
তানিয়া আক্তার ॥
পবিত্র মাহে রমজান তার শুভযাত্রা শুরু করছে। নিত্য জীবনযাপনে আসছে ভিন্ন মাত্রার প্রস্তুতি এবং ব্যস্ততা। বিশেষ করে ঘরের গৃহিণীরা রমজান মাসকে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যে পালন করতে হরেক রকম প্রস্তুতি গুছিয়ে নিচ্ছেন। রমজানের বিভিন্ন আয়োজনে যে নতুন মাত্রা যোগ হয় তা ক্ষুদ্র পারিবারিক আঙিনাটিকে অন্যরূপে সাজিয়েও নেয়। ইবাদত-বন্দেগির মাসটিতে নামাজেও আসে সংযোজন। ২০ রাকাত নামাজ যুক্ত হয় এশারের নামাজের সঙ্গেই। রোজার জন্য এই ২০ রাকাত সুন্নত নামাজ একেবারে অবশ্য পালনীয়। পুরুষরা মূলত মসজিদে গিয়ে এই পবিত্র নামাজ আদায় করেন। আর মেয়েরা ঘরে বসেই ইবাদত-বন্দেগিতে যুক্ত হন। ঘরের কর্ত্রী মহাব্যস্ত থাকেন ইফতারি ও সেহরির আলাদা আয়োজন নিয়ে। ফজরের নামাজের সময়ের কিছু আগেই সেহরির ব্যাপারটি নির্ধারণ হয়ে যায়। তাও এক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। দুপুর এবং রাতের খাবারে যা নিয়মিতভাবে আমরা অভ্যস্ত সেহরিতে, কিন্তু সে রকম নয়। সময়টা যেমন আলাদা খাবার পরিবেশনেও থাকে উপযোগী আহার সামগ্রী। আর গৃহিণীকেই সেদিকে সচেতন নজরদারি করে সব কিছুর ব্যবস্থা করতে হয়।
সঙ্গত কারণেই ব্যস্ত সময় পার করা ছাড়াও নামাজ, রোজাও কেবলমাত্র উপবাস নয় সব ধরনের ধর্মীয় আয়োজন ও প্রস্তুতি নিয়ে সিয়াম সাধনার এই মাসটিকে তার যথাযথ মর্যাদাও দিতে হয়। আর ইফতার মানেই রকমারি খাবারের আলাদা স্বাদ। যা গৃহিণীদের নজর কাড়ে সব সময়ই। ভোররাতে সেহরি খাবার পর মনে করে ছোলাটা ভিজিয়ে রাখেন ঘরের কর্ত্রী। সেহরির জন্য একটু স্বস্তিদায়ক, হজমযোগ্য হাল্কা খাবারেই বেশি দৃষ্টি দেন গৃহিণীরা। মাছ-ভাত তো থাকেই, সঙ্গে হাল্কা মুরগির ঝোলও উপাদেয় এবং স্বাস্থ্যসম্মত।
সারা দিন রোজা রেখে পরিশ্রম করে ঘরের কর্ত্রীই এসব সুস্বাদু খাবার তৈরি করেন। ব্যস্ততার মাঝে রোজার সময় যে কিভাবে কাটে বুঝতেও পারা যায় না। আবার শিশু-কিশোররা সেভাবে রোজা রাখতে পারেও না। দিনের মধ্যভাগের গরমে রমজান মাস অতিবাহিত হওয়ার মধ্যেই আমরা এক প্রকার অভ্যস্ত হয়ে গেছি। খুব যে কষ্ট হয়- কিংবা পানির পিপাসা লাগে সেটা বুঝতেও পারা যায় না। আসলে ধর্মীয় ব্যাপারগুলো অন্তর্নিহিত বোধে এমনভাবে জড়িয়ে থাকে যেখানে শুভ আর মঙ্গল ছাড়া অন্য কিছু চিন্তাতেও আসে না। বাসায় অসুস্থ কিংবা বয়োবৃদ্ধরা অনেকেই রোজ রাখতে পারেন না। তাঁদের জন্যও সকালের নাশতা, দুপুরের খাবারের আয়োজনে গৃহিণীদের বিশেষ মনোযোগ দিতে হয়। আসলে সংসারের কর্ত্রীর সারা দিন বিশ্রাম বলে যা বোঝায় তা মোটেও হয় না।
