হাসান সিকদার, জেদ্দা, সৌদি আরব ॥
বেশির ভাগ প্রবাসীরাই তাদের আশা-আকাঙ্খা এবং তাদের যে উদ্দেশ্যে প্রবাসে আসা তা বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হয় না। কারও মালিক ঠিকমতো বেতন দিচ্ছে না, আবার কেউ দেশ থেকে যে বেতনের কথা শুনে এসেছিল, তারা দেখতে পেল সেই বেতনের সঙ্গে কোনো মিল নেই। আবার সঠিক বেতন পেলেও সে বেতন নিয়মিত নয়। এভাবেই কষ্ট থাকতে হয় দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর। আবার অনেকের কোম্পানি ভালো বেতন দিচ্ছে। কিন্তু পরিবার ছাড়া একা থাকতে হচ্ছে। প্রবাসীদের কোন না কোন কষ্ট থেকেই যায়।
প্রবাসীরা জানান, প্রবাসীরা নীরবে কাঁদে, অঝোরে চোখের পানি ঝরায়। শত যন্ত্রণা সহ্য করে বিদেশেই পড়ে থাকে। তাদের এসব কষ্টের খবর প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে না। আপন মনে নিজের দুঃখ-কষ্টগুলোকে কবর দেয় তারা। নিজেদের সব বিসর্জন দিয়ে প্রিয়জনের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে সব সময় তারা। এমন করে কাটে দিনের পর দিন মাসের পর বছরের পর বছর। মন চাইলেও ঘরেও ফেরা হয় না তাদের। বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশে কাজের খোঁজে গেছেন তাদের অধিকাংশের অবস্থাই এমন। মাস শেষ হলে বেতন হাতে আসার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় সমস্ত খুশি বুঝি ফের তাদের আগলে ধরে। কিন্তু সেই বেতনের টাকা বেশিক্ষণ থাকে না নিজের কাছে। নিজের খাবার ও চলার মতো কিছু টাকা রেখে বাকি টাকা পাঠিয়ে দেয় পরিবারের কাছে। কেননা পরিবারের বাবা-মা, স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েরা সেই বেতনের আশায় বসে থাকে। বেতনের টাকা হাতে থাকে সর্বোচ্চ তিন-চার দিন। তারা ভাবে যত তাড়াতাড়ি পারা যায় টাকাটা পরিবার কিংবা বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছে দেই। প্রিয়জনের মুখে হাসি আর পরিবারের অবলম্বন এসব প্রবাসীকে তাই নিজের সুখের কথা ভুলে যেতে হয়।
টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার শাহীন মিয়া বলেন, এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার পর দলিল লেখকের সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে প্রায় ১ বছরের মতো কাজ করেন। সেখান থেকে যা আয় হতো পরিবারকে দেতো ও নিজের হাত খরচ চালাতেন। এভাবে চলছিল তার জীবন। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেন বিদেশে চলে যাবেন। তারপর পাসপোর্ট তৈরি করেন। এরপর দালালের কাছে পাসপোর্ট জমা দেন। দালাল তাকে জানান পাম্পের কাজে একটি ভিসা আসে। তিনি দালালের কাছে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা জমা দেন। তখন তার মনের মধ্যে ভয় হচ্ছিল দালালদের মাধ্যমে বিদেশে গেলে বেশির ভাগ মানুষ কাজ পান না, যাও পান ঠিক মতো বেতন পান না। সব চিন্তা মাথায় নিয়ে এরপর কাগজ পত্র ঠিকঠাক করে