
সিনিয়র রিপোর্টার ॥
রাত পোহালেই বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বহুল কাঙ্খিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। টাঙ্গাইলের ৮টি আসনে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে একযোগে ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। এরই মধ্যে জেলার সব কেন্দ্রে উপকরণ পৌঁছানো থেকে ভোটের সব প্রস্তুতি শেষ করেছে জেলা নির্বাচন অফিস। এদিকে নির্বাচনকে সুষ্ঠ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনের সর্বস্তরের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন।
টাঙ্গাইল জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের ৮টি সংসদীয় আসনে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ৩৩ লাখ ৩৪ হাজার ৪২৭ জন। বিপুল এই ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে জেলাজুড়ে ১ হাজার ৬৩টি ভোটকেন্দ্রের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে মোট ৬ হাজার ৩৪১টি ভোটকক্ষ (বুথ)। ভোটের দিন যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ও ভোট জালিয়াতি রোধে পুরো জেলায় স্থাপন করা হয়েছে ২ হাজার ৩৬০টি সিসি ক্যামেরা। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে প্রতিটি ভোটকেন্দ্র ও বুথের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হবে। নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের মতে, কেন্দ্র দখল, ভোট কারচুপি কিংবা বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে এই প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। জেলা প্রশাসন ও নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, জেলা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে স্থাপিত একটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম থেকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো কেন্দ্রে গোলযোগ, অনিয়ম বা পেশিশক্তির ব্যবহার ধরা পড়লে সিসি ক্যামেরার ফুটেজের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
টাঙ্গাইল জেলার ভোটার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৬ লাখ ৭১ হাজার ৬৩০ জন, নারী ভোটার ১৬ লাখ ৬২ হাজার ৭৭২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ২৫ জন। এতো বিপুল সংখ্যক ভোটারের নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরা ব্যবস্থাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি বুথ ও কেন্দ্রের প্রবেশপথে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় ভোটাররা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, সিসি ক্যামেরা থাকায় কেন্দ্র দখল ও জাল ভোটের আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে। অপরদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তির এই ব্যবহার নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
এবার টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ি) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৬৯৩ জন। এ আসনে বিএনপির ফকির মাহবুব আনাম (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ আব্দুল্লাহেল কাফী(দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির মুহাম্মদ ইলিয়াছ হোসেন (লাঙল), বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র মোহাম্মদ আলী (মোটরসাইকেল), স্বতন্ত্র আসাদুল ইসলাম (তালা) এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হারুন অর রশিদ (হাতপাখা) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) সিটে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৩ হাজার ৫৬১জন। এ আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম পিন্টু (ধানের শীষ), জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী হুমায়ুন কবীর (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির হুমায়ুন কবীর তালুকদার (লাঙল) এবং ইসলামী আন্দোলনের মনোয়ার হোসেন সাগর (হাতপাখা) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৩৬৫ জন। এ আসনে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য এসএম ওবায়দুল নাসির (ধানের শীষ), এনসিপি’র সাইফুল্লা হায়দার (শাপলা কলি), ইসলামী আন্দোলনের রেজাউল করিম (হাতপাখা), বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদ (মোটরসাইকেল) ও স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী আইনুন নাহার (হাঁস) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭০ হাজার ৩৯ জন। এ আসনে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য লুৎফর রহমান মতিন (ধানের শীষ), বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল হালিম মিঞা (মোটরসাইকেল), জামায়াতে ইসলামীর খনন্দকার আব্দুর রাজ্জাক (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির লিয়াকত আলী (লাঙল), ইসলামী আন্দোলনের আলী আমজাদ হোসেন (হাতপাখা) এবং হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেকমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী (হাঁস) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

