
বিশেষ রিপোর্টার ॥
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ১৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায় ৪৯ একর জমিতে নির্মিত হচ্ছে বিসিক শিল্প পার্ক (শিল্পনগরী)। ইতিমধ্যে জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণসহ অন্যত্র সরিয়ে দিয়ে জমির ওপর মাটি ভরাটের কাজ করা হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে বিগত ২০১৫ সালে ১৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ‘বিসিক শিল্প পার্ক’ স্থাপনের উদ্যোগ নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। প্রকল্প গ্রহণের দুই বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৫ সালে এসেও সমাপ্ত হয়নি এর কাজ। বরং প্রকল্প শেষ করতে আগামী ২০২৭ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে ব্যয় প্রাক্কলন। প্রশ্ন উঠেছে- দুই বছরের প্রকল্প কেন দশ বছরেও শেষ করা যায়নি? কেন লাগছে এক যুগ, কেন বাড়ছে ব্যয়? কেন জনগণের প্রদানকৃত করের টাকার এমন যাচ্ছেতাই ব্যবহার? উদাসিনতা আসলে কার?
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলায় স্থানীয়ভাবে শিল্প কারখানা গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে শিল্পপার্ক গড়ে তুলতে কাজ করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকার পার্শ্ববর্তী টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই ইউনিয়নের মমিননগরে ৪৯ দশমিক ৩৫ একর জমিতে শিল্প পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বিগত ২০১৫ সালের (১ সেপ্টেম্বর) এ প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় তৎকালীন সরকার। কিন্তু একটি প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে যে ধরনের পরিকল্পনা, ডিজাইনসহ সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয় এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে তার কিছুই হয়নি। ফলে বিগত ২০১৫ সালে জুলাই থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়ন মেয়াদ ধরা হলেও, শুধু জমি অধিগ্রহণেই সময় লেগেছে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রকল্পের মেয়াদ শেষে আরও ৫ বছর পর জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এক্ষেত্রে যেমন উদাসীন ছিল শিল্প মন্ত্রণালয় তেমনি ছিল স্থানীয় সরকারের পক্ষ থেকেও।
প্রকল্পের নথিপত্র থেকে দেখা যায়, বিগত ২০১৫ সালে নেওয়া প্রকল্প সর্বশেষ গত (১০ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত একনেক সভায় তৃতীয় সংশোধনী দিয়ে উপস্থাপন ও অনুমোদিত হয়। এর মধ্যে প্রকল্প সমাপ্তের মেয়াদ ৬ ধাপে বাড়ানো হয়েছে। এই সময়ে ১৬৪ কোটি টাকার প্রকল্প ছাড়িয়েছে ৩৮৪ কোটি টাকার বেশি। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জীভূত ব্যয় ২৭০ কোটি টাকা বা ৭৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। অপরদিকে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৭২ শতাংশ বলা হলেও চলমান আছে ভূমি উন্নয়নের কাজ।
প্রকল্পের প্রধান প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে ছিল- ৪৯ দশমিক ৩৫ একর ভূমি অধিগ্রহণ, ১৪ লাখ ৩ হাজার ৮৬৩ ঘনমিটার ভূমি উন্নয়ন, ৯৫টি শিল্প প্লট স্থাপন, ৩৯৪ বর্গমিটার প্রশাসনিক ভবন (অনাবাসিক) নির্মাণ, ৪৬ দশমিক ৫০ বর্গমিটার পাম্প ড্রাইভার কোয়ার্টার (আবাসিক) নির্মাণ, শিল্প পার্কের একটি প্রধান গেট নির্মাণ, ১ হাজার ৩৫ বর্গমিটার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, ২৩ হাজার ৮৭২ বর্গমিটার গ্রামীণ সড়ক (কার্পেটিং রাস্তা) নির্মাণ, ৪ হাজার ৮৯২ বর্গমিটার নিকাশ কাঠামো (আরসিসি ড্রেন), ৫টি কালভার্ট, ১ হাজার ৫৫২ বর্গমিটার ডাম্পি ডকইয়ার্ড নির্মাণ, ১ হাজার ১৩০ মিটার রিটেইনিং ওয়াল, পুকুর পাড়ে ১২শ’ বর্গমিটার স্লোপ প্রোটেকশন, ১টি নলকূপ স্থাপন, ৩ হাজার ৮৬০ মিটার পানি সরবরাহ লাইন, বিদ্যুৎ সংযোগ, গ্যাস সংযোগ স্থাপন এবং একটি সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন। কিন্তু এসব কার্যক্রমের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়া তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।
