হাবিবুর রহমান, মধুপুর ॥
টাঙ্গাইলের মধুপুর আনারসের রাজধানীতে জমে উঠেছে জমজমাট বাজার। মৌসুমের শুরু থেকে এ বছর দাম ভালো যাচ্ছে। এখন আনারসের দামের সূচক উর্দ্ধমুখী। পরিবহন খরচ বৃদ্ধিসহ স্থানীয় বাইক খরচ বেড়ে গেলেও দাম ভালোর কারণে তেমন প্রভাব পড়েনি বলে কৃষকরা মনে করছেন। পাইকার-ক্রেতা বেশি থাকায় বাজারে প্রচুর আনারসের আমদানি থাকলেও দাম পড়েনি। স্থানীয় পাইকাররা কিনে বিভিন্ন মোকামেও পাঠাচ্ছে। পাইকাররা বলছেন, মোকামগুলোর বাজার তুলনামূলকভাবে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও বেড়েছে। ফলের মোকামে চাহিদা বেড়েছে। গরম বেশি থাকার কারণে চাহিদা বেশি।
কৃষি বিভাগ বলছে, এ বছর মধুপুর গড়ে আনারসে ৭৬০ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদন ২ লক্ষ ৬৫ হাজার ২শ’ মে.টনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। আনারস চাষে কৃষকদের পরামর্শ ও সহযোগিতা করে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে মধুপুরে ৬ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে আনারস আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৯২ হেক্টরে জলডুগি এবং ৪ হাজার ২২০ হেক্টরে ক্যালেন্ডার প্রজাতির আনারস আবাদ হয়েছে। এছাড়া ফিলিপাইন থেকে আমদানিকৃত জাত এমডি-টু ১৮ হেক্টর আবাদ হয়েছে। হেক্টর প্রতি ফলন ধরা হয়েছে ক্যালেন্ডার ৩৮ মে.টন, জলডুগি ২৭ মে.টন ও এমডিটু ৩৫ মে.টন।
কৃষি বিভাগ আরো জানায়, গড় এলাকায় সর্ব প্রথম ইদিলপুর গ্রামের গারো নারী মিজি দয়াময়ী সাংমা আনারস চাষের যাত্রা শুরু করে। বিগত ১৯৪২ সালে ভারতের মেঘালয়ে তার আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ৭৫০টি আনারষের চারা আনেন। সে থেকে ধীরে ধীরে আনারস চাষ বাড়তে থাকে। লাল মাটির আনারস জিআই পণ্য হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। আনারস এখন মধুপুরের অর্থনীতির প্রধান উৎস হিসেবে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার আনারস বেচাকেনা হয়ে থাকে। প্রায় ৬ মাস কম বেশি চলে বেচাকেনা। মধুপুর গড়ের জলছত্র হচ্ছে আনারসের সবচেয়ে বড় বাজার। এছাড়াও মোটের বাজার ও গারো বাজারও আনারস বেচাকেনার জন্য বড় বাজার রয়েছে। এসব বাজারে দেশের নানা প্রান্ত থেকে পাইকার আসে আনারস কিনতে।
চলতি বছর ভরা মৌসুমে পাইকার অনেক। আশপাশের ময়মনসিংহ, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর, ঢাকা, সিলেট, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, বরিশাল, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকার আসে। অথচ এ বছর মৌসুমের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকার আসতে শুরু করেছে। দামও ভালো যাচ্ছে বলে জানালেন আনারস ক্রেতা ও বিক্রেতারা। প্রতিদিন জমজমাট বাজারে প্রচুর পরিমানে বেচা কেনা হয়ে থাকে।
জলছত্র বাজারে কথা হয় আনারস নিয়ে আসা ভ্যান চালক শাহীনের সাথে। তিনি জানান, গত দিন ধরে বাজার ভালো যাচ্ছে। যে আনারস কয়েক দিন আগে ৪০ টাকা বিক্রি হতো, এখন সেইটা ২/৩ টাকা বেশি দামে টাকা বিক্রি হচ্ছে। পাইকার চাহিদা বেশি থাকায় এমন হচ্ছে বলে তার ধারণা। সুরুজ আলী জানান, আনারসের একটি চারার দাম ৪-৫ টাকা, রোপন খরচ এক টাকা, পাতার ঢাক খরচ, নিড়ানী খরচ, সার, বিষ খরচ, রোদে পোড়া থেকে রক্ষার ঢাক, পাকানো খরচ, কর্তণ খরচ, বের করা খরচ, স্থানীয় পরিবহন খরচ নিয়ে ১৫-১৮ টাকা পড়ে যায়। শামসুল হক জানালেন, যেখানে ছোট টিকটিকি ট্রাকের ভাড়া ছিল ৫-৬ হাজার টাকা। এখন ৭-৮ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। ভাড়া বৃদ্ধি থাকলেও ক্রেতাদের চাহিদা বেড়ে যাওয়াকে আনারসের দাম বাড়ার কারণ মনে করেন এই ব্যবসায়ী।
স্থানীয় ট্রাক ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সদস্য বেলাল জানান, মধুপুর থেকে প্রতিদিন শতাধিক ছোট-বড় আনারসের গাড়ি বিভিন্ন জেলায় যায়। বাজার ছাড়াও বাগান থেকেও সরাসরি ট্রাকে উঠানো হয়। সড়ক পাকা থাকায় গ্রামের ভেতরে বাগানেও যায় গাড়ি। বাগান থেকেও মোকামে যাচ্ছে আনারস। জলছত্র ট্রাক ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বলেন, এ বাজার থেকে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আনারসের সমাগম ঘটে থাকে। চালক, ব্যাপারীসহ বাজারে আসা মানুষদের জন্য তাদের অফিসেই কম খরচে থাকার সুব্যবস্থা করেছে। স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী সুমন জানালেন, আনারসের মৌসুমে তাদের বাজার চাঙ্গা থাকে। বেচাকেনা বেশি হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাজারে লোকজন থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এ গড়ের সবচেয়ে আনারসের বড় বাজার এটি। দোকানপাট থেকে শুরু করে কুলি, হকার, শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকে বাজার। সরগরম থাকার কারণে বেচাকেনাও বেড়ে যায়। স্থানীয় অর্থনীতির চাকা সচল থাকে।
এ বিষয়ে মধুপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা তাজবিনূর রাত্রী জানান, ২০২৪-২৫ মৌসুমে মধুপুরে ৬ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে আনারস আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৯২ হেক্টরে জলডুগি এবং ৪ হাজার ২২০ হেক্টরে ক্যালেন্ডার প্রজাতির আনারস আবাদ হয়েছে। এছাড়া ফিলিপাইন থেকে আমদানিকৃত জাত এমডি-টু ১৮ হেক্টর আবাদ হয়েছে। হেক্টর প্রতি ফলন ধরা হয়েছে ক্যালেন্ডার ৩৮ মে.টন, জলডুগি ২৭ মে.টন ও এমডিটু ৩৫ মে.টন।