
ঘাটাইল প্রতিনিধি ॥
টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা প্রশাসনের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়ের সূচনা হয় ২০২৫ সালের (২৪ ফেব্রুয়ারি)। সেদিন ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৩৬তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের মেধাবী, কর্মঠ ও মানবিক কর্মকর্তা আবু সাঈদ। এর পূর্বে গত ২০২৪ সালের (১৪ নভেম্বর) ধনবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে প্রথম দায়িত্ব নেন। প্রথম ইউএনও হিসেবে ধনবাড়িতে ১শত দিন দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে তার উপর গুরু দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে চলতি বছরের (২৪ ফেব্রুয়ারী) ধনবাড়ি উপজেলা থেকে ঘাটাইলের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তাঁর নিরলস পরিশ্রম, বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বদলে গেছে ঘাটাইলের প্রশাসনিক চিত্র। উন্নয়ন, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জনকল্যাণের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি প্রমাণ করেছেন একজন দক্ষ প্রশাসক চাইলে কীভাবে একটি উপজেলা হয়ে উঠতে পারে দেশের অনুকরণীয় মডেল।
যশোর জেলার মনিরামপুর থানার ঢাকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করা এই মেধাবী কর্মকর্তা ২০০২ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি ও ২০০৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। পিতা মৃত আজাহার আলী সরদার ছিলেন একজন সমাজসেবক, মাতা মৃত রওশন আরা বেগম ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী নারী। নয় ভাই-বোনের মধ্যে কনিষ্ঠ আবু সাঈদ শৈশব থেকেই ছিলেন মেধাবী ও নেতৃত্বগুণে উজ্জ্বল। তিনি বর্তমানে স্ত্রী ফাতিমা খাতুন ও একমাত্র পুত্র রাফিউন বিন সাঈদকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন এক আদর্শ পরিবার। তার কর্মজীবনের শুরু উদ্যোক্তা হিসেবে, পরবর্তীতে বিগত ২০১৭ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ এবং ২০১৮ সালে ৩৬তম বিসিএসের মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান এই সময়ের প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল নিষ্ঠা ও কর্মপ্রেমের প্রতীক।
ঘাটাইলে যোগদানের পর প্রথমেই তিনি নজর দেন পরিবেশ রক্ষায়। উপজেলায় ৪১টি ইটভাটার মধ্যে অধিকাংশেরই ছিল পরিবেশ ছাড়পত্রহীন। মাত্র দুই মাসে তিনি পরিচালনা করেন কঠোর অভিযান, আদায় করেন ৩৪ লাখ টাকা জরিমানা এবং বন্ধ করে দেন একটি অবৈধ ইটভাটা। এর ফলে বন্ধ হয়েছে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি ও বায়ুদূষণের ভয়াবহতা। এরপর শুরু হয় উঠতি বয়সী তরুণদের অনলাইন জুয়া ও মাদকাসক্তি রোধে সামাজিক সচেতনতা অভিযান। তিনি নিজে মসজিদে গিয়ে মুসল্লিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন, স্কুল-কলেজে সচেতনতা সভা করেন, বিভিন্ন চায়ের দোকান ও উঠান বৈঠকে অংশ নিয়ে তরুণ সমাজকে উৎসাহিত করেন সৎ পথে চলতে। অবৈধভাবে পাহাড়ি মাটি কাটা বন্ধেও তিনি দেখিয়েছেন কঠোর প্রশাসনিক দৃষ্টান্ত। নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও জরিমানা দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, পরিবেশ ধ্বংসে কেউ ছাড় পাবে না। দিনরাত পাহারা দিতে গ্রাম পুলিশ নিয়োগ এবং রাত্রীকালীন অভিযান পরিচালনা করে তিনি ঘাটাইলের পাহাড়ি মাটি কাটা প্রায় শূন্য পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন। এখন ইটভাটা মালিকরাই বলছেন, “ঘাটাইলে মাটি পাওয়া এখন স্বপ্নের মতো। এসএসসি পরীক্ষায় নকল বন্ধে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপ সারাদেশে প্রশংসিত হয়েছে। যোগদানের মাত্র দুদিন পর তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রকাশ করেন একটি “খোলা চিঠি”, যা আলোড়ন তোলে সচেতন অভিভাবক সমাজে। প্রতিটি কেন্দ্রে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, শিক্ষক-অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় এবং কঠোর তদারকির ফলে ঘাটাইলে এবারের এসএসসি পরীক্ষা হয়েছে সম্পূর্ণ নকলমুক্ত। তিনি বিশ্বাস করেন “সুশাসনের শুরু সচেতন নাগরিক থেকে।” তাই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা রোধে তিনি চালু করেন “মোবাইল ট্রাফিক স্কুল”। হেলমেটবিহীন চালক ও লাইসেন্সবিহীন যুবকদের বিরুদ্ধে শুরু হয় ১৫ দিনের