প্রকল্পটি তৃতীয় সংশোধনীর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে- জেলা প্রশাসন হতে জমি হস্তান্তরে বিলম্ব, সর্বোচ্চ বন্যা লেভেল বিবেচনায় ভূমি উন্নয়নকাজের পরিমাণ ও ব্যয় বৃদ্ধি, পূর্ত কাজসমূহের বিভিন্ন অঙ্গের পরিমাণ ও ব্যয় হ্রাস/বৃদ্ধি, আবর্তক (রাজস্ব) খাতের বিভিন্ন অঙ্গের ব্যয় হ্রাস/বৃদ্ধি, প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গের আইবাস কোড পরিবর্তন। অথচ ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়, সর্বোচ্চ বন্যা লেভেল নির্ধারণ ইত্যাদি প্রকল্প গ্রহণের সময়েই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন ছিল। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে না পারায় দীর্ঘ এক দশকে সব পণ্যেরই দাম বেড়েছে। পরিবর্তন হয়েছে পূর্বের রেট সিডিউল। ফলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরাই এখন বলছেন রাষ্ট্রীয় কাজে রাজনৈতিক সরকারের গাফিলতির কথা।
প্রকল্প বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে বিসিকের শিল্প নগরী ও সমন্বয় শাখার উপ-মহাব্যবস্থাপক জিএম রব্বানী তালুকদার গণমাধ্যমকে বলেন, যখন প্রকল্প নেয়া হয় তখন ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি বাধ্যতামূলক ছিল না। আমরা এসে সম্প্রতি এটা করলাম আইআইএফসি নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে। এটা একটা রিজন, আরেকটি বিষয় হলো- যে জমি আমাদের দেওয়া হয়েছিল পার্কের জন্য সেটা জেলা প্রশাসন থেকে আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। এটা সর্বশেষ বিগত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বুঝিয়ে দিয়েছে আমাদের।
প্রকল্পের ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি বিষয়ে তিনি বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের টাকা জমা দেই বিগত ২০১৯ সালে। অপরদিকে তিতাস গ্যাস এবং পল্লী বিদ্যুৎকে টাকা দেওয়া হয় ২০২৪ সালে। মূলত ২০১৯ সালেই আমাদের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে, আর ভৌত অগ্রগতির মধ্যে জমিটা যেহেতু বুঝে পেয়েছি এবং কিছু মাটি ভরাটের কাজ করতে পেরেছি- এটাই হলো আমাদের অগ্রগতি। যে ২৭০ কোটি টাকা খরচ দেখানো হচ্ছে তা মূলত ২০১৯ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত। এর আগে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ব্যয় বাবদ কিছু টাকা খরচ হয়েছে।
দুই বছরের প্রকল্পটি ১০ বছরেও শেষ করতে না পারা, ফের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি, সর্বোচ্চ বন্যার লেভেল বিবেচনায় পুণরায় ভূমি উন্নয়ন- এসবের পেছনে কি রাষ্ট্রের উদাসিনতা ছিল কি না- জানতে চাইলে রব্বানী তালুকদার বলেন, গাফিলতি হলে সেটা ডিসি অফিসের। তারা আমাদের জমি বুঝিয়ে দিতে পারে নাই। দ্বিতীয় হলো- প্রকল্পে ফিজিবিলিটি স্টাডি না করা। এটা সরকারের গাফিলতি। তবে এখন আর সমস্যা নেই। আগামী ২০২৭ সালের মধ্যেই এ প্রকল্প শেষ করা যাবে বলে আমরা আশাবাদী।
জানা যায়, এই শিল্প পার্কের নির্মাণকাজ শেষ হলে এখানে প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা ও শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অগ্রাধিকার পাবেন নারীরা। পরিবর্তন হবে এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার। ইতিমধ্যে জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণসহ অন্যত্র সরিয়ে দিয়ে জমির ওপর মাটি ভরাটের কাজ করা হয়েছে। বিসিক শিল্প পার্ক নির্মাণকাজ শেষ হলে এখানে ২৭১টি প্লটসহ প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে। এখানে শিল্প পার্ক স্থাপনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ও উপকারভোগী পরিবারের নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার পাবে নারী উদ্যোক্তারা। এখানে খাদ্য, নিটিং এন্ড ডাইয়িং, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপন হবে।