আছরের নামাজের পর পরই ইফতার তৈরির বিভিন্ন আয়োজন শুরু হয়ে যায়। ছোলা সিদ্ধ করা, পেঁয়াজি, বেগুনির রেসিপি গোছানো সবই যেন সঠিক সময়ের মধ্যে প্রস্তুত করা যায়, যাতে রোজা খোলার আগ মুহূর্তে হাতের নাগালে পেতে সমস্যা না হয়। ইফতারির আরও বাড়তি সংযোগও থাকে। ঠান্ডা শরবত নয় লাচ্ছির মতো সুস্বাদু পানীয়। সবই ঘরেই তৈরি করা হয় গৃহকর্ত্রীর নৈপুণ্যের ছোঁয়ায়। এরপর হালিমের মতো আরও একটি বিশেষ খাবার রজমান মাসকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। আবার অনেকেই সাদা ভাত, সবজি এবং মাছ দিয়ে ইফতার পর্বটি সারতে পছন্দ করেন। সঙ্গে দই, চিড়া থাকলে বেশ উপাদেয় হয়। যেমন স্বাস্থ্যসম্মত তেমনই গরমের মধ্যে উপযোগী এক সুস্বাদু আহার। মাছে-ভাতে বাঙালী বলে কথা। সঙ্গে যে কোন হাল্কা মিষ্টির অন্যরকম খাবারও ইফতারের তালিকায় থাকেই।
মানুষ এখন অনেক বেশি স্বাস্থ্য সচেতন। এখন মিষ্টি জাতীয় খাবারে চিনি-গুড় কম দেয়া এক প্রকার রেওয়াজই বলা চলে। সব কিছুর দিকে কঠোর তদারকি করতে হয় গিন্নিকেই। কোন কিছুর ঘাটতি কিংবা কমতিতে যেন বিব্রতকর পরিস্থিতির অবতারণা না হয়। ইফতারের পর এক কাপ কফি ও চা যেন বড় বেশি দরকার হয়ে পড়ে, সেদিকও সামলাতে হয় ঘরের কর্ত্রীকে। তিনি নিজেও এক কাপ চা পানে বেশ স্বস্তি অনুুভব করেন। মনে হয় অনেক ক্লান্তি, অবসাদ যেন আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। ইফতারটা ভাল করে খাওয়া হলে অনেকেই রাতের খাবার আর খেতেই চান না। তাহলে সেহরিটা অনেক বেশি তৃপ্তি সহকারে উপভোগ করা যায়। আবার রাতের তারাবির নামাজের জন্যও ভরা পেটে খাবার কোন ভাবেই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। পরিমিত খাদ্য গ্রহণ ইসলাম ধর্মও অনুমোদন করে।
গোটা এক মাস ধরে চলে প্রতিদিনের জীবনাচরণের নতুন সংযোগ সেটা খাবার। সময় থেকে শুরু করে নামাজেও পড়ে অন্যরকম প্রভাব। সব সামলিয়ে রোজাটা পালন করতে সে রকম কোন অসুবিধাই হয় না। আর গৃহিণীরা তো বুঝতেই পারেন না নানা ব্যস্ততার মাঝে কোন দিকে সময়টা গড়িয়ে যায়। উষ্ণ আবহাওয়াকেও তোয়াক্কা করে না ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে পালন করা পবিত্র রোজা। সুতরাং রমজান আসে তার সমস্ত মাহাত্ম্য আর আবেদন-নিবেদনের পশরা সাজিয়ে। দেখতে দেখতে একটা মাস কেটেও যায়। শেষ হয়ে গেলে আবার আক্ষেপও তৈরি হয় রোজার জন্য। শুধু তাই নয় পরের বছরের জন্য অপেক্ষার পালাও যেন শুরু।






