
স্পোর্টস রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলের ক্রিকেট মাঠের অন্যতম সফল ক্রিকেটার ইসলাম খান নিরলস প্রচেষ্টা, দৃঢ়তা, অবিরাম সাধনা এবং সহনশীলনতায় অবশেষে টাঙ্গাইল জেলা দলের ক্রিকেট কোচ নির্বাচিত হয়েছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অধীনে প্রথমবারের মতো ইসলাম খান টাঙ্গাইল জেলার কোচ নির্বাচিত হয়েছেন। জেলার সাবেক ক্রিকেট কোচ আরাফাত রহমানের পদোন্নতিতে টাঙ্গাইল জেলার ক্রিকেট কোচ পদটি বছর দু’য়েক শূন্য ছিলো।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন চৌধুরীর স্বাক্ষরিত পত্রে জানা যায়, গত (১ ফেব্রুয়ারি) থেকে আগামী বছরের (৩১ জানুয়ারি) পর্যন্ত দায়িত্বে থেকে তিনি টাঙ্গাইল জেলার ক্রিকেট দল গঠন এবং উন্নয়নে কাজ করবেন।
প্রথমবারের মতো দায়িত্ব পেয়ে ইসলাম খান বলেন, টাঙ্গাইলের ক্রিকেট উন্নয়নে সততা ও নিষ্ঠার সাথে আমি দায়িত্ব পালন করবো। টাঙ্গাইলের ক্রিকেট উন্নয়ন করার জন্য গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলাসহ তৃনমূল পর্যায় থেকে নতুন ক্রিকেটার খুঁজে বের করে জেলা দল এবং সারাদেশের মধ্যে জেলার উন্নয়নে অবদান রাখতে এ রকম ক্রিকেটার তৈরী করতে পারি। এজন্য সবার দোয়া চাই। আপনাদের দিক নিদর্শন মেনে নিয়ে আমি যেন আমার দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করতে পারি।
ইসলাম খান দক্ষতা, একনিষ্ঠ, পরিশ্রমী ক্রিকেট জীবনে ক্রিকেটকে ভালবেসেছেন। ছোটবেলায় নবম শ্রেনীতে পড়া সময় ১৯৯২ সালে প্রথম ক্রিকেট খেলায় হাতে খড়ি। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক ক্রিকেটার ও কোচ মন্টু ও আলতাফ হোসেনের অনুপ্রেরনাই ক্রিকেট খেলার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়ে সেই শুরু। প্রথমে বিভিন্ন পর্যায়ে ক্রিকেট খেলা, তারপর ক্রিকেট থেকে অবসরের পর ক্রিকেট শেখার কারিগর ক্রিকেট কোচ হয়ে উঠা।
পড়াশোনায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স কমপ্লিট। তবে সরকারী কিংবা বেসরকারী চাকরীর চেষ্টা করেননি। বাবার আবাসিক হোটেল ব্যবসা আর ক্রিকেট নিয়ে পড়ে থাকছেন। তিনি একটানা ২০ বছর ঢাকা ক্রিকেট লীগে বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে অংশগ্রহণ করেন। মাঠের দক্ষ উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ইসলাম খান খেলা থেকে অবসরের পর ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে কোচ লেভেল এ প্রশিক্ষণ এবং ২০১২ সালে জুন মাসে লেভেল ওয়ান প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড থেকে। শুরুতে সর্বশেষ যে ক্লাবে ক্রিকেট খেলেছেন সেই ঢাকা প্রথম বিভাগের উত্তরা স্পোটিং ক্লাবের কোচ হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। বিগত ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল উত্তরা স্পোটিং ক্লাব এবং ২০১৭ সালে ওয়ারী ক্লাবের ক্রিকেট কোচ ছিলেন।
পিতার মৃত্যুর পর চলে আসেন নিজ জেলা টাঙ্গাইলে। শিশু-কিশোরদের হাতে ধরে ক্রিকেট শেখানোর জন্য টাঙ্গাইল টাইগার্স ক্রিকেট একাডেমী নামে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ শুরু করেন। সেই শুরু, আজ অবদি ক্রিকেট নিয়ে পড়ে আছেন। দক্ষ ক্রিকেট কোচ হওয়া স্বত্তেও নিজ এলাকায় এদিন মূল্যায়ন পাননি। হতে পারেনি জেলা ক্রীড়া সংস্থা কিংবা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নিয়োজিত ক্রিকেট কোচ। অবশেষে সেই ডাক তিনি পেয়েছেন। টাঙ্গাইল জেলা ক্রিকেট দলের কোচ হয়েছেন। এখন তার দক্ষতায় দায়িত্ব পালনের সময়।
