
স্টাফ রিপোর্টার ॥
সখীপুর উপজেলা বিএনপি থেকে নেতাদের পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে। সেই সাথে সখীপুরে বিএনপির রাজনীতিতে তোলপাড় চলছে। টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর-বাসাইল) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আহমেদ আযম খানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার অভিযোগ এনে বুধবার (২৬ নভেম্বর) দুপুর পর্যন্ত দলের ১১ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন। এছাড়া একই অভিযোগ এনে সখীপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের আরও দুই শতাধিক পদধারী নেতা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সম্প্রতি অব্যাহতি পাওয়া সখীপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান সাজু। তারা গত (২১ নভেম্বর) থেকে (২৫ নভেম্বর) রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময় পদত্যাগ করেন। তাদের পদত্যাপত্রটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করলে নানা আলোচনা ও সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের এই পদত্যাগপত্রের অনুলিপি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ জেলা বিএনপির কাছে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখীপুর) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান। গত রোববার (২৩ নভেম্বর) রাতে সখীপুর সরকারি কলেজ মোড়ের এক নির্বাচনী সভায় তিনি বলেন, আমি নিজেই যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা, সারা জীবন মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করে এসেছি এবং করে যাব। তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। কয়েকটি ফেসবুক আইডি থেকে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
সখীপুর উপজেলার কয়েকজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আহমেদ আযম খান দীর্ঘদিন ধরেই সখীপুর-বাসাইলের রাজনীতিতে সক্রিয়। তবে তিনি মুক্তিযোদ্ধা, এ তথ্য আগে কখনো আমাদের জানা ছিল না। তারা বলেন, হয়তো তাদের তথ্য অসম্পূর্ণ থাকতে পারে, তবে আহমেদ আযম খান একজন মুক্তিযোদ্ধা, এমন দাবির কথা এর আগে শোনা যায়নি।
সখীপুর উপজেলার একটি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমি সক্রিয় আঞ্চলিক (বাসাইল অঞ্চলের) সংগঠকদের মধ্যে একজন ছিলাম। আমি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হই তখনকার আমাদের যিনি ছাত্রনেতা ছিলেন, খন্দকার আব্দুল বাতেনের সঙ্গে। আমরা যাঁরা খন্দকার আব্দুল বাতেনের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত ছিলাম, তাঁদের কেউই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতাপ্রাপ্ত নই এবং তালিকাভুক্তও নই। কারণ উনি (আব্দুল বাতেন) কোনো স্বীকৃত সাবসেক্টর কমান্ডার ছিলেন না। আমরা তখন তুখোড় ছাত্র রাজনীতি করেছি। এই দেশ স্বাধীনের জন্য ভূমিকা পালন করেছি। কোনো ভাতার জন্য চিন্তা করে এসব করিনি।
আহমেদ আযম খান আরও বলেন, এর আগে আওয়ামী লীগের সময়েও আমি বিভিন্ন টক শোতে অনেকবার নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলাতে ডিজিএফআইয়ের কথা শুনেছি। তাঁরা বাসাইল ও সখীপুরে তদন্ত করতে এসেছে যে, আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি কি-না। কিন্তু আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি এবং মুক্তিযুদ্ধের একজন আঞ্চলিক সংগঠকও ছিলাম।
এদিকে টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর-বাসাইল) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আহমেদ আযম খানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার অভিযোগ এনে দলের ১১ জন নেতা পদত্যাগকারীরা হলেন- সখীপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল বাসেদ, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আবদুল মান্নান, বিএনপির সদস্য আশরাফুল আলম, গজারিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুর রউফ, বহুরিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লতিফ মিয়া, সম্প্রতি অব্যাহতি পাওয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান সাজু, গজারিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব মজিবর ফকির, গজারিয়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক রবিউল আউয়াল, সদস্য সচিব বিপ্লব, একই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ, দাঁড়িয়াপুর ইউনিয়ন যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজিদুর রহমান।
