
ফরমান শেখ, ভূঞাপুর ॥
পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে ঘরমুখো মানুষ ও গণপরিবহনের চাপ বাড়ছে। তবে এই মহাসড়কে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ থাকলেও যানজটের সৃষ্টি হয়নি। ফলে দুর্ভোগ ও ভোগান্তি বিহীন নির্বিঘ্নে পরিবার ও পরিজন নিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাড়ি ফিরছেন উত্তরাঞ্চলের কমপক্ষে ২৩টি জেলার ঘরমুখো মানুষ। তবে গণপরিবহন সংকট ও যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে যমুনা সেতু ওপর দিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৮ হাজার ৩৩৫টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। এতে টোল আদায় হয়েছে ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৫২ হাজার ৯০০ টাকা। এই সেতু দিয়ে টোল আদায়ে শনিবার (২৯ মার্চ) দুপুর পর্যন্ত চলতি বছরের নতুন রেকর্ড।
যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুল কবীর পাভেল জানান, গত বৃহস্পতিবার (২৭ মার্চ) রাত ১২টা থেকে শুক্রবার (২৮ মার্চ) রাত ১২ টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪৮ হাজার ৩৩৫ টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। এর মধ্যে টাঙ্গাইল অংশের সেতু পূর্ব প্রান্তের উত্তরবঙ্গগামী লেনে ৩০ হাজার ৩৯৮ টি যানবাহন পার হয়েছে। এতে ১ কোটি ৯০ লাখ ৯৮ হাজার ৫৫০টাকা টোল আদায় হয় এবং সিরাজগঞ্জ অংশের সেতু পশ্চিম প্রান্তে ঢাকাগামী লেন দিয়ে ১৭ হাজার ৯৩৭ টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। এতে টোল আদায় হয়েছে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৫০ টাকা টাকা।
গত বছরের বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) রাত ১২টা থেকে শুক্রবার (১৪ জুন) রাত ১২টা পর্যন্ত যমুনা সেতু দিয়ে ২৪ ঘণ্টায় অর্থাৎ একদিনে ৩ কোটি ৮০ লাখ ৬৩ হাজার ৪০০ টাকার টোল আদায় এবং এর বিপরীত ৫৩ হাজার ৪০৭টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। যমুনা সেতুর এযাবৎ কালে এটিই ছিল সর্বোচ্চ টোল আদায় এবং যান পারাপার।
যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, চলতি বছরে সেতুর উপর দিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ টোল আদায় ও যানবাহন পারাপার হয়েছে। ৪৮ হাজার ৩৩৫টি যানবাহন পারাপার হয়। এতে টোল আদায় হয়েছে ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৫২ হাজার ৯০০ টাকা। যা চলতি বছরের নতুন রেকর্ড। গত বছর ঈদ-উল-ফিতরে যমুনা সেতুর উপর দিয়ে ৪৭ হাজার ৭৫৭টি যানবাহন ও ৯ হাজার ৩৪৮টি মোটরসাইকেল পারাপার হয়েছিল। এতে ৩ কোটি ৩২ লাখ ৪৩ হাজার ৯০০ টাকা টোল আদায় হয়।
তিনি আরও বলেন, ঈদযাত্রায় যমুনা সেতুর উভয় প্রান্তে পাশে ফাস্ট ট্রাকসহ ৯টি করে মোট ১৮ বুথ দিয়ে যানবাহন পারাপার হচ্ছে। এর মধ্যে সেতুর উভয় পাশে ২টি করে মোট ৪টি মোটরসাইকেলের বুথ রয়েছে এবং ঈদ যাত্রা নিরাপদ করতে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমো সার্বক্ষণিক মনিটরিং চলছে। বিগত ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন যমুনা সেতু উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পর থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক দিয়ে উত্তরবঙ্গের ২৩টি জেলার যানবাহন চলাচল করে। স্বাভাবিকভাবে গড়ে প্রতিদিন ১৫-১৮ হাজার যানবাহন সেতুটি দিয়ে পারাপার হয়। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের ছুটিতে পরিবহনের সংখ্যা বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
এদিকে ঈদের আনন্দ পরিবারের সাথে ভাগাভাগি করে নিতে ঘরমুখো হচ্ছে মানুষ। এতে করে শনিবার সকাল থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল যমুনা সেতু মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। যানবাহনের চাপ থাকলেও মহাসড়কে নেই যানজট। স্বাভাবিক গতিতেই চলছে যানবাহন। প্রচন্ড রোদে যানবাহনে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছে শিশু, বৃদ্ধ, নারী ও পুরুষ।
ঢাকা-টাঙ্গাইল ও যমুনা সেতু মহাসড়কের এলেঙ্গা বাস স্টেশন, রাবনা বাইপাস, আশেকপুর বাইপাস ঘুরে দেখা যায়, অনেকেই যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করছেন। যাত্রীরা যাত্রীবাহী বাস ছাড়াও ট্রাক, পিকআপ, বিভিন্ন সড়কের লোকাল বাস, লেগুনায় যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। মহাসড়কে বাসের চেয়ে প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলেই বেশি দেখা গেছে। এছাড়াও বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে যাত্রীদের। যাত্রীরা পরিবহন করছে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকার। গণপরিবহন সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খোলা ট্রাক পিকআপ ও বাসের ছাদে গন্তব্যে পৌছাচ্ছে।
রাশেদ নামে এক যাত্রী বলেন, আমি বগুড়া যাবো। ঢাকা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত আসলাম কোন যানজট পাইনি। স্বস্তিতেই বাড়ি যাচ্ছি। সজীব মিয়া নামের এক যাত্রী বলেন, বাড়ি যেতে আমাদের বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। এলেঙ্গা পর্যন্ত আসলাম ভালোভাবেই আসলাম। গাড়ি স্বাভাবিক গতিতেই চলছে। পরিবহন সংকটের জন্য অনেকেই ট্রাক ও পিকআপে বাড়ি যাচ্ছেন। এলেঙ্গা বাস স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা রাবেয়া খাতুন বলেন, প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি গাড়ি পাচ্ছি না। গাড়ি পেলেও ভাড়া দ্বিগুণ চাচ্ছে। ভাড়া বেশি চাচ্ছে এই জন্য যাচ্ছি না।
এলেঙ্গা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মুহাম্মদ শরীফ বলেন, মহাসড়কে যানবাহনের চাপ থাকলেও কোন যানজট নেই। মহাসড়কে স্বাভাবিকভাবেই যানবাহন চলাচল করছে। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে মহাসড়কে পর্যাপ্ত পরিমাণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। ঈদে ঘরমুখো মানুষ স্বস্তিতে বাড়ি ফিরছে।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষকে স্বস্তি দিতে সাড়ে ৭’শ পুলিশ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে নিয়োজিত এবং জেলা পুলিশের প্রতিটি সদস্য তীব্র গরমকে উপেক্ষা করতে মহাসড়কে পরিশ্রম করছে।
টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক শরীফা হক বলেন, সড়ক পথে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে আমরা সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছি এবং আইনশৃংখলা বাহিনী গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। গত কয়েকদিনে যানবাহনের সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় বৃদ্ধি পেলেও যানজট পরিলক্ষিত হয়নি। মহাসড়কে পুলিশের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত, সেনাবাহিনী ও র্যাবসহ সংশ্লিষ্টরা কাজ করে যাচ্ছেন।