
সিনিয়র রিপোর্টার ॥
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে টাঙ্গাইলের ৮টি আসনে রাজনৈতিক পারদ এখন তুঙ্গে। সর্বত্র বইছে ভোটের হাওয়া। তবে এবারের নির্বাচনে টাঙ্গাইলের রাজনীতির সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অনুপস্থিতিতে দলটির তৃণমূলের বিশাল একটি সমর্থক গোষ্ঠী ও ‘নীরব’ ভোটাররা এখন সব প্রার্থীর প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। এই বিশাল ভোটব্যাংক যে প্রার্থীর দিকে ঝুঁঁকবে, তার বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত- এমনটাই মনে করছেন জেলার রাজনৈতিক বোদ্ধারা।
টাঙ্গাইলের প্রতিটি আসনে প্রার্থীরা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উঠান বৈঠক, পথসভা এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থণা করছেন। প্রত্যেক প্রার্থী শহর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল চষে বেড়াচ্ছেন। কেবল পোস্টার বা মাইকিং নয়, এবার প্রার্থীরা জোর দিচ্ছেন ব্যক্তিগত গণসংযোগে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে পরিচিত পরিবারগুলোতে গিয়ে প্রার্থীরা অভয় দিচ্ছেন এবং উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন। টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ এখনও নির্বাচন নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকলেও প্রার্থীদের বিভিন্ন আশ্বাসে অনেকে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু হিন্দু ভোটারদের টানতে বিএনপি ও জামায়াত কৌশলী ভূমিকা পালন করছে। অনেক সাধারণ ভোটার উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক শান্তি ও চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশের প্রত্যাশা করছেন।
এবার টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ি) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৬৯৩ জন। এ আসনে বিএনপির ফকির মাহবুব আনাম (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ আব্দুল্লাহেল কাফী(দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির মুহাম্মদ ইলিয়াছ হোসেন (লাঙল), বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র মোহাম্মদ আলী (মোটরসাইকেল), স্বতন্ত্র আসাদুল ইসলাম (তালা) এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হারুন অর রশিদ (হাতপাখা) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) সিটে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৩ হাজার ৫৬১জন। এ সিটে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম পিন্টু (ধানের শীষ), জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী হুমায়ুন কবীর (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির হুমায়ুন কবীর তালুকদার (লাঙল) এবং ইসলামী আন্দোলনের মনোয়ার হোসেন সাগর (হাতপাখা) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৩৬৫ জন। এ সিটে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য এসএম ওবায়দুল নাসির (ধানের শীষ), এনসিপি’র সাইফুল্লা হায়দার (শাপলাকলি), ইসলামী আন্দোলনের রেজাউল করিম (হাতপাখা), বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদ (মোটরসাইকেল) ও স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী আইনুন নাহার (হাঁস) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭০ হাজার ৩৯ জন। এ আসনে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য লুৎফর রহমান মতিন (ধানের শীষ), বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল হালিম মিঞা (মোটরসাইকেল), জামায়াতে ইসলামীর খনন্দকার আব্দুর রাজ্জাক (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির লিয়াকত আলী (লাঙল), ইসলামী আন্দোলনের আলী আমজাদ হোসেন (হাতপাখা) এবং হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেকমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী (হাঁস) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মোট ৪ লাখ ৫৭ হাজার ১৭৩ জন ভোটারের টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমীর আহসান হাবিব মাসুদ (দাঁড়িপাল্লা), বাংলাদেশ কংগ্রেসের একেএম শফিকুল ইসলাম (ডাব), ইসলামী আন্দোলনের খন্দকার জাকির হোসেন (হাতপাখা), গণসংহতি আন্দোলনের ফাতেমা আক্তার বীথি (মাথাল), জাতীয় পার্টির মোজাম্মেল হক (লাঙল), গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) শফিকুল ইসলাম (ট্রাক), সুপ্রীমপার্টির (বিএসপি) হাসরত খান ভাসানী (একতারা), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সৈয়দ খালেকুজ্জামান মোস্তফা (তারা), বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু (ধানের শীষ) এবং বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী ফরহাদ ইকবাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৬২ হাজার ৩৪১ জন। এ আসনে বিএনপির রবিউল আওয়াল (ধানের শীষ), বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী জুয়েল সরকার (হরিণ), জামায়াতে ইসলামীর একেএম আব্দুল হামিদ (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির (জেপি) তারেক শামস খান হিমু (বাইসাইকেল), জাতীয় পার্টির মামুনুর রহিম (লাঙল), ইসলামী আন্দোলনের আখিনুর মিয়া (হাতপাখা) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল ইসলাম (মোরগ) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮২৭ জন। এ আসনে বিএনপির শিশু বিষয়ক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এবনে আবুল হোসেন (দাঁড়িপাল্লা) এবং বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির তোফাজ্জল হোসেন (হাতী) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখীপুর) এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯ হাজার ৩০৮ জন। এ আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান (ধানের শীষ), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির আওয়াল মাহমুদ (কোদাল), আমজনতার দলের আলমগীর হোসেন (প্রজাপতি), জাতীয় পার্টির নাজমুল হাসান (লাঙল), জামায়াতে ইসলামীর শফিকুল ইসলাম খান (দাঁড়িপাল্লা) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী শিল্পপতি সালাউদ্দিন আলমগীর রাসেল (হাঁস) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