গত (২০ ফেব্রুয়ারি) সৌদিতে চলে আসেন। প্রথমে দাম্মাম শহরে ২ মাস পাম্পের কাজ করেন। এরপর কোম্পানি আরেকটি নতুন পাম্প তৈরি করে সেখান তাকে দেন। সেখানে বেসিক বেতন ও খাবারসহ ১২০০ রিয়াল বেতন পাচ্ছেন। আগের থেকে অনেক ভালো আছেন তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, বিদেশে আশা মানে পরিবারের মায়া, দেশের মায়া ত্যাগ করে আসতে হবে। এখানে নিজের বলতে কেউ নেই। নিজেকেই সব কাজ করতে হবে। তবে আমি বলবো এতো টাকা দিয়ে বিদেশে আসার থেকে দেশে কোন ব্যবসা করা অনেক ভালো। দেশে থাকলে পরিবার ও আত্নীয়-স্বজন সবার সাথে যোগাযোগ থাকবে, দেখা হবে। কিন্তু বিদেশে আসলে পরিবার ছাড়া ওইরকম কারো সাথে যোগাযোগ করা হয় না। ঘুম থেকে উঠেই ডিউটি, আবার ডিউটি থেকে আসার পর নিজে রান্না করা। প্রবাস জীবন মানেই কেউ কারো দিকে তাকানোর সময় নেই। এটাই হলো প্রবাস জীবন।
অপর প্রবাসী শরিফুল ইসলাম বলেন, দেশে থাকা অবস্থায় পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করতাম। নিজে চলতাম ও পরিবারকে দিতাম। অনার্স শেষ করে চাকরির জন্য ঘুরাঘুরি করেছি কিন্তু চাকরি হয়নি। এমন অবস্থা দেখে আমার বোন জামাই আমাকে পাসপোর্ট বানাতে বলে আমি পাসপোর্ট বানিয়ে ফেলি। বোন জামাই জানান তারা তিনজনে মিলে একটি জুসের দোকান দিয়েছেন। সেখানে বিভিন্ন রকম ফলের জুস তৈরি করতে হবে আমিও রাজি হয়ে গেলাম। দেড় বছর হয়েছে সৌদি আরবে আছি। দেশের কথা খুবই মনে পড়ে, কিন্তু কি করবো মন চাইলেই তো যেতে পারি না। পরিবার, বন্ধু বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের কথা খুবই মনে পড়ে। তবে এখন বুঝি দেশ ছেড়ে বিদেশে থাকা কতটা কষ্টকর। দেশে থাকলে নিজের স্বাধীন মতো চলাচল করেছি, ঘুরতে পেরেছি। কিন্তু এখন প্রতিদিন ১২ ঘন্টা ডিউটি করতে হয়। কোন ছুটি নেই। তবে যখন হাতে বেতন পাই তখন ভালো লাগে। মনকে বুঝাতে পারি পরিবারের জন্য এসেছি। তাদের টাকা দিতে পারবো তারা ভালো থাকবে।
আপনি দেশে আসবেন কত বছর এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেড় বছর হয়ে গেছে সৌদি এসেছি। এখন ইচ্ছে করলে তো যেতে পারি। কিন্তু টিকিটসহ সব খরচ নিজের বহন করতে হবে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। এদিকে আকামা বানাতে ৬ হাজার রিয়াল মুদ্রা লাগে। তিন মাস যাবত বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারি না। এসব খরচ যদি কোম্পানি বহন করতো তাহলে এই ৬ হাজার রিয়াল খরচ হতো না। আরও বেশি ভালো লাগতো চিন্তামুক্ত থাকতে পারতাম। তারপরও বলবো আকামাসহ সব খরচ বহন করেও অনেক ভালো আছি।
