জাহিদ হাসান ॥
টাঙ্গাইল পৌরশহরে পার্কিং ব্যবস্থা না রেখে বহুতল ভবন মার্কেট এবং আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে পার্কিং না রেখে পৌর শহরের এসব ভবন নির্মাণ করায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে। শহরের বড় বড় সব মার্কেট শহরের প্রধান প্রধান সড়কের দুই পাশে অবস্থিত। পৌরসভার নিয়ম অনুযায়ী শহরের এই মার্কেটগুলোর আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ মার্কেটের নেই নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা। যার ফলে সড়কেই অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং করায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, পৌরসভার তদারকির অভাব এছাড়াও পৌরসভার দায়িত্বরত কর্মকর্তারা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা না রেখেই ভবন নির্মাণ করতে দিচ্ছেন মালিকদের। এছাড়াও পৌরসভার যেসব নিজস্ব মার্কেট রয়েছে সেগুলোতেও কোন পার্কিং ব্যবস্থা নেই। আবার যেসব ভবনে পার্কিং ব্যবস্থা রয়েছে সেগুলোও ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে না মার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা ক্রেতা সাধারণ। ফলে মার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা লোকজন রাস্তার উপর মোটর সাইকেল, গাড়ি রেখে কেনাকাটা করেন। যে কারণে শহরে ভয়াবহ যানজট তৈরী হচ্ছে। একই সাথে ফুটপাতে পথচারীদের চলাচলে তৈরী হচ্ছে চরম প্রতিবন্ধকতার। কারণ মোটরসাইকেল দিয়ে ফুটপাতও আটকিয়ে রাখা হচ্ছে।
টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রতিটি সুউচ্চ ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক। সেই অনুযায়ী প্রতিটি ভবন নির্মাণের নকশা প্রদান করে পৌরসভা। তবে মার্কেট নির্মাণ করার পর আন্ডারগ্রাউন্ডে পার্কিং ব্যবস্থা থাকলেও তা মার্কেটে আসা ক্রেতাদের ব্যবহার করতে দেয় না মার্কেট কর্তৃপক্ষ। উপরন্তু বাড়তি আয়ের লোভে এসব পার্কিংয়ের জায়গা গোডাউন হিসেবে ভাড়া দেয় মার্কেট মালিকেরা। এতে করে রাস্তার উপর গাড়ি পার্কিং করতে বাধ্য হচ্ছে ক্রেতারা।
সরেজমিনে পৌরশহর ঘুরে দেখা গেছে, পৌরসভার নিজস্ব যে মার্কেট রয়েছে ছয়আনি বাজার, পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে তিনতলা পৌরসভার মার্কেট, বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ মার্কেট, শওকত আলী তালুকদার মার্কেট, শামসুর রহমান মার্কেটসহ পৌরসভার একটি মার্কেটেও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। এছাড়া শহরের বেবিস্ট্যান্ড মোড় হতে পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, নিরালামোড় হতে আদালত চত্বর এবং পুরাতন বাসস্ট্যান্ড হতে নতুন বাসটার্মিনাল পর্যন্ত যতগুলো বহুতল ভবন আছে এরমধ্যে দুই একটি ছাড়া আর কোনটিতেই পার্কিং ব্যবস্থা নেই। আর যেগুলোতে পার্কিং ব্যবস্থা আছে সেগুলো গুদাম হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। আর যে সব মার্কেটের উপরে আবাসিক ভবন করা হয়েছে সেই সব মার্কেটে শুধুমাত্র মালিক ফ্লাট কিনে থাকেন। তাঁরা ছাড়া মার্কেটের ক্রেতারাদের কোন পার্কিংয়ের সুযোগ নেই।
