
স্টাফ রিপোর্টার ॥
বাংলা বছরের পৌষ মাসের শেষ দিন আজ বুধবার (১৪ জানুয়ারি)। বাংলা ক্যালেন্ডার অনুসারে পৌষ মাসের শেষ দিনটি সনাতন ধর্মালম্বীরা পৌষ সংক্রান্তি হিসাবে পালন করে থাকে। ঘরে ঘরে পিঠে-পুলির উৎসব। পৌষ সংক্রান্তি বাঙালি সংস্কৃতির একটি বিশেষ উৎসব বা বিশেষ ঐতিহ্যবাহী দিন। পৌষ সংক্রান্তি। পৌষ সংক্রান্তি বাংলার গ্রামীণ জীবনে বিশেষ আনন্দময়। উৎসবের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পিঠে-পুলির অনুষ্ঠান। নতুন চাল, নারিকেল এবং খেজুর গুড় দিয়ে তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের পিঠে যেমন- পাটিসাপটা, দুধপুলি, ভাপাপিঠা ইত্যাদি। কৃষি নির্ভর এই দেশে টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের সনাতন ধর্মালম্বীরা বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপন করছে দিনটি।
নারীরা একত্রিত হয়ে পিঠে তৈরিতে অংশ নিচ্ছেন, যা গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য চিত্র। আর শিশুদের কোলাহলে প্রাণ ফিরে পায় গ্রাম। পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে অনেক এলাকায় বসেছে গ্রামীণ মেলা। সেখানে কাঠের খেলনা, মাটির হাঁড়ি, বাঁশের তৈরি সামগ্রী ও লোকজ খাবারের দোকানে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কোথাও কোথাও আয়োজন করা হয়েছে লাঠিখেলা, হাডুডু, নৌকাবাইচ ও বাউল গানের আসর। স্থানীয় প্রবীণরা জানান, পৌষ সংক্রান্তি শুধু একটি উৎসব নয়। এটি গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই দিনে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা একে অপরের বাড়িতে গিয়ে পিঠে খাওয়ার মাধ্যমে সৌহার্দ্য ও সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় করেন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই উৎসব গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
অনেকে মনে করেন, আধুনিকতার প্রভাবে গ্রামীণ জীবনে নানা পরিবর্তন এলেও পৌষ সংক্রান্তির আবেদন এখনো অটুট রয়েছে। শহুরে ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকা গ্রামগুলোতে এই উৎসব মানুষকে কিছুটা হলেও শেকড়ের কাছে ফিরিয়ে আনে। শীতের সকালে ধোঁয়া ওঠা চুলা, গুড়ের মিষ্টি গন্ধ, লোকজ গানের সুর আর মানুষের হাসি-আনন্দ-সব মিলিয়ে চারঘাটে পৌষ সংক্রান্তি যেন গ্রাম বাংলার হারানো ছন্দকে নতুন করে ফিরিয়ে আনে।

সরেজমিনে বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, সূর্য ওঠার আগে খুব ভোর বেলায় পুকুর অথবা নদীতে প্রাতঃস্নান করে খড়ের গাদায় আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের দৃশ্য। তুলনামূলকভাবে কম হলেও কিছু কিছু এলাকার সনাতন ধর্মালম্বীরা প্রাচীন এই ঐতিহ্যকে এখনও ধরে রেখেছেন। এলাকার কীর্তন শিল্পীরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ও শ্মশানে কীর্তন করছেন। গ্রামের কল্পনা গুপ্তা, সন্ধ্যা রানী, ঝর্ণা রাণীসহ প্রাতঃস্নান করতে আসা কয়েকজন ষাটোর্ধ মহিলার সাথে কথা বললে তারা বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমরা পৌষ মাসের শেষ দিন পৌষ সংক্রান্তির প্রাতঃস্নান করে আসছি। যতদিন সম্ভব ততদিন করে যাব। এই দিনটিতে আগে অনেক মজা হতো, কিন্তু বর্তমান যুগের ছেলে-মেয়েরা সবাই শহরমুখী। তাই পৌষ সংক্রান্তির প্রাতঃস্নানের আনন্দটা তারা উপভোগ করতে পারে না।
তারা আরও বলেন, আগে আমাদের গ্রামের পুরুষরা মাঠ থেকে খেড় এনে লাসি (খড়ের গাদা) তৈরির প্রতিযোগিতা করতো। রাতে সবাই যার যার বাড়িতে পিঠা তৈরিতে ব্যস্ত থাকতাম। চারদিকে পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যেতো। রাত শেষে ভোরবেলায় বাড়ির বৃদ্ধ, মধ্যবয়সী পুরুষ-মহিলা, কম বয়সী ছেলে-মেয়ে সবাই মিলে প্রাতঃস্নান সেড়ে লাসিতে আগুন দিয়ে সবাই মিলে শীত নিবারণের পাশাপাশি পিঠা খেতে খেতে বিভিন্ন গল্পে মশগুল থাকতাম। এখন আর সেই দিন নাই। গ্রামের কীর্তন শিল্পী অরুণ সিংহ, অসীত সিংহ, অবনী সিংহ’র সাথে কথা বললে তারা বলেন, প্রতি বছরেই আমরা পৌষ সংক্রান্তির দিনে কীর্তন নিয়ে গ্রামে আমাদের সম্প্রদায়ের লোকদের বাড়িতে বাড়িতে যাই। সন্ধ্যায় শ্মশানে কীর্তন করে অনুষ্ঠান শেষ করি। আগে মানুষের বাড়িতে কীর্তন নিয়ে গেলে পিঠা খেয়েই দিন চলে যেতো, কিন্তু এখন সেই দিন আর নাই। আমরা যতদিন বেঁচে আছি ততোদিন এই ঐতিহ্য থাকবো, পরে হয়তো আর থাকবো না।