সখীপুর উপজেলার সবুজ ইসলাম বলেন, নিয়মিত কাজ করি একটি লেবার সাপ্লাই কোম্পানির মাধ্যমে। কিন্তু নিয়মিত বেতন পাই না। দুই-তিন মাস পরে একবার বেতন পাই। তাও আবার মাঝে মধ্যে সেটিও অনিয়মিত হয়ে পড়ে। শুধু আমি নয় এমন অবস্থা এখন অনেক প্রবাসী বাংলাদেশিদের । সৌদি আরবে কেমন আছেন- জিজ্ঞেস করা হলে সবুজ ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, সৌদি আরবে মনে হয় আর থাকা যাবে না। নিয়মিত কাজ করলেও নিয়মিত বেতন পাই না। নিজের ও পরিবারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। গত বছর ইকামা (রেসিডেন্ট পারমিট) দেশ থেকে সুদে টাকা এনে রিনিউ করেছিলাম প্রায় ৭ হাজার (টাকা) সৌদি রিয়াল দিয়ে। সেই দেনার টাকা এখনও শোধ করতে পারি নাই। এখন আবার ইকামা নবায়ন করতে প্রায় ১০ হাজার রিয়াল (টাকা) চেয়েছে ‘কফিল’। এই পরিমান অর্থ জোগার করা একেবারেই অসম্ভব।
এখন কী করবেন জানতে চাইলে সবুজ বলেন, ইকামা রিনিউ না করলে পুলিশের হয়রানির শিকার হতে হয়, এমন কি জেলেও যেতে হয়। এর থেকে দেশে ফিরে যাওয়াই ভালো। যারা সরাসরি কোম্পানির মাধ্যমে সৌদি আসে তাদের সব কিছু কোম্পানি বহন করে। আমার এক বন্ধু ভালো একটি কোম্পানিতে আছে। সে মাসে ২০০০-২৫০০ রিয়াল বেতেন পাচ্ছে। তারা অনেক সুখে আছে ভালো আছে। সবাই কষ্টে আছে তা না অনেকে মোটা অংকের বেতন পাচ্ছে। আবার অনেকে না খেয়ে দিন পার করছেন। আমার ভাগ্যটা খারাপ সেজন্য কষ্টের মধ্যে আছি।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সুমন মিয়া বলেন, আমি একটি হোটেলে কাজ করি তিন বছরে ধরে। আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এক বছর হয়ে গেছে। কোম্পানি আকামা বানিয়ে দিচ্ছে না। নিজের টাকা দিয়ে আকামা বানাবো সে ব্যবস্থাও করে দিচ্ছে না। ১৮০০ রিয়াল বেতন পাই। কিন্তু নিয়মিত বেতন দেন না। এক মাসের বেতন আরেক মাসে দেন। বাড়িতেও প্রতি মাসে টাকা দিতে পারি না। পরিবারের লোকজন মনে করছে টাকা নিজের একাউন্টে জমাচ্ছি। কারো মন রক্ষা করতে পাচ্ছি না, একটা টেনশনের মধ্যে সময় পাড় করি। দেশে চলে যাবো, গিয়ে কি করবো সে চিন্তাও করি। আমরা প্রবাসীরা কেমন আছি কেউ বুঝে না।
সখীপুরের শাকিল মিয়া বলেন, আমি দেশে কাপড়ের ব্যবসা করতাম, ব্যবসা ভালোই চলছিল। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম বিদেশে আসার জন্য। ৫ মাস ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছি। বেতনও ভালো পাচ্ছি। কিন্তু পরিবারের মায়া ত্যাগ করে বিদেশে থাকা অনেক কষ্টের। এখানে কেউ কারও দিকে তাকানোর সময় নেই। সারাদিন ডিউটি করে এসে রান্না করা। আবার সকালে ঘুম থেকে উঠে ডিউটি করা। এভাবেই দিন-রাত পার হচ্ছে। প্রতিদিন ডিউটি করতে হয়, কোন বন্ধ নেই। দেশে আগে ব্যবসা করতাম সেটাই ভালো ছিল এখন বুঝতেছি। নিজের ইচ্ছে স্বাধীন ছিলাম, যখন খুশি দোকান খুলতাম যখন ইচ্ছে বন্ধ করতাম। কারও কোন কৈফত দিতে হতো না। নতুন যারা বিদেশে আসতেছে তাদের উদ্দেশ্যে আমি বলবো। ৫-৬ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে না এসে দেশে ব্যবসা করুন, এতে নিজে ভালো থাকবেন। পরিবারের মায়া আত্মীয়-স্বজনদের মায়া ত্যাগ করে থাকতে হবে না। প্রবাস জীবন মানেই কষ্ট। সব কিছু ত্যাগ করে থাকতে হয়।