভাব খাটিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, এই মামলার আসামিদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন বিএনপি সমর্থিত আইনজীবী নেতারা। তারা (৫ আগস্টের) পর আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এই সব আইন কর্মকর্তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেননি। এর আগেও যারা রাষ্ট্র পক্ষে কাজ করেছেন তাঁরা রানাদের ভয়ে স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করেননি।
আওয়ামী লীগ নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদের মেয়ে ফারজানা আহমেদ বলেন, নিম্ন আদালতে আমরা সঠিক বিচার পাইনি। তাই বলে আমরা হতাশ নই। এই মামলার বাদি আমার মা খুনিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে গত বছর মারা গেছেন। আমরা উচ্চ আদালতে আপিলের ব্যবস্থা করবো। সেখানে নিশ্চয়ই ন্যায় বিচার পাব।
প্রসঙ্গত, বিগত ২০১৩ সালের (১৮ জানুয়ারি) ফারুক আহমেদের গুলিবিদ্ধ লাশ তাঁর কলেজপাড়া এলাকার বাসার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর তাঁর স্ত্রী নাহার আহমেদ বাদী হয়ে টাঙ্গাইল সদর থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। বিগত ২০১৪ সালের আগস্টে এই হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আনিসুল ইসলাম রাজা ও মোহাম্মদ আলী নামক দুইজনকে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তাঁরা আদালতে জবানবন্দি দেন। তাঁদের জবানবন্দিতে আওয়ামী দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা, তাঁর ভাই টাঙ্গাইল পৌরসভার তৎকালীন মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি, ব্যবসায়ী নেতা জাহিদুর রহমান খান কাকন ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পার নাম বের হয়ে আসে। এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ওয়াহেদ, আবদুল খালেক ও সনি আদালতে জবানবন্দি দেন। তাঁদের জবানবন্দিতেও হত্যার বর্ণনা উঠে আসে। এরপর চার ভাই আত্মগোপনে চলে যান। আমানুর রহমান খান রানা আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তিন বছর হাজতে থাকার পর জামিন লাভ করেন। গত (৫ আগস্টের) পর তিনি আবার আত্মগোপনে চলে যান। অপর দুই ভাই বিগত ২০১৪ সাল থেকে বিদেশে অবস্থান করছেন বলে তাদের ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন।
টাঙ্গাইল জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম মাহফীজুর রহমান বিগত ২০১৬ সালের (৩ ফেব্রুয়ারি) আমানুর রহমান খান রানার তিন ভাইসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। বিগত ২০১৭ সালের (৬ সেপ্টেম্বর) আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। গত (২৬ জানুয়ারি) মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হয়। রোববার (২ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রায় ঘোষনার মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত এই মামলার নিম্ন আদালতে বিচার কাজ শেষ হলো।
খান পরিবারের চার ভাই কে কোথায়-
রোববার (২ ফেব্রুয়ারি) ফারুক আহমেদ হত্যা মামলার রায় ঘোষনার সময় আমানুর রহমান খান রানার ভাই টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তিকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। কিন্তু অন্য তিনভাইসহ আট আসামি ছিল অনুপস্থিত। আমানুর রহমান খান রানা বিগত ২০১৬ সালে আত্মসমর্পনের পর প্রায় তিন বছর হাজতবাসের পর জামিনে মুক্ত হন। গত (৫ আগস্ট) শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। বিগত ২০১৪ সালে পুলিশি তদন্তে এই মামলায় আমানুর রহমান খান রানা ও তার ভাইদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি বের হয়। তার পরেই তাদের দুই ভাই ব্যবসায়ী নেতা জাহিদুর রহমান খান কাকন ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পা দেশ ত্যাগ করেন।