টাঙ্গাইলে বিএনপির প্রার্থীরা তাদের প্রচারণায় ‘উন্নয়ন’কে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাদের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে- ক্ষমতায় গেলে তারা ফ্যামিলি কার্ডসহ বিএনপির রাষ্ট্র মেরামতের ২৩ দফা বাস্তবায়ন করা হবে। টাঙ্গাইলের যমুনা নদীর ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, বিসিক শিল্পনগরীর আধুনিকায়ন এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে টাঙ্গাইলকে একটি আধুনিক অর্থনৈতিক জোনে রূপান্তরের কথা বলছেন তারা। বিএনপি নেতারা ভোটারদের আশ্বস্ত করছেন- প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে তারা সবার জন্য সমান উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করবেন। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান টাঙ্গাইলের জনসভায় ঘোষণা করেছেন, ক্ষমতায় গেলে এখানকার ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পকে আধুনিকায়ন এবং আনারস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা হবে। কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ এবং স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন বিএনপি প্রার্থীরা।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা মূলত ‘ইনসাফ ও সামাজিক নিরাপত্তা’র ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তারা বলছেন, গত কয়েক দশকে টাঙ্গাইলের মানুষ যে অস্থিরতা ও অনিরাপদ বোধের মধ্য দিয়ে গেছে, তার অবসান ঘটানো হবে। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং প্রতিটি নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারা। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও বিরোধী মতাদর্শের ভোটারদের তারা পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামী মূলত আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর জোর দিচ্ছে। তারা দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে। এছাড়া শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে দলটি।
এছাড়া জাতীয় পার্টি, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ অন্যান্য ছোট দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মূলত ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সংস্কার ও সংহতি’র স্লোগান দিচ্ছেন। তাদের মতে, বড় বড় দলের সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। তারা নির্বাচিত হলে টাঙ্গাইলে একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সমঅধিকারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে তারা আওয়ামী সমর্থকদের আশ্বস্ত করছেন যে, তাদের শাসনামলে কেউ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হবে না।
সরেজমিনে জেলার ৮টি পার্লামেন্টারিয়ান সিটের বিভিন্ন এলাকার নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে নানা আঙ্গিকে কথা বলে জানা গেছে- অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ ইলেকশন হলে এবার টাঙ্গাইল-১, টাঙ্গাইল-২, টাঙ্গাইল-৬ ও টাঙ্গাইল-৭ আসনে বিএনপি প্রার্থী; টাঙ্গাইল-৩, টাঙ্গাইল-৪ ও টাঙ্গাইল-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারেন। ওইসব আসনের প্রার্থীরা অধিকাংশ ভোটারের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। এবং টাঙ্গাইল-৫ আসনে বিএনপি ও বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে। পাল্টাপাল্টি মিটিং-মিছিল ও বিবাদ-সংঘর্ষও হচ্ছে। এ আসনে যিনি আওয়ামী ভোটারদের কাছে টানতে পারবেন তিনিই হাসবেন শেষ হাসি। এছাড়া জেলার ৮টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের ভোটব্যাংক রয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এক ধরনের সতর্কতা লক্ষ্য করা গেছে। দেশে নির্বাচনের আবহ তৈরি হওয়ায় আগ্রহ থাকলেও আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটাররা এখনো ‘নীরব’। তারা প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড ও বর্তমান প্রতিশ্রুতিগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। এই ভোটারদের মতে, যিনি এলাকার শান্তি বজায় রাখবেন এবং হয়রানি বন্ধের গ্যারান্টি দেবেন, তাকেই তারা বেছে নেবেন।
টাঙ্গাইলে এবার মোট ৬৫ জন প্রার্থী মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন। যার মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ৮টি আসনে ৪৭ প্রার্থীর মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। টাঙ্গাইলে ৮টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ৩৩ লাখ ৩৪ হাজার ৪২৭ জন। মোট ভোটকেন্দ্র এক হাজার ৬৩টি। জেলায় প্রবাসী ও সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পোস্টাল ভোটের সংখ্যা ৪০ হাজার ৯৩ জন। সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইলের লড়াই কেবল ভোটের নয় বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের পরিবর্তনের এক নতুন লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের এই বিশাল ভোটব্যাংক কার বাক্সে যায়- তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত।






