
স্টাফ রিপোর্টার ॥
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের তিনটি প্রধান ভূ-ফাটলের মধ্যে প্রথমটি টাঙ্গাইলের ‘মধুপুর ফল্ট’ নামে পরিচিত। এ কারণে টাঙ্গাইল ও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঝুঁকিতে রয়েছে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ঘটতে পারে মহাবিপর্যয়। ওই বিপর্যয় মোকাবিলার সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। মধুপুর গড় ও মধুপুর ভাওয়াল প্রায় আড়াই বিলিয়ন বছর আগে গঠিত হয়েছিল। প্লেটগুলো মাটির নিচে নড়াচড়া করছে। যেকোনো সময় পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষ হতে পারে। অতীতে এসব এলাকায় প্লেট চলাচলের ঘটনা ঘটেছে। ফলে মধুপুর গড় ও ভাওয়াল এলাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে। যার ফলে ব্রহ্মপুত্র নদ তার গতিপথ পরিবর্তন হয়ে নতুন ব্রহ্মপুত্র তৈরি হয়েছিলো।
এদিকে শুক্রবারের (২১ নভেম্বর) ভূমিকম্পের পরদিন শনিবার (২২ নভেম্বর) ফের দু’দফা ভূমিকম্প হয়েছে। যা মধুপুর ফল্টের ১০০ কিলোমিটারের আওতাধীন। কয়েক দফা ভূমিকম্পে দেশে অন্তত ১১ জন নিহত ও কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। ১০০ বছর পরপর বড় ধরনের ভূমিকম্প হলেও ১১০ বছর পর এবার ভূমিকম্প হলো। সব মিলিয়ে টাঙ্গাইলসহ সারা দেশের মানুষের মধ্যে এখনো আতঙ্ক কাটেনি।
গত বছরের জুনে রাজউকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মধুপুর ফল্টে ৬ দশমিক ৯ তীব্রতার ভূকম্পনে ঢাকার আট লাখ ৬৪ হাজার ৬১৯টি থেকে ১৩ লাখ ৯১ হাজার ৬৮৫টি ভবন ধসে বা ভেঙে পড়তে পারে। যা মোট ভবনের ৪০ দশমিক ২৮ থেকে ৬৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ঢাকায় ভবন ধসের আশঙ্কার এ সর্বনিম্ন ও সর্বাধিক শতাংশের গড় করলে দাঁড়ায় ৫২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০১২ সালে এক ভূমিকম্পে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার অরণখোলা ইউনিয়নের বোকারবাইদ গ্রামে এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ফাটল দেখা দিয়েছিল। যার ব্যাস ছিল ৫-৬ ইঞ্চি এবং গভীরতা ছিল ২৫ থেকে ২৬ ফুট। সেসময় থেকেই মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
টাঙ্গাইল মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এএসএম সাইফুল্লাহ বলেন, মধুপুরের ফল্টটি অনেক পুরোনো। প্রায় ১০০ বছর হয়েছে, এখানে বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প হয়নি। আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ছোট ছোট ভূমিকম্পের পরই বড় ধরনের ভূমিকম্পের বার্তা দেয়। যে কারণে মধুপুর ফল্টের আওতাধীন এলাকাগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়। এর প্রভাব পড়তে পারে চারদিকে ১০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে। এর আগে ভূমিকম্প হয়ে মধুপুরে বড় ফাটল হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের নগরায়নে যে বহুতল ভবন করা হয়, সেখানে বিল্ডিং কোড মানা হয় না। টাঙ্গাইল শহরেও না, ঢাকা শহরেও না। বহুতল ভবনের উচ্চতা অনুযায়ী চারপাশে জায়গা রাখার কথা, সেগুলোও মানা হয় না। একবার ভূমিকম্প হলে অনেক আলোচনা হয়। পরে তা কার্যকর হয় না। প্রতিটি বিল্ডিংয়ের পাশে অতিরিক্ত জায়গা থাকার কথা। কিন্তু আমাদের দেশে এক বিল্ডিংয়ের সঙ্গে আরেক বিল্ডিং লাগানো। মানুষ বিল্ডিং থেকে বের হয়ে যাবে কোথায়? বাধ্য হয়ে ওই লোকটি ভবনের নিচে চাপা পড়ে মারা যাবে। এসব বিষয়ে মানুষকেও সচেতন করা হয় না এবং গুরুত্বও দেওয়া হয় না। দেশে ভূমিকম্প মোকাবিলার সক্ষমতা নেই। টাঙ্গাইল অঞ্চল ভূমিকম্প প্রবণ এলাকার মধ্যে পড়ে। আর্থ সামাজিক পরিবর্তনের সাথে কথা গত কয়েক বছর ধরে জেলায় বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এসব ভবনগুলো ধসে প্রচুর প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। একই সাথে মালামালের ক্ষতি হবে অকল্পনীয়।
টাঙ্গাইল ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক জানে আলম বলেন, ভূমিকম্পে কিছু ক্ষতি চোখে দেখা যায় আবার কিছু ক্ষতি দেখা যায় না। শুক্রবার (২১ নভেম্বর) যে ভূমিকম্প হয়েছে এ মাপের ভূমিকম্প আবার হলে কয়েকগুণ বেশি ক্ষতি হবে। কারণ অনেক ভবন দুর্বল হয়ে গেছে, যা চোখের দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে না। এটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তিনি আরও বলেন, টাঙ্গাইলের মধুপুর, ধনবাড়ী, ঘাটাইল, সখীপুরসহ আশপাশের ফায়ার সার্ভিস অফিসে সবচেয়ে বেশি দক্ষ ও কর্মঠ কর্মীদের পদায়ন করা আছে।
টাঙ্গাইল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্তৃপক্ষ আরও বলেন, ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি উদ্ধারে তাদের সক্ষমতা বেড়েছে। এ পর্যন্ত ৫৮০ জন স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা ভূমিকম্প পরবর্তী চিকিৎসা সেবা ও উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। তার উপরে জেলা শহরে নিয়ম-নীতি না মেনেই তৈরি হচ্ছে উঁচু ভবন। ভবন নির্মাণে সরকারি নিয়মকানুন কেউ মানছে বলে মনে হয় না। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হবে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শরীফা হক বলেন, বহুতল ভবন নির্মাণ তদারকির জন্য একটি কমিটি রয়েছে। কমিটি সর্বদা চেষ্টা করে যে সকল নিয়মকানুন বিল্ডিং মালিকরা মেনে চলে কি-না।






