
সাদ্দাম ইমন ॥
ঈদের দিন ছাড়াও প্রায় প্রতিদিনের বিনোদন বলতেই ছিলো বড় পর্দায় চোখ রেখে হলে গিয়ে নতুন নতুন সিনেমা দেখা। আধুনিক প্রযুক্তির কাছে হেরে সেই যুগ এখন হারিয়ে গেছে। এখন বিনোদন এক হাতের মুঠোয়। আধুনিক যুগের স্মার্টফোন, ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির কাছে হেরে গেছে সেই সিনেমা হলের দাম্ভিকতা।
এবার ঈদে সাকিব খানের ‘বরবাদ’ কিংবা আরফান নিশোর ‘দাগি’ সিনেমা সারাদেশে সিনেমা হল প্রেমীদের কাছে দেখার বড় উপলক্ষ্য। কিন্তু টাঙ্গাইল শহরের সিনেমা হলপ্রেমীরা চাইলেই হাতের কাছে চাহিদা পূরণ হওয়ার সেই সিনেমা হল নেই। প্রায় অর্ধযুগ আগেই একে একে টাঙ্গাইল শহরের ৫টি সিনেমা হল হারিয়ে গেছে।
বন্ধের শুরুটা হয় বিগত ১৯৯৮ সালের দিকে শহরের প্রাণকেন্দ্র নিরালা মোড়ে রওশন টকিজ দিয়ে। তারপর বিগত ২০০৮ সালে বটতলার রুপসী সিনেমা হল। মেইন রোডে টাঙ্গাইল সদর থানার পাশে রুপবানী সিনেমা হলটি বিগত ২০১৪ সালের দিকে বড় ধরনের বিদ্যুত বিলের কারনে বন্ধ হয়ে যায়। মিয়া পাড়ায় দুটি সিনেমা হলের মধ্যে কেয়া সিনেমা হলটি বিগত ২০১৯ সালে এবং সর্বশেষ মালঞ্চ সিনেমা হলটি বিগত ২০২২ সালে হারিয়ে গেছে। এগুলো সবই ভেঙে ফেলা হয়েছে। এসব সিনেমা হল ভেঙে বহুতল মার্কেট ও এপার্টম্যান্ট তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া টাঙ্গাইল সদরের করটিয়া ইউনিয়নে ফরিয়া ও নন্দিনী নামে দুটি সিনেমা হল ছিল। যা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।
জানা গেছে, ভাড়ায় চালিত গুদাম ঘরের মতো রওশন সিনেমা হলটি সিডিসি কমপ্লেক্স তৈরীর কারনে বন্ধ হয়ে যায়। সিডিসি কমপ্লেক্সের দোতলা ব্যবহার করে সিনেমা হল চালানোর কথা ছিল। যা পরবর্তীতে আর সত্যতা মিলেনি। রওশন সিনেমা হলটি সিডিসি কমপ্লেক্স হয়ে ব্যস্ত মার্কেট হয়ে গেছে।
ঠিক একইভাবে রওশন সিনেমা হলের মালিকের রুপসী সিনেমা হলটি বটতলায় রুপসী টাওয়ার নামে হারিয়ে গেছে। এভাবেই মিয়াপাড়া মালঞ্চ সিনেমা হলটি এখন মালঞ্চ টাওয়ার। আর কেয়া সিনেমা হলটি টিনের ব্যবসায়ীদের হাতে পড়ে টিনের দোকান হয়ে গেছে।
টাঙ্গাইল শহরের সিনেমা হল প্রেমীরা বরবাদ কিংবা দাগি সিনেমা দেখার স্বাদ পেতে হলে তাদের ছুটে যেতে হবে শহরের বাইরে ৩টি উপজেলায় অবস্থিত সিনেমা হলে। নাগরপুর উপজেলায় রাজিয়া সিনেমা হল, মধুপুরের মাধবী সিনেমা হল কিংবা অস্থায়ীভাবে চালু হওয়া সখিপুরের সিনেমা হলটিতে। এই তিনটি সিনেমা হল কোন রকমে টিকে আছে।
ষাট বছরের সিনেমা হলপ্রেমী গোপালের সাথে বললে তিনি টাঙ্গাইল নিউজবিডিকে বলেন, আমাদের সময়ে অবসরে বিনোদন বলতে ছিল সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা। এখনকার মতো মোবাইলে টার্চ করলেই চাহিদা মত কাঙ্খিত সিনেমা ও গানটি বের হয়ে আসতো না। তখনকার সময়ে কাঙ্খিত গানের জন্য রেডিওতে কান পেতে কয়েকদিনের অপেক্ষায় থাকতে হতো। নয়তো পত্র লিখে রেডিও বিজ্ঞাপন তরঙ্গে জানানো হতো। তখনকার সময়ের বিনোদন এখন আমাদের কাছে মধুর স্মৃতি। তখনকার সময়ে নায়ক-নায়িকারদের পোষাক দেখে আমরাও তখন একই রকমের পোষাক তৈরী করতাম। তাদের মতো করে কথা বলার চেষ্টা করতাম। আধুনিক যুগে মোবাইল আগ্রাসনে তা হারিয়ে গেছে। অতীতে সিনেমা হলে গিয়ে দেখার রোমাঞ্চকর স্মৃতি এখন আমাদের মনকে নাড়া দেয়।
