সাদ্দাম ইমন ॥
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অন্তবর্তী সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। এরপরও কিছুতেই মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। লাগামহীনভাবে বাড়ছেই বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম। পণ্যের দাম বাড়লেও সেই হারে সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি, যার ফলে এখন নিম্ন আয়ের মানুষই শুধু নয়, মধ্যবিত্তরাও সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। গত আগস্টের শুরুতে সরকার বদলের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্র্বতী সরকার। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে অন্তর্র্বতী সরকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরাতে ঋণের সুদহার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলমান ডলার সংকটের মধ্যেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে জোর দেওয়া হয়েছে।
পেঁয়াজ ও আলু আমদানিতে শুল্ক কমানো, ডিম আমদানি শুরু করা, ডিম ও মুরগির দাম বেঁধে দেওয়া, চাঁদাবাজি রোধের উদ্যোগ, টিসিবির মাধ্যমে খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি বাড়ানো, পণ্য উৎপাদন ও সরবররাহ নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্র্বতী সরকার। এর পরও স্বস্তি ফিরছে না নিত্যপণ্যের বাজারে।
গত জুলাই ও অক্টোবরের বাজারদর ও টাঙ্গাইলের কাঁচাবাজারের দর পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত জুলাইয়ের তুলনায় অক্টোবরের খুচরা পর্যায়ে মোটা চাল ব্রি-২৮ ও পাইজাম প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১১ শতাংশ দাম বেড়ে মানভেদে ৬০ থেকে ৬৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিম ১৩ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়ে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির দামও কেজিতে ৯ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায় উঠেছে। বাজারে মাছের সংকট না থাকলেও ১২ থেকে ১৪ শতাংশ বেড়ে মাঝারি রুই মাছ প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে এখন সব ধরনের সবজির দাম চড়া।
সরকার পরিবর্তনের পর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন ও কাঁচাবাজারগুলোতে চাঁদাবাজি অনেকটা কমে যাওয়ায় বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমে গিয়েছিল। তবে মাস যেতে না যেতেই আবার ঘুরতে শুরু করেছে পরিস্থিতি।
এদিকে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে ডিম ও মুরগির দাম বেঁধে দিয়েছে, কিন্তু ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে বেঁধে দেওয়া দামের সুফল পাচ্ছে না ভোক্তারা। সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে মুরগিও বাড়তি দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে। ব্রয়লার মুরগি কেজি ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায় এবং সোনালি মুরগি ২৭০ থেকে ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু ব্রয়লার মুরগির নির্ধারিত দর প্রতি কেজি ১৭৯ টাকা ৫৯ পয়সা এবং সোনালি মুরগি ২৬৯ টাকা ৬৪ পয়সা।
অন্তর্র্বতী সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে ভারত থেকে ডিম আমদানি শুরু করেছে। তাতেও নামছে না দাম।
ভোক্তা সংগঠন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলেছে, সরকার ডিম-মুরগির যে দাম বেঁধে দিয়েছে তা ব্যবসায়ীদের মুনাফা বাড়াচ্ছে ঠিকই, ঠকাচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। এখনো বিগত পদ্ধতিতেই দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে, যাতে সরকার বদলালেও বদলায়নি বাজারের সিন্ডিকেট। উচ্চমূল্যে বিক্রি হওয়া আলু ও পেঁয়াজের দাম কমাতে গত (৫ সেপ্টেম্বর) নিত্যপ্রয়োজনীয় এ দুই পণ্যের আমদানি শুল্ক কমায় অন্তর্র্বতী সরকার। এর প্রভাবে গত প্রায় এক মাসে দেশের বাজারে আলু পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমেছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, শুল্ক কমালে সাধারণত দেশের বাজারে পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। যারা পণ্য মজুদ করে রাখে, তারা বাজারে পণ্য ছাড়ে। এ কারণে দাম কমে আসে। পেঁয়াজ ও আলুর ক্ষেত্রে অনেকটা এমনই ঘটেছে। ফলে আরো কিছু নিত্যসামগ্রী, যেগুলোর দাম অনেক দিন ধরে বাড়তি রয়েছে, সেগুলোর আমদানি শুল্ক কমানো গেলে ভোক্তাদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। দেশে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক দিন ধরেই চাপে রয়েছে সাধারণ মানুষ। কোটা আন্দোলনে উত্তাল জুলাইয়ে দেশের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল। আগস্টে ১ শতাংশেরও বেশি কমে মূল্যস্ফীতি, যদিও তা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। এখন যদি বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা যায়, সংকোচন নীতি ধরে রাখা যায়, ডলার সংকট কাটানো যায়, তাহলে আশা করা যায় শিগগিরই মূল্যস্ফীতি কমবে।
বাজার বিশ্লেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলেন, সাম্প্রতিককালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে চাল, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দামে। ব্যবসায়ীরা এখনো ঠিকমতো এলসি খুলতে পারছে না। এসব কারণে বাজারে সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বরাবরের মতোই সংকটের সুযোগ নিয়ে দাম বাড়াচ্ছে।