
কাজল আর্য ॥
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে টাঙ্গাইল জেলার ৮ সংসদীয় আসনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ঘোষিত আসনের পাঁচটিতে বিএনপির মধ্যে চলছে হ য ব র ল অবস্থা। স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। প্রায় প্রতিদিনই এসব আসনগুলোতে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে হচ্ছে মিটিং, মিছিল ও সড়ক অবরোধ। এতে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। এ অবস্থায় বিএনপির কোন্দলের সুযোগ নিতে পারেন অন্য প্রার্থীরা।
জানা যায়, বিএনপির মনোনয়ন দ্বন্দ্বে টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর ধনবাড়ী), টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল), টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী), টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) ও টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখীপুর) আসনগুলোতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্য রুপ লাভ করেছে। এছাড়া টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তার মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী ফরহাদ ইকবালের সমর্থিতরা মশাল মিছিল ও মৌন মিছিল করেছেন। এসব আসনগুলোতে প্রার্থী পরিবর্তনের জোর দাবিতে প্রায় প্রতিদিনই মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ করে আসছে মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা। এদিকে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নিজ নিজ এলাকায় দলীয় প্রার্থীর পক্ষে পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থাকছেন কর্মী-সমর্থকরা।
এছাড়া টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রবিউল আওয়াল লাভলুর বিপক্ষে একটা অংশের ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ ও ক্ষোভ রয়েছে। স্থানীয় অনেক নেতাকে তার প্রচারণায় এখনো অংশ নিতে দেখা যায়নি। অতি সম্প্রতি দেলদুয়ার উপজেলায় দলীয় মনোনিত প্রার্থী ও মনোনয়ন প্রত্যাশীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে প্রচারণার সময় মারপিটের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে।
টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর ধনবাড়ী) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ব্যবসায়ী নেতা ফকির মাহবুব আনাম স্বপন। এখানে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আরেক সদস্য জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতা অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী। মনোনয়ন ঘোষণা পর থেকেই মোহাম্মদ আলীর সমর্থক-অনুসারীরা মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে প্রায় দিনই মিছিল মিটিং করে চলেছেন। অনুসারীরা একে অপরের বিরুদ্ধে নানা ধরনের নেতিবাচক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। অতিসম্প্রতি মনোনিত প্রার্থী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন ও মনোনয়ন প্রত্যাশী মোহাম্মদ আলীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় দু’পক্ষের অন্তত ১০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। ভাঙচুর করা হয়েছে বেসরকারি হাসপাতাল ও দোকানপাট। আসনটিতে কোন্দল চরম আকার ধারন করেছে। ফলে স্থানীয়রাও থাকেন উদ্বেগ উৎকন্ঠার মধ্যে।
বিএনপির প্রার্থী ব্যবসায়ী নেতা স্বপন ফকির বিগত ২০০১ ও ২০০৮ সালে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে পরাজিত হন। এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলটির জেলার কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ মোন্তাজ আলী প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নতুন মুখ অ্যাডভেকেট এসএম ওবায়দুল হক নাসির। মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই তিনি স্থানীয় নেতাকর্মী ও কমিটি নিয়ে জোরালোভাবে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। করছেন মিটিং, মিছিল শোডাউন। যোগ দিচ্ছেন সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে।
এদিকে আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী সাবেক এমপি ও প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদ তার অনুসারী সমর্থকদের নিয়ে মনোনয়ন পরিবর্তন চেয়ে মাঠে নেমেছেন। করছেন শোডাউন। তিনি মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, মানববন্ধন এবং মিছিল, মিটিং করে বিএনপির হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছেন। ফলে ঘাটাইলে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা এবং কোন্দল বিরাজ করছে। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিচ্ছেন।
এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জেলার সহকারী সেক্রেটারি হুসনি মোবারক বাবুল মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন।
টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপি দুইভাগে বিভক্ত। এখানে মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও উপজেলা শাখার সাবেক সভাপতি লুৎফর রহমান মতিন। মনোনয়ন ঘোষণার পর তিনি আরো শক্তভাবে মাঠে নেমেছেন। উপজেলার বিভিন্নস্থানে প্রতিনিয়তই গণসংযোগ করছেন। বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সাথে মতবিনিময় করে চলেছেন। যোগ দিচ্ছেন সামাজিক অনুষ্ঠানে। ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন মতিন। এখানে অন্য ৬ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী মতিনকে সমর্থন দিয়েছেন।
