
নুর আলম, গোপালপুর ॥
যমুনা সেতু থেকে সরিষাবাড়ী রেললাইনের পশ্চিম পাশে গরিল্যা বিলের মাঝে আনুমানিক ১০ শতাংশ জমির উপর ভেসে থাকা দ্বীপ স্থানীয়দের কাছে “জুগীর ঘোপা” নামেই পরিচিত। এটি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল ইউনিয়নের মোহাইল গ্রামে অবস্থিত। জুগীর ঘোপা নিয়ে আধ্যাত্মিকতাসহ বিভিন্ন অলৌকিক কল্পকাহিনী স্থানীয়দের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে অপরাধের একটি বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, আধ্যাত্মিকতার আড়ালে এখানে বসে জুয়ার আসর, মাদক বিক্রি ও মাদক সেবন এবং পলাতক আসামিদের নিরাপদ আশ্রয়। এসব কর্মকাণ্ড নিরাপদে পরিচালনা করতে বেশ কিছুদিন আগে ঝাওয়াইল ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চার চালা টিনের ছাউনি, পাকা দেয়াল ও ফ্লোরসহ একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট নৌকা ছাড়া জুগীর ঘোপায় পৌঁছানোর অন্য কোনো উপায় নেই। তাই ইচ্ছে করলেই সেখানে পৌঁছানো কঠিন ব্যাপার।
এদিকে বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে পুলিশ ও প্রশাসন ঝাওয়াইল ইউনিয়নের দর্শনীয় স্থান যোগীর ঘোপায় মাদকবিরোধী যৌথ অভিযান চালায়। অভিযানে গোপালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তুহিন হোসেন, গোপালপুর সার্কেলের এএসপি ফৌজিয়া হাবিব খান, গোপালপুর থানার ওসি গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দীন, ঝাওয়াইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান, ঝাওয়াইল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ওয়াহিদুজ্জামান মিল্টন, স্থানীয় সংবাদকর্মী ও পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় ইউএনও তুহিন হোসেন জানান, গরিলা বিলের মাঝখানে অবস্থিত দ্বীপসম ঐতিহাসিক যোগীর ঘোপা খাস জায়গায় অবস্থিত। অভিযানের সময় যাদের পাওয়া গেছে মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এখন থেকে আর কোনো মাদকের আসর বসতে দেওয়া হবে না। সারা বছর নৌকায় বিল পাড়ি দিয়ে যোগীর ঘোপায় যাতে কেউ আর যাতায়াত করতে না পারে। সেজন্য কয়েকজন ঘাট মাঝিকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনাকাঙ্খিত কোন ঘটনা যাতে আর না ঘটে সেজন্য প্রতি বৃহস্পতিবার গরিলা বিলপাড়ে পুলিশি পাহারা বসানো হবে।

স্থানীয়রা জানান, প্রতি বৃহস্পতিবার সারাদিন এখানে সবচেয়ে বড় গাঁজা সেবনের আসর বসে। ওইদিন বিরতিহীনভাবে ৩টি নৌকা দিয়ে মাদকসেবীদের পারাপার করা হয়। সেদিন মান্নতের খিচুড়ি বিতরণ করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান, পার্শ্ববর্তী উপজেলা এবং গোপালপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা মাদকসেবীদের আগমন ঘটে। অনেক মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন রেললাইনের পাশে রেখে তারা জুগীর ঘোপায় যায়। আগত মানুষের সিংহভাগ তরুণ ও যুবক। এসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এলাকায় জিনিসপত্র চুরি বেড়েছে। এছাড়াও স্লিপারের সাথে রেললাইনের পাত আটকানোর ক্লিপ অধিকাংশ খুলে নিয়ে নেশাখোররা বিক্রি করে দিচ্ছে।
জুগীর ঘোপা নিয়ে লোকমুখে সবচেয়ে প্রচলিত কল্পকাহিনীর বিষয়ে স্থানীয়রা বলেন, কোনো অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে বাসন-কোসনের জন্য নগ্ন গায়ে ও নগ্ন পায়ে প্রার্থনা করলে সাথে সাথে প্রয়োজনীয় বাসন-কোসন পাওয়া যেত। অনুষ্ঠানের শেষে বাসনগুলো ধুয়ে মুছে ওই স্থানে ফেরত দিয়ে আসতে হতো। একবার একজন লোক সব বাসন ফেরত না দেওয়ায় পরবর্তী সময়ে আর বাসন পাওয়া যায়নি। তবে এই দাবির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

জানা যায়, ঘরের মধ্যে ৪টি গ্রুপ এবং ঘরের বাইরে ১৫ এর অধিক গ্রুপ গোল করে গানের আড্ডা ও জুয়ার আসর বসায়। নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা গাঁজা এবং গাঁজা প্রস্তুতির সরঞ্জাম সরবরাহ করে। সিন্ডিকেটের সদস্যরা কল্পকাহিনী শোনানোর এক পর্যায়ে জানান, এখানকার গাছের ডাল ভাঙলে মানুষের সাথে সাথে গলায় রক্ত বের হয়ে মৃত্যু হয়। কিন্তু বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গাছের ডাল ভাঙলেও বাস্তবে তেমন কিছুই হয় না। নৌকা চালক চাঁন মিয়া জানান, প্রফেসরের বাপে এখানে নিয়ন্ত্রণ করে! তিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। তবে সেই প্রফেসরের নাম তিনি বলেননি।
সত্যতা স্বীকার করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জানান, মোহাইল গ্রামের ছাত্রসমাজ কিছুদিন আগে মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু জুগীর ঘোপা নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট এতোটাই শক্তিশালী যে তাদের চাপে ছাত্রসমাজকে চুপ হতে হয়েছিল। এরা খুবই ক্ষমতাবান। ওখানে বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার মাদক ব্যবসা চলছে। আমি ওখানকার কর্মকাণ্ডের ঘোর বিরোধী। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ঘর নির্মাণের ব্যাপারে জানতে চাইলে বলেন, বর্তমান পরিষদের আমলে ঘর দেওয়া হয়নি, অনেক আগে হয়তো দিয়েছে। খতিয়ে দেখে বিস্তারিত জানাতে পারবো।