অভিযান। পাশাপাশি চালু হয় সচেতনতা ক্যাম্পেইন, যেখানে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় ট্রাফিক সংকেত, সড়ক পারাপারের নিয়ম এবং আইন মানার গুরুত্ব। ফলে দুর্ঘটনার সংখ্যা দৃশ্যমানভাবে কমে আসে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফেরাতে তিনি নিজেই মাঠে নেমেছেন। আকস্মিক পরিদর্শন, অভিভাবক সমাবেশ ও শিক্ষক মিটিংয়ের ফলে এখন স্কুলগুলোতে উপস্থিতি বেড়েছে, শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে পাঠদানের প্রাণচাঞ্চল্য। তিনি প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়া রোধে ২০টি বিদ্যালয়ে প্লে গ্রাউন্ড নির্মাণের কাজ হাতে নিয়েছেন। তথ্যপ্রযুক্তিকে জনগণের সেবায় কাজে লাগিয়ে তিনি তৈরি করেছেন ঘাটাইল উপজেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ যা এখন ঘাটাইলবাসীর অভিযোগ, প্রস্তাব ও সমস্যা জানানোর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। অভিযোগের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে তিনি নিজেই আইডিটি পরিচালনা করেন।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গুণগত মান রক্ষায়ও তিনি নিজেই মাঠে যান। প্রতিটি প্রকল্পের শুরু থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত তিনি ছবি ও অগ্রগতি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেন। এতে কাজের গতি ও মান দু’টোই বেড়েছে বহুগুণ।
সম্প্রতি তিনি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীদের উন্মুক্ত বাছাই কার্যক্রম চালু করেছেন, যেখানে আবেদনকারীরা সরাসরি জেনে নিতে পারছেন তাঁদের যোগ্যতার অবস্থা। এই পদক্ষেপ ঘাটাইলকে করেছে সারাদেশের সামনে স্বচ্ছ প্রশাসনের উদাহরণ।
ঘাটাইলবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তিনি গ্রহণ করেছেন “সাগরদীঘি বিনোদন কেন্দ্র ও রেস্টহাউস” নির্মাণ প্রকল্প। এটি বাস্তবায়িত হলে ঘাটাইল হবে পর্যটনের নতুন গন্তব্য। পাশাপাশি রমজান মাসে সাধারণ ভোক্তার সহায়তায় চালু করেছেন “স্বল্পমূল্যের ডিমের বাজার”, যা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অনন্য উদ্যোগ। তিনি মনে করেন, আইন মানা এক সুনাগরিকের পরিচয়। তাই ট্রাফিক ও সড়ক নিরাপত্তায় চার ধাপে শুরু করেছেন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রথম ধাপে ২৫০ জন ইজিবাইক ও অটোরিকশা চালক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, দ্বিতীয় ধাপে চলছে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ, তৃতীয় ধাপে সাধারণ জনগণের জন্য ট্রাফিক সচেতনতা এবং চতুর্থ ধাপে অনলাইন কুইজ ও পুরস্কার প্রদান। ঘাটাইলের সাগরদীঘিকে কেন্দ্র করে তিনি গড়ে তুলছেন পর্যটন সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। কৃষি, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা কাজে লাগিয়ে এখানে গড়ে তোলা হচ্ছে রেস্টহাউস, বিনোদন কেন্দ্র ও হ্রদভিত্তিক প্রকল্প-যা ঘাটাইলকে উত্তর টাঙ্গাইলের পর্যটন হাবে পরিণত করবে। অবকাঠামো উন্নয়নেও তিনি দিয়েছেন গতি। অসংখ্য কাঁচা রাস্তা পাকাকরণের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় করে তৈরি করছেন অগ্রাধিকারভিত্তিক তালিকা। এতে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে, স্কুল-কলেজে যাতায়াত হবে নিরবচ্ছিন্ন, আর গ্রামীণ অর্থনীতি পাবে নতুন প্রাণ।
জনগণের দোরগোড়ায় প্রশাসনকে পৌঁছে দিতে তিনি চালু করেছেন নিয়মিত গণশুনানি প্রতি বুধবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। যেকোনো মানুষ সরাসরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এসে সমস্যা জানাতে পারেন, আর প্রতিদিনই তাঁর দরজা থাকে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত। ঘাটাইল পৌরসভায় প্রথমবারের মতো তাঁর উদ্যোগে শুরু হয়েছে এলইডি লাইট স্থাপন, যা পর্যায়ক্রমে পুরো পৌর এলাকাকে আলোকিত করবে। অল্প সময়েই ঘাটাইলের প্রতিটি মানুষ উপলব্ধি করছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাঈদ শুধু একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন, তিনি এক অনুপ্রেরণার প্রতীক। তাঁর নেতৃত্বে ঘাটাইল এখন হয়ে উঠছে শৃঙ্খলিত, আধুনিক ও সেবামুখী একটি প্রশাসনিক ইউনিট। তাঁর কর্মদক্ষতা, সততা ও মানবিকতা ঘাটাইলকে দিয়েছে উন্নয়নের গতি, মানুষের মনে জাগিয়েছে আস্থা। তিনি আজ প্রমাণ করেছেন একজন যোগ্য ও সৎ প্রশাসকের হাতে বদলে যেতে পারে একটি পুরো উপজেলা।






