
এরশাদ মিঞা, মির্জাপুর ॥
সম্পর্কে বড় ভাইকে ছোট সাজিয়ে দেড় বছর বয়স বাড়িয়ে ছোট ভাই আমছের আলী হলেন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধকালীন সময়ের তার কোন সার্টিফিকেট না থাকলেও তিনি ভাতা প্রাপ্তির সকল কাগজপত্র সংগ্রহ করেছেন। তিনি নিয়মিত ভাতাসহ মুক্তিযোদ্ধার সকল সুযোগ সুবিধা নিচ্ছেন। আমছের আলী টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার লতিফপুর ইউনিয়নের মৃত ইন্তাজ আলীর ছোট ছেলে।
আমছের আলীর এই মুক্তিযোদ্ধার সুুবিধা নিয়ে চাকরি হয়েছে তার দুই ছেলে ও এক মেয়ের। এ নিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয় লোকজনের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তাকে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা উল্লেখ করে তার মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট বাতিলসহ সন্তানদের চাকরি থেকে অব্যহতির দাবি জানিয়ে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর টাকিয়া কদমা গ্রামের নুরুল ইসরামের ছেলে ফিরোজুল ইসলাম দুলাল গত (২৭ নভেম্বর) লিখিত আবেদন করেছেন। এছাড়া ওই মুক্তিযোদ্ধা লতিফপুর ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের (নিষিদ্ধ ঘোষিত) সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারি কমিশনার নুসরাত জাহান গত (২১ ডিসেম্বর) ০৫.৪১.৯৩০০.০০০.০০৭.১৩.০০০৭.২৪.২৩ স্মারকে মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সরজমিন তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।
আমছের আলীর তিন সন্তান ইয়াকুব আলী ছিট মামুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, হালিমা বেগম ও ইউনুস আলী মিয়া কদমা দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। হালিমা বেগম প্রাক প্রাথমিক সহকারি শিক্ষক নিয়োগ নিবন্ধন স্মারক নম্বর ২৪১০ (৮৬০), (৮ সেপ্টেম্বর) ২০১০ সাল। তিনি একই বছরে (২২ সেপ্টেম্বর) যোগদান করেন। ইয়াকুব আলী প্রাক প্রাথমিক সহকারি শিক্ষক নিয়োগ নিবন্ধন স্মারক নম্বর ২০১২/৩৪০৪ (৩৭৮), (১৯ নভেম্বর) ২০১৩ সাল। তিনি একই বছরের (২ ডিসেম্বর) যোগদান করেন। এছাড়া ইউনুস আলী মিয়া প্রাক প্রাথমিক সহকারি শিক্ষক নিয়োগ নিবন্ধন স্মারক নম্বর ২০১৩/১৪৫/৩৫১১/৩২ (৯), (১৮ নভেম্বর) ২০১৪ সাল। তিনি একই বছরের (৩ ডিসেম্বর) যোগদান করেন। তারা সকলেই মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নিয়েছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন।
জানা গেছে, মির্জাপুর উপজেলার লতিফপুর ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ডের মৃত ইন্তাজ আলীর পাঁচ সন্তানের মধ্যে আমছের আলী সবার ছোট। তিন নম্বর ভাই তোফাজ্জল হোসেন। তার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর- ১৪৫৮৮৭২২৩৩৫। জন্ম তারিখ (১ মে) ১৯৫৭ সাল। এরপর ইন্তাজ আলীর স্ত্রী এক ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। দুই আড়াই মাস পর ছেলেটি মারা যায়। এরপর ইন্তাজ আলী স্ত্রীকে নিয়ে আসাম যান। সেখান থেকে প্রায় দুই বছর পর দেশে ফিরে আসেন। দেশে আসলে আমছের আলীর জন্ম হয়। তার ভোটার নম্বর- ৯৩০৫০৯০০০৩৭৫, জন্ম তারিখ (২৮ সেপ্টেম্বর) ১৯৫৫ উল্লেখ করেছেন। ৫ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট হয়েও আমছের আলী জাতীয় পরিচয়পত্রে বড় ভাইকে ছোট সাজিয়ে দেড় বছর বয়স বাড়িয়েছেন। এরপর বিভিন্ন পন্থায় কয়েকজন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এবং সাবেক দুই সংসদ সদস্যের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রত্যয়ন নিয়েছেন। নাম লিখিয়েছেন লাল মুক্তিবার্তায়। তাহার পরিচিতি নম্বর- ০১৯৩০০০৪২৩৩, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর- ০১১৮০৫০৬২৩, বেসামরিক গেজেট নম্বর- ৬৫৯৭।
অভিযোগপত্রে দুলাল লিখেছেন, প্রয়াত এমপি একাব্বর হোসেনের সখ্যতায় ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা আমছের আলী তিন ছেলে-মেয়েকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষকের চাকরি দিয়েছেন। গ্রামের সবাই এ ব্যাপারে অবগত আছেন। কিন্তু অভিযোগের জায়গা পাচ্ছেন না। তদন্তে আসলে গ্রামের ৯৫ ভাগ মানুষ সত্য কথা বলবে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সালাম জানাই। ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ধ্বংস কামনা করি। টাকার বিনিময়ে অসৎ পথ অবলম্বন করে বড় ভাইদের চেয়ে বয়স বাড়িয়েছেন।
লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারি কমিশনার নুসরাত জাহান গত (২১ ডিসেম্বর) ০৫.৪১.৯৩০০.০০০.০০৭.১৩.০০০৭.২৪.২৩ স্মারকে মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সরজমিন তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বলেন, আমছের আলী কিভাবে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভূক্ত হলেন তা আমার জানা নেই। তার বড় ভাই তোফাজ্জল হোসেন আমার বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমছের অনেক ছোট ছিলো। তখন তার বয়স ৭/৮ বছর হবে। সত্তুর বছরের আব্দুল আলীম বলেন, তার বড় ভাই তোফাজ্জল সমবয়সী। আমছের অনেক ছোট। মুক্তিযুদ্ধ করে নাই। তখন তার বয়স ৭/৮ বছর হবে।
আমছের আলীর বড় ভাই তোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে কথা বলতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।
আমছের আলী ছোট ছেলে কদমা দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক ইউনুস আলী বলেন, তার চাকরি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় হয়েছে। বড় চাচা তোফাজ্জল হোসেন লেখাপড়ার জন্য বয়স কমিয়েছিলেন। তার বাবার পরিচয়পত্রের বয়স সঠিক এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা।
মির্জাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন বলেন, আমছের আলী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নয় বলে এলাকাবাসী তাকে জানিয়েছেন।
আমছের আলীর বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার কমান্ডারের নাম কি জানতে চাইলে জোয়াহের নামে এক মুক্তিযোদ্ধার নাম বলেন। তার পরিচয় জানতে চাইলে বলেন, মারা গেছেন। যুদ্ধকালীন সময়ে কি কি অস্ত্র চালিয়েছেন জানতে চাইলে বলেন, থ্রি নট থ্রি। সহযোদ্ধাদের নাম এবং কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছেন তার উত্তরে বলেন, আমি তো আপনাদেরই। সব পরে বলবো, থামেন। এ সময় তার মুখ শুকিয়ে উঠছিলো। তার কাছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের কোন সাটিফিকেট নাই বলে জানান। তিনি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান।
এ বিষয়ে মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুরাইয়া ইয়াসমিন বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।






