স্টাফ রিপোর্টার ॥
প্রায় প্রতিদিন সকাল ১০টার পর থেকেই টাঙ্গাইলের সড়কে উত্তপ্ত অবস্থা। মাথার ওপর সূর্য। যার কিরণের তেজও বেশ। বোঝার উপায় নেই যে এটি শীতের চূড়ান্ত সময়। জানুয়ারি মাসকে বলা হয় বাংলাদেশের শীতলতম মাস। নতুন বছরের এই সময়ে দাঁড়িয়ে দেশসহ টাঙ্গাইল জেলার আবহাওয়া যেন ভিন্ন এক রূপ ধারণ করেছে।
অথচ বাংলা ক্যালেন্ডারের পাতায় এখন মাঘ মাস চলছে। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বাংলা মাঘ মাসের ১৭ তারিখ। মাঘ মাসে বাঘ কাপে। সেই প্রবাদ এখন বাস্তবে নেই। মাঘের শীতের সেই চিরচেনা আমেজ একদমই নেই। দেশের গড় বৃষ্টিপাতের একটি অংশ শীতকালে হয়। কিন্তু এবার বৃষ্টিপাতের পরিমাণও শূন্য। যে কারণে বেড়েছে গড় তাপমাত্রা। আবহাওয়াবিদরা এই অবস্থাকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ফলে শীতের পরিবর্তে গরমের অনুভূতিতে দিন কাটছে জেলাবাসীর।
আবহাওয়া অধিদপ্তর এরমধ্যেই আগামী দুইদিন তাপমাত্রা কমে আসার খবর দিচ্ছে। আবহাওয়াবিদরা জানান, সারাদেশের তাপমাত্রা কিছুটা কমে আসবে। তবে শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) থেকে তাপমাত্রা আরও বাড়তে শুরু করবে। এরপর আবারও তাপমাত্রার নিম্নমুখী হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। সেসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
জেলার সাধারণ মানুষ জানান, জানুয়ারি মাস মানেই এক সময় ছিল হাড়কাঁপানো শীত, ঘন কুয়াশা আর লেপ-কাঁথা মুড়ি দিয়ে রাত্রিযাপন। কিন্তু বর্তমানে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। শীতলতম মাস হওয়া সত্ত্বেও শীতের বদলে বরং ভ্যাপসা গরম আর অস্বস্তিকর আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যদিও আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য এবং পরিবেশবিদদের বিশ্লেষণ বলছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়নের এক ভয়াবহ ফলাফল।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, শীতলতম মাসে শীত না পড়ার বেশকিছু কারণ রয়েছে। বায়ুমন্ডলের ঘূর্ণন প্রক্রিয়া পরিবর্তন হয়েছে। যা জলবায়ু পরিবর্তনের দৃশ্যমান কারণ। ঊর্ধ্ব আকাশে উচ্চচাপ বলয়ের কারণে বাতাস নিচে নেমে আসে। ঊর্ধ্বমুখী আকাশের বাতাস নিম্নমুখী বিচরণ হয়। এবার সেটিও নেই। বৃষ্টিপাত শূন্য। আবার দিনের বেলায় সূর্যের বিকিরণও যথেষ্ট। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে পশ্চিমা লঘুচাপ তৈরি হয়। এবার সেটিও হয়নি। উত্তরা বাতাসের প্রাধান্য বিস্তার করতে পারেনি।
ফলে শীতের অনুভূতিও বোঝা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এ মাসে দিনের তাপমাত্রা ১-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রয়েছে। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারির শেষ সময় এসেও দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। অথচ এই সময়ে গড় তাপমাত্রা ১৯ ডিগ্রি থেকে ২২ ডিগ্রি থাকে। যদিও রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৩ ডিগ্রি থেকে ১৭ ডিগ্রির মধ্যে থাকছে। কিন্তু দিনের প্রখর রোদ ও গরম বাতাস সেই শীতল অনুভূতিকে পুরোপুরি মুছে দিচ্ছে।
এজন্য আরও কিছু বিষয়কে দায়ী করছেন পরিবেশবিদ ও আবহাওয়াবিদরা। এরমধ্যে আর্বান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট অন্যতম। শহরগুলো এখন মূলত লোহা আর কংক্রিটের স্তূপ। বহুতল ভবন এবং পিচ ঢালা রাস্তা দিনের বেলা সূর্যের তাপ শোষণ করে নেয়। গাছপালা ও জলাশয় কমে যাওয়ায় এই তাপ বিকিরিত হতে পারে না। ফলে শহরের তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ এলাকার তুলনায় ৩-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকছে। এছাড়াও উত্তর-পশ্চিমী বায়ুর বাধা দেশে শীত আসে হিমালয় থেকে আসা হিমেল বাতাসের হাত ধরে।
শীতের এই অনুপস্থিতি শুধু অস্বস্তিই বাড়াচ্ছে না। বরং এটি পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। সঠিক সময়ে শীত না পড়ায় শীতকালীন ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি, হুটহাট তাপমাত্রার এই ওঠানামা সাধারণ মানুষের মধ্যে সর্দি-কাশি ও জ্বরের মতো মৌসুমি রোগের প্রকোপ বাড়িয়ে দিয়েছে। যদি সবুজায়ন এবং জলাশয় রক্ষা করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে শীতকাল পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে। জানুয়ারি মাসও তখন বসন্ত বা গ্রীষ্মের মতো উষ্ণ হয়ে উঠবে। এই পরিবর্তন আমাদের প্রকৃতির সতর্কবার্তা দিচ্ছে। শীতলতম মাসে শীতের এই অনুপস্থিতি কেবল একটি ঋতু পরিবর্তনের খবর নয়। বরং আমাদের বসবাসের পরিবেশ কতটা সংকটাপন্ন, তারই এক প্রামাণ্য দলিল।