মোট ৪ লাখ ৫৭ হাজার ১৭৩ জন ভোটারের টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমীর আহসান হাবিব মাসুদ (দাঁড়িপাল্লা), বাংলাদেশ কংগ্রেসের একেএম শফিকুল ইসলাম (ডাব), ইসলামী আন্দোলনের খন্দকার জাকির হোসেন (হাতপাখা), গণসংহতি আন্দোলনের ফাতেমা আক্তার বীথি (মাথাল), জাতীয় পার্টির মোজাম্মেল হক (লাঙল), গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) শফিকুল ইসলাম (ট্রাক), সুপ্রীমপার্টির (বিএসপি) হাসরত খান ভাসানী (একতারা), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সৈয়দ খালেকুজ্জামান মোস্তফা (তারা), বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু (ধানের শীষ) এবং বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী ফরহাদ ইকবাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৬২ হাজার ৩৪১ জন। এ আসনে বিএনপির রবিউল আওয়াল (ধানের শীষ), বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী জুয়েল সরকার (হরিণ), জামায়াতে ইসলামীর একেএম আব্দুল হামিদ (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির (জেপি) তারেক শামস খান হিমু (বাইসাইকেল), জাতীয় পার্টির মামুনুর রহিম (লাঙল), ইসলামী আন্দোলনের আখিনুর মিয়া (হাতপাখা) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল ইসলাম (মোরগ) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮২৭ জন। এ আসনে বিএনপির শিশু বিষয়ক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এবনে আবুল হোসেন (দাঁড়িপাল্লা) এবং বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির তোফাজ্জল হোসেন (হাতী) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখীপুর) এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯ হাজার ৩০৮ জন। এ আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান (ধানের শীষ), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির আওয়াল মাহমুদ (কোদাল), আমজনতার দলের আলমগীর হোসেন (প্রজাপতি), জাতীয় পার্টির নাজমুল হাসান (লাঙল), জামায়াতে ইসলামীর শফিকুল ইসলাম খান (দাঁড়িপাল্লা) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী শিল্পপতি সালাউদ্দিন আলমগীর রাসেল (হাঁস) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সরেজমিনে জেলার ৮টি আসনের বিভিন্ন এলাকার নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে নানা আঙ্গিকে কথা বলে জানা গেছে, এবার অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ ইলেকশন হলে টাঙ্গাইল-১, টাঙ্গাইল-২, টাঙ্গাইল-৬ ও টাঙ্গাইল-৭ আসনে বিএনপি প্রার্থী। টাঙ্গাইল-৩, টাঙ্গাইল-৪ ও টাঙ্গাইল-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে টাঙ্গাইল-৫ আসনে বিএনপি (ধানের শীষ) ও বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র (হরিণ) প্রতিকের প্রার্থী এবং জামায়াতে ইসলামীর (দাঁড়িপাল্লা) প্রতিকের প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। এ আসনে যিনি আওয়ামী ভোটারদের কাছে টানতে পারবেন তিনিই হাসবেন শেষ হাসি। এছাড়া জেলার ৮টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের ভোটব্যাংক রয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এক ধরনের সতর্কতা লক্ষ্য করা গেছে। দেশে নির্বাচনের আবহ তৈরি হওয়ায় আগ্রহ থাকলেও আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটাররা এখনো ‘নীরব’। তারা প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড ও বর্তমান প্রতিশ্রুতিগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। এই ভোটারদের মতে, যিনি এলাকার শান্তি বজায় রাখবেন এবং হয়রানি বন্ধের গ্যারান্টি দেবেন, তাকেই তারা বেছে নেবেন।
টাঙ্গাইলে এবার মোট ৬৫ জন প্রার্থী মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন। যার মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ৮টি আসনে ৪৭ প্রার্থীর মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। টাঙ্গাইলে ৮টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ৩৩ লাখ ৩৪ হাজার ৪২৭ জন। মোট ভোটকেন্দ্র এক হাজার ৬৩টি। জেলায় প্রবাসী ও সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পোস্টাল ভোটের সংখ্যা ৪০ হাজার ৯৩ জন। সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইলের লড়াই কেবল ভোটের নয়। বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের পরিবর্তনের এক নতুন লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের এই বিশাল ভোটব্যাংক কার বাক্সে যায়- তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচনের দিনের ফলাফল পর্যন্ত।
নির্বাচন বিষয়ে টাঙ্গাইলের রিটার্নিং অফিসার শরীফা হকের দায়িত্ব পালনে সহায়তাকারী অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সঞ্জয় কুমার মহন্ত জানান, সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে প্রতিটি কেন্দ্রের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম বা গোলযোগের আভাস পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ভোট গ্রহণ স্থগিত করার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে। প্রযুক্তির এই ব্যবস্থাপনা ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।