টাইগার্স ক্রিকেট একাডেমীতে টাঙ্গাইলের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সরকারী চাকরীজীবি ও ব্যবসায়ীর সন্তানরা ছাড়াও দরিদ্র শ্রেনীর ছেলেমেয়েদের ক্রিকেটে দীক্ষা নিচ্ছেন। ইসলাম খানের ক্রিকেট কোচিং দক্ষতাকে মূল্যায়ন করেছেন টাঙ্গাইলের কুমদিনী সরকারী মহিলা কলেজ ক্রিকেট দল। তার কোচিংয়ে কুমুদিনী সরকারি কলেজ ঢাকা ডিভিশনের ক্রিকেট খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়। তার কোচিং দক্ষতায় মোটামোটি মানের খেলোয়াড় নিয়ে টাঙ্গাইল প্রিমিয়ার ক্রিকেট লীগের স্বদেশী ক্লাব দু’বার চ্যাম্পিয়ন ও সর্বশেষ লীগে রানার্সআপ হয়। টাঙ্গাইল পুলিশ লাইনস্ স্কুলও তার কোচিংয়ে রানার্সআপ হয়। তার টাইগার্স ক্রিকেট একাডেমী দক্ষ প্রশিক্ষণে মিজান, রিফাত আল জাবি ও আবিদের মতো খেলোয়াড় বিকেএসপিতে ভর্তির সুযোগ হয়েছে। তারই প্রশিক্ষণে ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে সুনামের সাথে তারেক, কামরুল, পাপ্পু, প্রীতমরা খেলছেন।
ইসলাম খান ১৯৯২ সালে ক্রিকেট খেলায় যাত্রা শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে বিকেএসপির তত্বাবধানে প্রতিভা অন্বেষন কর্মসূচীতে জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার রাজিন সালেহ, হান্নান সরকার, এনামুল জুনিয়র, তাপস বৈশ্য ও অলোক কাপালীদের সাথে এক মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৯৩ সালে ঢাকায় দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট দল স্পেট ঈগল ক্লাবে খেলার মাধ্যমে যাত্রা শুরু। ওখানে দুই বছর খেলার পর ১৯৯৫ সালে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট ক্লাব খেলাঘর সমাজ কল্যান সমিতি, ১৯৯৬ ও ৯৭ সালে গুলশান ইয়ুথ ক্লাবে দুই বছর, ১৯৯৮ সালে ঢাকা সিটি ক্লাবে খেলে চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রিমিয়ার ক্রিকেট লীগে উঠেন। ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত আবার খেলাঘর সমাজ কল্যাণ ক্লাবে, ২০০২ সাল থেকে ২০০৫ ঢাকার প্রথম বিভাগের অফিস দল অগ্রণী ব্যাংকে খেলেন। এর মধ্যে ২০০৪ সালে প্রথম বিভাগ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ২০০৫ সালে প্রিমিয়ার ডিভিশনে খেলেন। ২০০৬ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত উত্তরা স্পোর্টি ক্লাবে একটানা ৫ বছর। এই ক্লাবে ৩ বছর অধিনায়কত্ব করেন। ২০১১ ও ১২ সালে আবার অগ্রণী ব্যাংকে দুই বছর, ২০১৩ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত থেকে উত্তরা স্পোটিং ক্লাবের কোচ কাম প্লেয়ার হিসেবে খেলেন এবং ক্রিকেট খেলা থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
টাঙ্গাইল পৌর শহরের থানাপাড়ার ইবাদত খানের সেজ ছেলে ইসলাম খান স্থানীয় ক্রিকেট ব্যাটসম্যান হিসেবে একজন সফল ক্রিকেটার। তিনি তার এলাকার প্রগতিশীল স্বদেশী সংঘ হয়ে খেলার যাত্রা শুরু করেন। মুসলিম রেনেসাঁ, ইলেভেন স্টার, থানাপাড়া, ইয়ং স্টার ও ইষ্টার্ন স্পোটিং ক্লাবে খেলেছেন। তিনি ৭ বার চ্যাম্পিয়ন দলের গর্বিত সদস্য হন। ব্যাটসম্যান হিসেবে কয়েকবার স্থানীয় ক্রিকেট লীগে সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী হিসেবে পুরষ্কার অর্জন করেন।
ইসলাম খান আরো বলেন, তিনি খেলোয়াড় হিসেবে জাতীয় দলে খেলতে পারেননি। আক্ষেপ পূরণ করতে চান তার প্রশিক্ষণে তৈরী করা খেলোয়াড়দের দ্বারা। টাঙ্গাইলের একজন ক্রিকেটার যেদিন বাংলাদেশের জাতীয় দলের হয়ে ক্রিকেট খেলবেন, সেই দিন তার অপূর্ন স্বপ্নের অবসান হবে।






