
৬০৮ Views
স্টাফ রিপোর্টার ।। শহীদুল ইসলাম, এক নাম, যিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে এক বিরল উদাহরণ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার জীবনী কেবল একজন মানুষের বেড়ে ওঠা নয়, বরং এটি এক সংগ্রামী ইতিহাস যেখানে মিশে আছে শৈশবের স্বপ্ন, শিক্ষাজীবনের আলো, চাকরি জীবনের সততা, রাজনৈতিক জীবনের আত্মত্যাগ, ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্যাতন, জাতীয়তাবাদী আদর্শে অটল থাকা, মানুষের সেবায় নিজেকে নিবেদিত করা এবং শেষ পর্যন্ত একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠা। টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলার দেলুটিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া শহীদুল ইসলাম ছোটবেলা থেকেই এক আলোকিত পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তার বাবা নূর মোহাম্মদ তালুকদার ছিলেন এলাকার একজন খ্যাতিমান ডাক্তার এবং মা হাজেরা খাতুন ছিলেন একজন স্নেহশীল ও নিবেদিতপ্রাণ গৃহিণী। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হলেও তিনি ছিলেন পরিবারের সবার কাছে সবচেয়ে আদরের, কিন্তু সেই আদরের শিশুটি শৈশব থেকেই নিজের আলাদা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে তিনি একদিন বড় কিছু করবেন। তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল বারইপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, যেখানে চতুর্থ শ্রেণি শেষ করে তিনি ভর্তি হন ভবনদত্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
এরপর ভবনদত্ত গণ উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করে ভর্তি হন ব্রাহ্মণ শাসন আজগরিয়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং সেখান থেকেই ১৯৮১ সালে তিনি এসএসসি পাশ করেন। তারপর ঘাটাইল জি.বি.জি কলেজ থেকে ১৯৮৩ সালে এইচএসসি পাশ করেন। মেধা ও অধ্যবসায়ের ধারাবাহিকতায় তিনি ভর্তি হন সাদত বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ১৯৮৬ সালে স্নাতক সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তার শিক্ষাজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়ে। ১৯৮৭ সালে তিনি হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং সেই সময়ের ছাত্রজীবনের রাজনীতির উত্তাল দিনে সরাসরি সম্পৃক্ত হন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের আন্দোলনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়াউর রহমান হলে অবস্থানকালে তিনি ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী হিসেবে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন, মিছিলে অংশ নেন, পুলিশের লাঠিচার্জের শিকার হন এবং দেশপ্রেমিক চেতনায় নিজেকে গড়ে তোলেন। স্বৈরাচারী সরকারের পতনের জন্য চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে তিনি নিজের একাডেমিক পড়াশোনায়ও সেশনজটের শিকার হন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৯১ সালে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি সম্পন্ন করতে সক্ষম হন।
এই শিক্ষাজীবনের সংগ্রামের পর শুরু হয় তার কর্মজীবনের নতুন অধ্যায়। ১৯৯৩ সালের ২০ মে তিনি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। তিনি দ্রুতই প্রমাণ করেন যে একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও কিভাবে সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখা যায়। ৩১ বছর ৭ মাস ১১ দিন ধরে তিনি নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি অতিরিক্ত পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে যান। কিন্তু এই দীর্ঘ কর্মজীবন তার জন্য সহজ ছিল না, কারণ তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার একজন অনুসারী এবং বিএনপি ঘনিষ্ঠ পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আওয়ামী লীগ সরকার তার বিরুদ্ধে একের পর এক অন্যায় চাপিয়ে দেয়। তাকে দুইবার ওএসডি করা হয়, ১৫ বছরের মধ্যে ১১ বার বদলি করা হয়, পদোন্নতি আটকে দেওয়া হয়, নানা অপমান সহ্য করতে হয়। এইসব নির্যাতন, অবমূল্যায়ন এবং প্রশাসনিক হয়রানি একজন সাধারণ মানুষকে ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, কিন্তু শহীদুল ইসলাম কখনোই তার জাতীয়তাবাদী আদর্শ থেকে এক ইঞ্চি সরে আসেননি। তার বিরুদ্ধে সরকারি চক্রান্ত চলেছে, কিন্তু তিনি ন্যায়ের পথে, বিএনপির আদর্শের পথে এবং সততার পথে অবিচল থেকেছেন। এভাবেই তিনি বাংলাদেশের চাকরিজীবনের ইতিহাসে বিরলতম এক উদাহরণ হয়ে উঠেছেন যে কিভাবে একজন মানুষ আদর্শে অবিচল থেকে ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্যাতন সহ্য করেও নিজের পথ থেকে সরতে রাজি হন না।
তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা ছাত্রদল থেকে হলেও বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি বর্তমানে বিউবো জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তা ফোরামের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এটি বিএনপি ঘনিষ্ঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী সংগঠন, যেখানে তিনি সততা, নিষ্ঠা এবং কর্মীদের স্বার্থ রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ছাত্রজীবনে তিনি যে জাতীয়তাবাদী আদর্শকে আঁকড়ে ধরেছিলেন, আজও তিনি সেই আদর্শের প্রতি অবিচল। তিনি বিশ্বাস করেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শই বাংলাদেশের মুক্তির পথ দেখাবে। তার সংগ্রাম ও ত্যাগ প্রমাণ করেছে যে সত্যিকারের রাজনীতি মানে ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য লড়াই নয়, বরং মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের জন্য আত্মত্যাগ করা। শহীদুল ইসলাম সেই আত্মত্যাগের উজ্জ্বল প্রতীক।
চাকরি জীবনে যখন তাকে বারবার বদলি করা হতো, তখন সহকর্মীরা অবাক হয়ে যেতেন যে তিনি কিভাবে এত নির্যাতনের পরও মুখ বন্ধ না করে সত্যের পথে অটল থাকেন। কেউ কেউ হয়তো ভয়ে চুপ করে যেতেন, কিন্তু তিনি ছিলেন অন্যদের অনুপ্রেরণা। তার সততা, কর্মদক্ষতা ও মানবিকতা সহকর্মীদের কাছে তাকে একজন প্রকৃত নেতার আসনে বসিয়েছে। তিনি বুঝতেন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে তার কাজ শুধু চাকরি নয়, বরং মানুষের কাছে আলো পৌঁছে দেওয়া, তাদের জীবনকে সহজ করা। তাই সবসময় চেষ্টা করেছেন মানুষের কল্যাণে কাজ করতে। এটাই প্রমাণ করে যে তিনি একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক এবং জনগণের সেবক।
শুধু চাকরি নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি এক নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। তিনি এক পুত্র ও এক কন্যার জনক। তার পুত্র কানাডার বিশ্ববিখ্যাত ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে বর্তমানে টরন্টো শহরে অবস্থান করছেন। এই অর্জন কেবল পরিবারের নয়, বরং দেশের জন্যও এক গৌরব। সন্তানদের শিক্ষার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে সততা ও নৈতিকতার শিক্ষা পরিবারে কিভাবে প্রভাব ফেলে। তার কন্যাও বাবার আদর্শে বেড়ে উঠছে। পরিবার ও সন্তানদের জন্য তিনি যেমন নিবেদিত, তেমনি দেশের মানুষের জন্যও তিনি নিবেদিতপ্রাণ।
শহীদুল ইসলামের জীবনকাহিনি আসলে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসেরই প্রতিচ্ছবি। যেখানে একদিকে রয়েছে ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্যাতন, অন্যদিকে রয়েছে জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী একজন কর্মীর অবিচল অবস্থান। ছাত্রজীবনের আন্দোলন থেকে শুরু করে চাকরি জীবনের নির্যাতন, এবং বর্তমানের রাজনৈতিক সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে তার জীবন এক সংগ্রামী ইতিহাস। তিনি প্রমাণ করেছেন সত্যিকারের জাতীয়তাবাদী কর্মী কখনো পদ, লোভ, অর্থ বা ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করে না। বরং দল, দেশের জনগণ এবং গণতন্ত্রের জন্যই তার লড়াই। তিনি নিঃস্বার্থভাবে বিএনপির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন এবং তার এই ত্যাগ একদিন দলের হাইকমান্ডের কাছে বিশেষভাবে মূল্যায়িত হবে।
আজকের বাংলাদেশে যখন গণতন্ত্র দমবন্ধ অবস্থায়, মানুষ বাকস্বাধীনতা হারিয়েছে, বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীরা একের পর এক মিথ্যা মামলার শিকার হচ্ছে, তখন শহীদুল ইসলামের মতো কর্মীরাই বিএনপির জন্য বাতিঘর হয়ে উঠেছেন। তিনি কেবল একজন প্রাক্তন সরকারি কর্মকর্তা নন, বরং তিনি একজন সৈনিক, যিনি ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আদর্শের পতাকা উঁচিয়ে ধরে রেখেছেন। তার জীবন আজ প্রমাণ করে যে সততা, ত্যাগ ও নিষ্ঠা থাকলে কোনো শক্তিই একজন মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না।
শহীদুল ইসলামের জীবনগাঁথা তাই কেবল একটি মানুষের গল্প নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ইতিহাস, একটি সংগ্রামের ইতিহাস, একটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার ইতিহাস। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় বিএনপির হাইকমান্ডের চোখে তাকে একজন নিঃস্বার্থ, সৎ, ত্যাগী ও নিষ্ঠাবান কর্মী হিসেবে তুলে ধরে। কারণ তিনি প্রমাণ করেছেন, রাজনীতি মানে ক্ষমতার আসনে বসা নয়, রাজনীতি মানে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মানুষের জন্য লড়াই করা এবং সত্য ও আদর্শের জন্য নির্যাতন সহ্য করেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা। মো: শহীদুল ইসলাম সেই লড়াইয়ের প্রতীক, সেই আদর্শের প্রতীক এবং সেই ত্যাগের প্রতীক, যিনি বিএনপির পতাকা হাতে আগামী দিনের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।