আহমেদ আযম খান বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখীপুর) আসনে এবার বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। তিনি এর আগে বিগত ২০০১ ও ২০০৮ সালে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছিলেন।
বিএনপির নেতাদের অভিযোগ, আহমেদ আযম খান নির্বাচনে ভোট টানতে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কয়েক দফা গোপন বৈঠক করেছেন। দলীয় বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা, সভা-সমাবেশে তাঁরা (আওয়ামী লীগ) সামনের সারিতে বসছেন। কেউ কেউ বক্তব্য দিচ্ছেন। তাঁদের অধিকাংশ নেতার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্রদের ওপর হামলার অভিযোগে মামলা আছে। ১১ জন বিএনপি নেতার পদত্যাগপত্র একই ধরনের। ভাষা এক ও অভিন্ন।
পদত্যাগ প্রসঙ্গে সখীপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল বাছেদ বলেন, কিছুদিন ধরে লক্ষ করছি, আহমেদ আযম খান আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে ভোট পাওয়ার আশায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুরুত্ব বেশি দিচ্ছেন। তাঁদের সামনের সারিতে চেয়ার দিচ্ছেন। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে নেতা আমাদের বহিষ্কারের হুমকি দিচ্ছেন।
সম্প্রতি দল থেকে অব্যাহতি পাওয়া সখীপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাজাহান সাজু বলেন, আহমেদ আযম খান অতি সম্প্রতি টাঙ্গাইল জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক খালেক মণ্ডলকে হুমকি ও গালাগাল করেছেন। আহমেদ আযম খান মুক্তিযুদ্ধের ৫৪ বছর পর হঠাৎ নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রচার করছেন। গত ১৭ বছর দলের জন্য জেল-জুলুম খেটেছি। আওয়ামী লীগের নির্যাতন সহ্য করেছি। তিনি সেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করছেন। তাঁদের সামনের সারিতে স্থান দিচ্ছেন। নেতার এসব কর্মকাণ্ডে আমরা অপমানিত বোধ করছি। আমরা আহমেদ আযম খানের দলীয় মনোনয়ন বাতিল দাবি করছি। তা না হলে আজকালের মধ্যে বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের আরও দুই শতাধিক পদধারী নেতা সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগ করবেন। ইতিমধ্যে তাঁরা আমার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
সখীপুর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নাজিম উদ্দিন বলেন, দলকে বিতর্কিত করতে আমাদের দলের ভেতর একটি পক্ষ গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। আহমেদ আযম খানকে বিতর্কিত করার জন্য একজন শিল্পপতি ইতিমধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে দান-অনুদানের নামে টাকা ছড়াচ্ছেন। আর যাঁরা পদত্যাগ করেছেন, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাঁদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ছিল। বিষয়টি টের পেয়ে তাঁরা বহিষ্কৃত হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন।
এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল বলেন, চার জনের পদত্যাগ পত্র হাতে পেয়েছি। এটা ভুল বোঝাবুঝির কারণে এমনটা হয়েছে। ধানের শীষের প্রার্থীর জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে। ইনশাআল্লাহ আবার সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখীপুর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান বলেন, আমার বিরুদ্ধে, বিএনপির বিরুদ্ধে, ধানের শীষের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। জনগণ এবার ঐক্যবদ্ধ আছে, কোনো ষড়যন্ত্রই ধানের শীষের বিজয় ঠেকাতে পারবে না। আমি অতীত ও বর্তমানে কোনো দিন আওয়ামী লীগকে কখনো পুনর্বাসন করিনি, ভবিষ্যতেও করব না। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটি কুচক্রী মহল অনৈতিকভাবে দুই-একজন বহিষ্কৃত নেতাদের মাধ্যমে কিছু নেতাকর্মীকে অনুরোধ করে আবার কিছু নেতাকর্মীকে জোর করে স্বাক্ষর করিয়েছে বলে আমি শুনেছি।






