
স্টাফ রিপোর্টার ॥
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমশ অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে আবহাওয়ার আচরণ। এখানে শীত ও গরমকাল যেমন দীর্ঘ হচ্ছে- তেমনি সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্যও বেড়ে চলেছে। বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। তীব্র শীতে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। সর্বত্র বইছে কুয়াশাচ্ছন্ন কনকনে ঠান্ডা বাতাস। এখন দেশে জাতীয় নিবাচনের হাওয়া বইছে। তা সত্ত্বেও টাঙ্গাইল জেলা শহরসহ গ্রামাঞ্চলের হাটবাজারেও কমেছে মানুষজনের আনাগোনা।জরুরি কাজ ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হতে চাচ্ছেন না। এমন অবস্থায় দিনমজুর, হতদরিদ্র মানুষগুলোর জীবনে নেমে এসেছে অসহনীয় কষ্ট।
বিশেষ করে টাঙ্গাইলের নদী তীরবর্তী ও চরাঞ্চল এলাকার ছিন্নমূল পরিবারের সদস্যরা তীব্র শীতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। যমুনা, ধলেশ^রী নদী তীরবর্তী টাঙ্গাইল সদর, ভূঞাপুর, কালিহাতী ও নাগরপুর উপজেলার চরাঞ্চলগুলোর প্রায় ১ লাখের অধিক সংখ্যক নিম্নআয়ের (দরিদ্র) মানুষের বসবাস। এসব এলাকার মানুষ তীব্র শীত মোকাবেলায় স্থানীয় প্রশাসনের প্রস্তুতি খুব সামান্য। বিশেষ করে চরাঞ্চলসহ প্রত্যন্ত নদী বেষ্টিত এলাকার মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
এছাড়া শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এসব চরের মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। তাদের প্রধান পেশা নদীতে মাছ ধরা, কৃষিকাজ ও দিনমজুর হিসাবে কাজ করা। এদের কাছে শীত গ্রীষ্ম সব ঋতুই সমান। যেখানে এই শীতে ঘর থেকেই বের হওয়া দায়, সেখানে এরা কাকডাকা ভোরে পেটের তাগিদে বেরিয়ে যায় জীবিকার সন্ধানে। দুই বেলা দুই মুঠো ভাত, সন্ধ্যা হলে আগুনের তাপ আর রাতে ভারি কাঁথা হলেই এরা সন্তুষ্ট।
গত কয়েক দিনের থেকে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কাহিল হয়ে পড়েছে এসব এলাকার জনজীবন। শীতের তীব্রতা আর সূর্য্যের লুকোচুরি খেলার সাথে চলমান মৃদু শীতল হাওয়া দেখে মনে হয় বৃষ্টি নামবে, তবে বৃষ্টি নেই। বেড়েই চলেছে শীতের তীব্রতা। গত কয়েক দিনের ঘন কুয়াশার পাশাপাশি শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকায় শীতে কাঁপছে এসব উপজেলার চরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের। প্রচন্ড শীতের কারণে নিউমোনিয়া, অ্যাজমা, কোল্ড এলার্জি ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন ঠান্ডাজনিত রোগ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। স্থলভাগের তুলনায় চরাঞ্চলের মানুষের অবস্থা আরও বেশি করুণ। শীতের তীব্রতা থেকে রক্ষা পেতে কোন ধরনের শীতবস্ত্র নেই। এখানকার বেশিরভাগ দরিদ্র শ্রেণির মানুষের। যতই দিন যাচ্ছে ততই শীতের তীব্রতা বাড়ছে। গত ৪ দিনে বহু মানুষ শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে। মেডিসিন চিকিৎসক আব্দুল্লাহ আল রতন জানান, মূলত শিশু ও বৃদ্ধরাই শীতজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। শিশুদের গরম কাপড় পরানো এবং সকালে ও সন্ধ্যার পর তাদের ঘরের বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
যমুনা তীরের হুগড়া গ্রামের মোমেনা বেগমের ঝুপড়ি ঘরে উত্তরের বাতাসের শীতল প্রবাহ বইছে। নাসিমা বেগমের নিচু ঘরে মাথার ওপরে থাকা টিনের চালা দিয়ে ক্রমাগত ঝরে পড়ছে শিশিরের ফোঁটা। আবার আবদুল মজিদের ঘরের সব কাথা একত্রিত করেও শীত নিবারণ করতে পারছেন না। এভাবেই তীরবর্তী চরাঞ্চলের হাজারও মানুষ এবারের তীব্র শীতে কাতর হয়ে পড়েছে। এবারের শীত একটু বেশি বলেই মনে করেন মোমেনা বেগম। তিনি বলেন, দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ। স্বামী নেই। থাকেন মেয়ের জামাইয়ের সঙ্গে। নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর পর শীত নিবারণের জন্য আলাদা করে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকে না মোমেনার। কান্না জড়ানো কণ্ঠে বিলকিস বেগম বলেন, এই শীতে গরম কাপড় কই পামু? আমাগো তো কিছুই নাই। জমাজমি সব ওই নদীতে লইয়া গ্যাছে। এখন থাকি মাইনসের বাড়িতে। শীতের কাপড় আমারে কে দিবে? পুরোনো ছেঁড়া একটা সোয়েটার ছিল, সেটাই পরি এখন। পাতলা কাঁথা গায়ে জড়িয়ে থাকি।
বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মরিয়ম বেগম (৪০), হাফেজা (২৭), জয়নাব বিবির (৩০) সাথে কথা হলে তারা জানান, আমরা ল্যাপ-তোশক কিননের টেহা কুনু পামু। হারাদিন মাইনসের বাড়িতে দাসি-বান্দির কাম করি। যেই কয়ডা টেহা পাই তা দিয়া সংসার চলে না। চরের মৃত মনছুর আলীর বৃদ্ধা স্ত্রী মনেজা খাতুন (৭৪) অভিযোগের সুরে বলেন, শীতের সময় অনেকেই গরিবদের কম্বল দেয়। চরের মানুষের আকুতি, দেশে এহন ভোট চলে। কিন্তু আমাগো লইগ্যা কেউ কিছু নিয়া আহে না। রিপন হাওলাদার, রনজিত কুমার ও কালু সরদার জানান, গত ২০ বছরেও এমন শীত পড়েনি। প্রচণ্ড শীতে দরিদ্র পরিবারগুলোর নাকাল অবস্থা। আমরা এহনও কোনো শীতবস্ত্র পাই নাই। টাঙ্গাইল জেলা ত্রাণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, যে পরিমাণ শীতবস্ত্রের চাহিদা পাঠানো হয়েছিল, এর বিপরীতে বরাদ্দ এসেছে খুব সামান্য।