পঞ্চাশ বছরের সিনেমাপ্রেমী বাবুল মিয়া টাঙ্গাইল নিউজবিডিকে বলেন, বড় পর্দায় সিনেমা অনেক দেখেছি। টিকেট কেটে দেখেছি, টিকিট ছাড়াও দেখেছি যা এখন অতীত। মনে পড়ে ঈদের দিন কিংবা শুক্রবারে একটি টিকিটের জন্য গরমে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েছি। শতজনের পিছনে লাইনে থেকে ঘন্টা খানেক পর টিকিট পেয়ে আনন্দ পেয়েছি। ভীড়ের মধ্যে ছাড়পোকার কামড়ে সিনেমা দেখে ঘামে শরীর ভিজে একাকার হলে শার্ট খুলে চিপরিয়ে আবার গায়ে দিয়েছি। কিন্তু শত কষ্ট হলেও সিনেমা দেখা বন্ধ করিনি। আমাদের সময় একই দিনে ৪টি শো’র ৪টি সিনেমা হলে সারাদিন সিনেমা দেখেছি। সেই সময়ের কষ্টের স্মৃতি আমাদের জীবনে মধুর আনন্দের স্মৃতি।
সিনেমাপ্রেমী ও লেখক মনসুর মনু টাঙ্গাইল নিউজবিডিকে বলেন, আমাদের সময় ঈদ বিনোদন বলতে সময় কাটানোর মাধ্যম ছিল রেডিও, টেলিভিশন আর সিনেমা। এছাড়া টেপরেকর্ডার মনের মতো গান শোনার প্রচলনও ছিল। মনে পড়ে আশির দশকে রেডিওতে শুনতাম দুপুরবেলার বিজ্ঞাপন তরঙ্গ অনুষ্ঠান। নতুন কোন সিনেমা মুক্তি উপলক্ষে দশ-পনের মিনিটের অল্পবিস্তর সংলাপ ও গান নিয়ে বানানো অনুষ্ঠানমালা। আর টেলিভিশনে ঈদ উপলক্ষে রাতের বিশেষ নাটক ও আনন্দমেলা নামের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখার জন্য অধীর আগ্রহে বসে থাকতাম। ছোটবেলা যেহেতু মফস্বল শহর টাঙ্গাইলেই বড় হয়েছি। সেইসময় টাঙ্গাইলে যে পাঁচটি সিনেমা হল ছিল। তিনি টাঙ্গাইল নিউজবিডিকে আরও বলেন, কোন না কোনটিতে ঈদের সময় দু’একটি সিনেমা একা আবার কখনোবা পাড়ার কয়েকজন বন্ধু মিল একসাথে দলবেঁধে হৈ হুল্লোড়ে মেতে সিনেমা দেখা হতো। সে এক অন্যরকম আনন্দ বিনোদন ছিল। কখনো ভোলার নয় সেইসব দিনের কথা। বর্তমানে শহরে বড় পর্দার কোন সিনেমা হল নেই। তবে ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল জেলা শহরে অন্তত একটি উন্নতমানের মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হলের খুবই প্রয়োজন।
সাইফ আলী জমাদার নামে এক সিনেমাপ্রেমী টাঙ্গাইল নিউজবিডিকে বলেন, ছোটবেলায় প্রতিবেশীর বাসায় সিনেমা নিয়ে আলোচনা হতো। তখনকার সময়ে মাসে টেলিভিশনে একটি করে সিনেমা দেখানো হতো। বন্ধু শামীমের মুখে ময়নামতি সিনেমার ছবির হাসমত কিভাবে মিষ্টি খায়, সেই কাহিনী বারবার শুনতাম। তখন থেকে সিনেমা নিয়ে একটা আগ্রহ তৈরী হয়। অন্যের বাসায় টেলিভিশনের টারজান, ম্যাকগাইভার কিংবা মাসে একবার সিনেমা দেখতাম। এখনও মনে আছে “সুখ দুঃখ” সিনেমার সাপের বাচ্চার কথা, গানের বিনোদন ছায়াছন্দের কথা। আদালত পাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকার সময়ে কাছেই কেয়া, মালঞ্চ সিনেমা হল থাকায় সিনেমা দেখা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। টিকিট মাত্র দেড় টাকা থেকে দুই টাকা। প্রতিদিন বাজারে চার আনা, পঞ্চাশ পয়সা বাঁচিয়ে সপ্তাহে শুক্রবার নতুন সিনেমা দেখা হতো। সে এক অন্যরকম মজা ছিল। তখন ৫ম শ্রেনীর ছাত্র ছিলাম। কাছে খেলাধুলার কোন মাঠ নেই, তাই বিনোদনের জন্য সিনেমা দেখাই নেশা হয়ে যায়।