এদিকে মনোনয়ন ঘোষণার পরও মাঠ ছাড়েননি কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক ছাত্রনেতা বেনজির আহমেদ টিটো। তিনি ইউনিয়নে ইউনিয়নে তার অনুসারী নেতাকর্মী এবং কমিটির সদস্যদের নিয়ে মিটিং, মিছিল করছেন। আশাবাদী হয়ে তিনি মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবি করছেন। তবে ধানের শীষের প্রশ্নে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ বলে বক্তব্যে জানিয়েছেন টিটো।
বিগত ২০০৮ সালে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে ৮৭ হাজার ভোট পেয়ে পরাজিত হন মতিন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি। পরে ঐক্যফ্রন্টেকে আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয়।
এদিকে সাবেক মন্ত্রী কালিহাতীর একাধিকবারের এমপি ও মন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আবদুল লতিফ সিদ্দিকী সম্প্রতি জেলখানা থেকে জামিনে বের হয়েছেন। তার ভক্ত অনুসারীরা মোটরসাইকেলের বিশাল শোভাযাত্রা নিয়ে তাকে কালিহাতীতে স্বাগত জানান। পরে লতিফ সিদ্দিকী গ্রামের বাড়ি ছাতিহাটীতে তার মা-বাবার কবর জিয়ারত এবং উপস্থিত অনুসারী সমর্থকদের সাথে কথা বলেন। এ সময় তার সহধর্মিণী সাবেক এমপি বেগম লায়লা সিদ্দিকী, ছোটভাই কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম ও কালিহাতী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শামীম আল মনসুর আজাদ সিদ্দিকী উপস্থিত ছিলেন। লতিফ সিদ্দিকীর ঘনিষ্ঠরা জানান তিনি নির্বাচন করতে পারেন।
এখানে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী জেলার নায়েবে আমীর অধ্যাপক খন্দকার আব্দুর রাজ্জাক মাঠে সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগ করছেন। প্রয়াত মন্ত্রী স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক শাজাহান সিরাজের মেয়ে ব্যারিস্টার সারওয়ার সিরাজ শুক্লাও নির্বাচন করতে পারেন।
টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক এমপি ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির শিশু বিষয়ক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী। মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই তিনি এলাকায় সভা-সমাবেশ করে চলেছেন। এদিকে তার মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে নির্বাচনী মাঠে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হল ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস সাইদুর রহমান সাইদ সোহরাব তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার আশায় সভা-সমাবেশ ছাড়াও নানাভাবে শোডাউন করে যাচ্ছেন।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর টাঙ্গাইল জেলা শাখার কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আব্দুল্লাহ তালুকদার। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী জেলার সভাপতি মুফতি আবু তাহের তালুকদার ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী এটিএম রেজাউল করিম আল রাজি।
টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল সখীপুর) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান। তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে অবিরাম মিটিং, মিছিল গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন।
এখানে বিএনপির আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী লাবিব গ্রুপের কর্ণধার সালাউদ্দিন আলমগীর রাসেল মাঠে রয়েছেন। গণসংযোগের পাশাপাশি জনগন ও মসজিদ-মন্দিরে সাহায্যের হাত প্রসারিত করছেন। বাসাইল ও সখীপুর উপজেলায় তার নিজস্ব তহবিল থেকে অনুদান ও চলাচলের অনুপযোগী বেশকয়েকটি রাস্তা মেরামত করে দিয়ে ব্যাপক আলোচনায় এসেছেন। তিনি নির্বাচন করবেন বলে তার সমর্থিতরা বলছেন। ফলে এ আসনেও রয়েছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল। যা নেতাদের বক্তব্যে প্রকাশ্যে এসেছে।
এদিকে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে এখান থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনিও সভা-সমাবেশ করছেন। করতে পারেন নির্বাচন। এখানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জেলার সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা শফিকুল ইসলাম খান নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
সচেতন ভোটাররা বলেন, বিএনপির এমন বিভেদ বিদ্যমান থাকলে সতন্ত্র কিংবা অন্যদলের প্রার্থীরা বাড়তি সুবিধা পাবেন। বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলেন, নিজেদের রেষারেষির কারনে যেন অন্যরা সুযোগ নিতে না পারেন। তাই কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে দ্রুত একমঞ্চে এসে সবাইকে কাজ করার পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
এসব বিষয়ে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সভাপতি হাসানুজ্জামিল শাহীন বলেন, আমরা দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে মানুষের ভোটের অধিকার এবং একটি সুষ্ঠ ও সুন্দর নির্বাচনের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে যাচ্ছি। বিএনপি একটি বড় দল। এখানে একাধিক প্রতিযোগি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে বিদ্বেষ প্রতিহিংসা কাম্য নয়। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে। দল করতে হলে দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি অবশ্যই অনুগত থাকতে হবে। ধানের শীষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থেকে বিজয় সুনিশ্চিত করতে হবে।






