স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে স্বাধীনতা পরবর্তিকালে লতিফ সিদ্দিকী ও শাজাহান সিরাজ এই আসনে বার বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। একবার লতিফ সিদ্দিকীর স্ত্রী লায়লা সিদ্দিকী এমপি নির্বাচিত হন। বিগত ২০১৮ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারী একবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। শাহজাহান সিরাজ ছাড়া বিএনপির অন্য কেউ এ আসনে জয়লাভ করতে পারেনি। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এর অন্যতম কারণ। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লতিফ সিদ্দিকী জাসদের শাজাহান সিরাজকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। লতিফ সিদ্দিকী কারাগারে থাকার কারণে ১৯৭৯ সালে তার স্ত্রী লায়লা সিদ্দিকী আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্ধন্ধিতা করে জাসদের শাজাহান সিরাজের কাছে হেরে যান। বিগত ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান বিএনপির বর্তমান ঢাকা বিভাগের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক বেনজির আহমেদ টিটুর বাবা আবুল কাশেম। আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন লায়লা সিদ্দিকী। জাসদের দলীয় প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্ধিতা করেন শাজাহান সিরাজ। ত্রিমুখি নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী লায়লা সিদ্দিকী বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। বিগত ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জাসদের শাজাহান সিরাজ এমপি নির্বাচিত হন।
বিগত ১৯৯০ সালে শাজাহান সিরাজ তার দল নিয়ে বিএনপিতে যোগদান করেন। বিএনপি দলীয় প্রার্থী হয়ে শাজাহান সিরাজ ১৯৯১ সালে আবারও নির্বাচিত হন। বিগত ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী লতিফ সিদ্দিকী নির্বাচিত হন। বিগত ২০০১ সালের নির্বাচনে শাজাহান সিরাজ হারানো আসন পুণরুদ্ধার করেন। ওয়ান ইলেভেনের সময় বেশকয়েকটি দূর্নীতির মামলায় শাজাহান সিরাজ জেলে থাকায় বিগত ২০০৮ সালে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য লুৎফর রহমান মতিনকে বিএনপি মনোনয়ন দেয়। ওই নির্বাচনে লতিফ সিদ্দিকী মতিনকে হারিয়ে নির্বাচিত হন। বিগত ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় লতিফ সিদ্দিকী আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। বিগত ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারী নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।
তবে এবার আওয়ামী লীগ না থাকাতে এবারের নির্বাচন ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে কে এমপি নির্বাচিত হবেন। চায়ের আড্ডাখানা থেকে গ্রামগঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় ক্ষেত-খামারে কৃষক, মেহনতি মানুষের সাথে সরেজমিন কথা বলে জানা গেছে, এ আসনে ছয়জন প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী ও বিএনপির প্রার্থী লুৎফর রহমান মতিনের সাথে।
জানা গেছে, কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী সদস্য লুৎফর রহমান মতিন বিগত ২০০৮ সালে পরাজিত হয়ে এলাকা ছাড়েন। কদাচিৎ এলাকায় আসলেও দলীয় কর্মকান্ডে তেমন তৎপরতা ছিল না। সেই সুবাধে কেন্দ্রীয় বিএনপির ঢাকা বিভাগের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক বেনজির আহমেদ টিটু কালিহাতী বিএনপির হাল ধরেন। নেতাকর্মিদের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। জেল জুলুম হুলিয়া মাথায় নিয়ে নেতাকর্মিদের আগলে রাখেন। উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটি নির্বাচিত হয় তার হাত ধরেই। কালিহাতী উপজেলা বিএনপির পদধারী বেশীরভাগ নেতাকর্মি বেনজির আহমেদ টিটুর অনুসারী। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিলেন তিনি। তিনি বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ায় হতাশ হয়ে হয়ে পড়েন বিএনপির নেতাকর্মিরা। বিক্ষুব্দ হয়ে লুৎফর রহমানের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে মিছিল, সামবেশ করেন। নির্বাচনে মাত্র কয়েকদিন বাকি বেনজির আহমেদ টিটুর অনুসারী বহু নেতাকর্মি এখনও মতিনের পক্ষে মাঠেই নামেনি। নাম প্রকাশে কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে মতিনের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটিতে টিটুর অনুসারী এবং উপজেলা বিএনপির পদধারী কাউকে রাখা হয়নি। ফলে বিশ^াস অবিশ^াসের দোলাচলে চলছে নির্বাচন পরিচালনা। ফলে গাছাড়া ভাব নিয়ে কাজ করছেন নেতাকর্মিরা।