টাঙ্গাইলে ব্যঙের ছাতার মতো যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ক্লিনিক। শহরের মেইন রাস্তার পাশেই এসব বহুতল ভবনে অবস্থিত ক্লিনিকগুলোতে কোন পার্কিং ব্যবস্থা নেই। রাস্তার মধ্যে গাড়ি রেখে তারা ক্লিনিকে যাচ্ছে। এতে করে যানজটও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নাগরপুর থেকে ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার নিয়ে মশিকুর রহমান তার স্ত্রীকে নিয়ে সেবা ক্লিনিকে এসেছেন ডাক্তার দেখাতে। সেখানে পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় গাড়ি রেখেছেন শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে। তিনি বলেন, ক্লিনিকে পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় অনেক দূরে গাড়ি রাখতে হয়েছে। হাটতে হয়েছে অনেক পথ। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তিনি। ব্যাংক কর্মকর্তা মাহমুদুল হক বিপু বলেন, কেনাকাটা করতে এসে মোটরসাইকেল রাখতে হয় অনেক দূরে। ফুটপাতে রাখলে হকাররা বাঁধা দেন। আবার রাস্তায় রাখলে যানজট হয়। তারপর মার্কেটে ঢুকে সব সময় বাইক চুরির ভয়ে থাকি। ফিরে এসে বাইক পাব কিনা। মার্কেটে ভালো পার্কিং ব্যবস্থা থাকলে চিন্তায় পরতে হতো না।
টাঙ্গাইল পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিধ শহিদুল ইসলাম বলেন, পার্কিং ব্যবস্থা রেখেই পৌরসভা থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়। মালিকরা ভবন করার সময় আর পার্কিং রাখেন না। আর যারা রাখেন তারা গুডাউন অথবা দোকানের জন্য ভাড়া দেন। এ বিষয়ে পৌরসভা থেকে অভিযান চালিয়েও কোন লাভ হয় না।
এদিকে পৌরসভার অনুমোদন না নিয়েই শহরে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। বহুতল দালান নির্মানের সাথে জড়িতরা নিয়ম না মেনে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ করছে। পৌরসভার অনুমোদনের তোয়াক্কাই করছেন না কেউ। ইতিমধ্যে পৌরসভা বিন্দুবাসিনী গার্লস হাইস্কুল রোডে বাংলা প্যালেস, রেজিস্ট্রিপাড়ায় আরপি টাওয়ার, আদালত পাড়ায় মালঞ্চ টাওয়ার, বিবি গাার্লস রোডে আমানত টাওয়ার, রেজিস্ট্রিপাড়ায় ভৌমিক টাওয়ার, মদিনা টাওয়ার, বিশ্বাস বেতকায় স্পন্দন টাওয়ার, সাবালিয়ায় বাইতুল টাওয়ার, বিসমিল্লাহ টাওয়ার, বেড়াবুচনাায় সমুদ্র বিলাস, নূর ম্যানসন, মডেল সিটি, সাবালিয়ায় ড্রীম প্যালেস, কলেজপাড়ায় স্বর্নলতা টাওয়ার, উপজেলা রোডে ছবুর-ছাহেরা টাওয়ার, সাবালিয়ার একুশে টাওয়ারসহ ৬৬টি বহুতল ভবনকে নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার জন্য চিঠি দিয়েছে। এসব টাওয়ারের মালিকরা অনুমোদন না নিয়েই শুধু আবেদন করেই পৌরসভার কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ভবন নির্মাণ করেছেন।
টাঙ্গাইল জেলা ব্যবসায়ী ঐক্যজোটের সভাপতি আবুল কালাম মোস্তফা লাবু যানজটের জন্য পৌরসভাকে দায়ি করে বলেন, পৌরসভার সাবেক মেয়ররা অন্তহীন অপরাধ করে আজ তারা পালিয়েছে। দু’হাতে টাকার পাহাড় বানিয়ে তাঁরা নিজেরাই আইন ভঙ্গ করেছেন। তাদের নিজস্ব মার্কেটেই কোন পার্কিং ব্যবস্থা রাখেনি। তারা বিভিন্ন মার্কেটের টয়লেটকে দোকান বানিয়ে বানিজ্য করেছে। এর সুযোগ নিয়েছে আবাসিক ভবন ও বিভিন্ন মার্কেটের মালিকরা।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রশাসক শিহাব রায়হান (উপ সচিব) বলেন, নতুন ভবনের অনুমোদনের জন্য আবেদন করেই আট তলা, ১০ তলা ভবন নির্মাণ করছে। আইন না মানার একটি প্রবনতা শুরু হয়েছে। আইন অম্যান্যকারীদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়াও পৌরসভার মার্কেটগুলো নির্মাণ হয়েছে বহু আগে। তখন হয়ত এভাবে পার্কিয়ের ব্যবস্থা চিন্তা করা হয়নি। নতুন কোন মার্কেট হলে অবশ্যই পার্কিং ব্যবস্থা রাখা হবে। এছাড়া পৌরসভার অনুমোদন নিয়ে যারা ভবনে পার্কিং ব্যবস্থা রাখেনি খুব দ্রুতই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।