ঈদের সময় ছিলো রমরমা অবস্থা। সিনেমা নিয়ে মাইকিং, পোষ্টার বিলি করা। সেই সিনেমা পোষ্টার মাইকের পিছে ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করা। পথে-ঘাটে রাস্তার পাশে দেয়ালে টাঙ্গানো বড় বড় সিনেমা পোষ্টার মন কেড়ে নিতো। প্রচন্ড গরমে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে সিনেমা হলের ভীড়ে প্রবেশ করতাম। গরমে ভিজে যেতে শার্ট, তারপরও সিনেমার পর্দার দিকে চেয়ে থাকা। সিনেমা দেখে যখন বের হতাম, তখন ঘেমে একাকার গোছল করার মতো অবস্থা। এই সিনেমা দেখা নিয়ে মায়ের হাতে মার খাওয়ার কথা এখনও মনে পড়ে। এছাড়া রেডিওতে দুপুর বেলা ২ ঘন্টার বিজ্ঞাপন তরঙ্গ সিনেমার গান, বিজ্ঞাপন, রাতে রেডিওতে নাটক শুনতাম। সেইদিন হারিয়ে গেছে প্রযুক্তির নতুন নতুন আবিস্কারে। এখন চাইলেই মোবাইলে সিনেমা, গান দেখতে পারি। তবে সিনেমা হল না থাকায় নতুন সিনেমা দেখার উপায় নাই।
সিনেমা হলের ব্যবসায়ী ও দর্শকরা টাঙ্গাইল নিউজবিডিকে জানান, টাঙ্গাইল শহরের প্রাণকেন্দ্রে ৫টি সিনেমা হল ছিলো। এসব সিনেমা হলে দিনে ৪ থেকে ৫টি শো চলতো। সিনেমার জন্য মাইকিং করে প্রচার হতো, পোষ্টার বিলি হতো। ঈদ কিংবা বিভিন্ন উৎসবে সিনেমা হলে সামনে প্রচন্ড ভীড় থাকতো। ব্লাকের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি হতো। বিভিন্ন শ্রেনীর মানুষের মাঝে সিনেমা নিয়ে আলোচনা থাকত। নব্বই দশকে রাজনীতি ও সিনেমার আলোচনা চলতো। তবে তারপরই মোবাইল আর ইন্টারনেটের আড়ালে সেই সিনেমা হলের রমরমা অবস্থা হারিয়ে গেছে পুরোপুরি। বর্তমান সময়ের তরুণ-তরুনীরা জানে না সিনেমা হলের কি মজা ছিল।
সিনেমা হলের মালিকদের সাথে কথা হলে তারা টাঙ্গাইল নিউজবিডিকে জানান, সিনেমা ব্যবসায় বর্তমানে কোন লাভ নাই, ক্ষতি আর ক্ষতি। তাই বাধ্য হয়ে সিনেমা হল মালিকরা সিনেমা হল বন্ধ করে অন্য ব্যবসা হাতে নিয়েছেন।
বৃদ্ধ থেকে শুরু করে শিশুর হাতে এখন মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট যুক্ত হয়েছে। মোবাইল আসক্তির কারনে ভালো কাজের পরিবর্তে বেশীর ভাগ সময় অযথা মোবাইল ঘাটাঘাটিতে অমঙ্গলের ছোঁয়া সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে সমাজে। সকল বিনোদন এখন ছোট্ট হাতের মুঠোয়। এর থেকে বের হওয়ার জন্য শহরে প্রয়োজন মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হল।
এক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের গল্প ও নির্মাণশৈলীর পাশাপাশি প্রদর্শন ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। একটা সুন্দর চলচ্চিত্র নির্মাণের পর তা পেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের মাধ্যমেই তার সফলতা আসে। প্রেক্ষাগৃহে সুন্দর পরিবেশে দর্শক সমাগম হলেই পুঁজি ফিরে আসে। শিল্পমনা ব্যবসায়ীরা সিনেমা শিল্পে মূলধন লগ্নি করে। অথচ বর্তমানে সিনেমা পাগল বাঙালী সিনেমা হল বিমুখ হয়ে পড়েছে।