এছাড়াও কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা দলের সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল হালিম বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মতিয়ার রহমান ও বীরবাসিন্দা ইউনিয়নের সাবেক আহবায়ক আব্দুল গফুরসহ বিএনপির বর্তমান ও সাবেক কমিটির বহু নেতাকর্মি গোপনে তার পক্ষে কাজ করছেন। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে নেতাকর্মি ও সমর্থকরা।
এদিকে বিগত নির্বাচনগুলোতে চারদলীয় জোট প্রার্থী হয়ে জামায়াত ইসলাম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও তারা বিএনপির মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দিতো। এবার জামায়াতে ইসলাম খন্দকার আব্দুর রাজ্জাককে প্রার্থী দিয়েছেন। ১১ দলীয় জোট জোরেশোরে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপির দ্বন্দ্বের সুযোগে জামায়াত ও বিএনপির সমর্থকরা ভোট দিবেন জামায়াত প্রার্থীকে এমনটাই মনে করছেন জামায়াতের প্রার্থী। ফলে বিএনপির ভোট তিনভাগে বিভক্ত হবে। বিএনপির কর্মি সমর্থকরা কেউ গোপনে কেউ প্রকাশ্যে তিনভাগে বিভক্ত হয়ে নির্বাচন করছেন।
তবে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম (ভিপি রফিক) বলেন, মতিনের সাথে দলের দীর্ঘদিনের একটি দূরত্ব ছিল। এ সময়ে দলকে গুছিয়ে এনেছিল টিটু। নেতাকর্মিদের ধারণা ছিল টিটুই মনোনয়ন পাবেন। তবে দল যাকে ভালো মনে করেছেন তাকে দিয়েছেন। ইতিমধ্যে টিটু সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে আহবান জানিয়েছেন। আর কোন কোন্দল নেই। মতিনের পক্ষে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। আশা করছি ধানের শীষের বিজয় হবে।
এ আসন থেকে ৬ বার এমপি নির্বাচত হন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। বিগত ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে একটি সভায় হজ, তাবলিগ জামাত ও প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করে মন্ত্রিত্ব হারিয়েছিলেন লতিফ সিদ্দিকী। তখন তাঁকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে তাঁকে কারাগারেও যেতে হয়। তিনি সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন।
দুর্গাপুর ইউনিয়েনের বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই টাঙ্গাইলের কালিহাতী আসন মুলত আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী ও স্বাধীনতা ইশতেহার পাঠক শাহজাহান সিরাজকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। দু’জনেই বার বার এমপি হয়েছেন। মন্ত্রী হয়েছেন। শাহজাহান সিরাজের মৃত্যুর পর লতিফ সিদ্দিকীর উপর আস্থা রাখেন কালিহাতীবাসী। সহদেবপুর গ্রামের মোহাম্মদ আফাজ উদ্দিন বলেন, দলমত নির্বিশেষে এলাকায় লতিফ সিদ্দিকীর ব্যপক প্রভাব রেেয়ছে। আওয়ামী লীগ যেহেতু নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না তাই তাদের সমর্থিত ভোট তাঁর বাক্সেই পরবে। বাংড়া গ্রামের রফিজ উদ্দিন বলেন, সিদ্দিকী সাবকেই সবাই ভোট দিবে। কোকডহরা বাজারে চায়ের দোকানে কথা হয় চা বিক্রেতা ও কয়েকজন দোকানির সাথে। তাদের বক্তব্য লতিফ সিদ্দিকী যতদিন জীবিত আছেন নির্বাচন করলে তাকেই সবাই ভোট দিবে। তিনি দলের উর্র্দ্বে। তাঁর সমসাময়িক কোন নেতা নেই। আওয়ামী লীগের ভোটাররা তাকেই ভোট দিবে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী লতিফ সিদ্দিকী বলেন, আমি ভোট উৎসবে অংশগ্রহণ করেছি। আমার নিজের কোন জয় পরাজয় নেই। জনগণকে সম্মান জানিয়েই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। জনগণ পরাজিত হবে না বিজয়ী হবে সেই সিদ্ধান্ত জনগণই নিবে।
বিএনপির প্রার্থী লুৎফর রহমান মতিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কালিহাতীবাসীর উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। দল আমার প্রতি আস্থা রেখে মনোনয়ন দিয়েছে। বিগতদিনে আওয়ামী লীগের অত্যাচার নির্যাতনে মানুষ অতিষ্ঠ ছিল। ১৭ বছর মানুষ ভোট দিতে পারে নাই। এবার ধানের শীষের জোয়ার এসেছে। কালিহাতীবাসী ধানের শীষে ভোট দিয়ে তারেক জিয়ার হাতকে শক্তিশালী করবে।
হাতপাখা প্রতিক নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের আলী আমজাদ হোসেন, মোটর সাইকেল প্রতিক নিয়ে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী (স্বতন্ত্র) আব্দুল হালিম, লাঙ্গল প্রতিক নিয়ে জাতীয় পার্টির লিয়াকত আলী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
কালিহাতী উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও দুইটি পৌরসভা নিয়ে এ আসন গঠিত। এ আসনে মোট ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৮৯৫ ভোটার। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯২৪ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৮৪ হাজার ৯৬৮জন। হিজড়া ৩জন।