হাসান সিকদার, জেদ্দা, সৌদি আরব থেকে ॥
মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রত্যাশা আর প্রস্তুতির কমতি থাকে না। একের পর এক ঈদ আসে যায়, কিন্তু প্রবাসীদের ঈদ রয়ে যায় নিঃসঙ্গতায় ভরা। ফজরের আজানের পর দল বেঁধে ছোটাছুটি করে গোসল সেরে মিষ্টি মুখে নতুন জামা-কাপড় পরে ঈদগাহ মাঠে যাওয়া প্রবাসীদের জন্য যেন শুধুই স্মৃতি। নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় পাশের বাড়ির কেউ আর ডাক দিয়ে বলে না- সেমাই খেয়ে যাও। শত কর্মব্যস্ততার মাঝে ঈদের ছুটিতে লম্বা ঘুম অধিকাংশ প্রবাসীর ঈদের দিনে মূল কর্মসূচি। ঈদের নামাজ শেষে দেশে ফোন করার পর বুকের ভেতর কষ্টের তীব্রতা যেন আরও বেড়ে যায়। বুকফাঁটা যন্ত্রণাকে বুকে নিয়ে বিছানায় গিয়ে চোখের পানিতে বালিশ ভিজিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করেন অনেকে। আর এরপর দুপুর গড়িয়ে পুবের সূর্যটা পশ্চিমে হেলতে শুরু করে। বিছানা ছেড়ে দু’একজন বন্ধুকে সাথে নিয়ে সামান্য আনন্দের প্রত্যাশায় অজানার উদ্দেশ্যে ছুটে চলা। এভাবেই কেটে যায় মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের ঈদ নামের নিঃসঙ্গ বেদনার দিনটি।
প্রবাসীদের ঈদ মানে মনে শত কষ্ট নিয়েও ‘হ্যাঁ, আমি ভালো আছি’ বলা। পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করা সত্যিই অন্য রকম আনন্দের। কিন্তু সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন প্রবাসীরা। দেশে ঈদ উদযাপন করা আর প্রবাসে উদযাপনের অনেক তফাত। কিন্তু পরিবারের হাল ধরতে এমন পরিস্থিতিকে মেনে নেন প্রবাসীরা। তিন বছর যাবৎ সৌদি আরবে জেদ্দা শহরে আছেন গাজীপুরের শিবলী আহমেদ। দেশের বাড়িতে বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান রেখে পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে সৌদিতে আসেন তিনি। আজ সৌদি আরবে পবিত্র ঈদুল ফিতর পালিত হচ্ছে। তবে পরিবারের সাথে ঈদ করতে না পারার কষ্টের কথা বলেন শিবলী। তিনি বলেন, নিরুপায় হয়ে পরিবার থেকে দূরে সৌদি আরবে বসে ঈদ উদযাপন করলাম। এ রকম ঈদে কোনো আনন্দ নেই। বরং দুই ঈদের সময় গুলোতে কষ্টের হয়ে আসে। কারণ বিশেষ দিনগুলোতে বাবা-মা ও আত্মীয় স্বজনদের কথা বেশি মনে পড়ে। আজও তাই হচ্ছে। সকালে ঈদের নামাজ পড়ে আসার পর দেশের বাড়িতে থাকা বাবা-মা ও স্ত্রী-সন্তানের কথা খুব মনে পড়ছিল। তারপর ফোনে কলে কথা বলে কিছুটা হলেও শান্তি পেয়েছি। তবে মায়ের হাতের রান্না খুবই মিস করছি। তিনি আরও বলেন, প্রবাসীদের ঈদ কাটে পরিবারের সদস্যদের সাথে ফোনে কথা বলে আর ঘুমিয়ে। এর বাইরে তেমন আনন্দ থাকে না। কোথাও ঘুরতেও যেতে ইচ্ছে করে না।
আরেক প্রবাসী সুমন মিয়া বলেন, আমার সবই আছে, শুধু সময়টাই নেই। ঈদের দিন সময় বের করে বাংলাদেশের আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে মোবাইলে কথা হয়। শুধু এতটুকুই। সময় বড়ই নিষ্ঠুর, ইচ্ছে করলেই সব কিছু করতে পারি না। বাড়িতে কথা বলার সময় কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। যখন ফোনের ওপাশ থেকে মা বলেন, কেমন আছিস বাবা, তখন চাপা কষ্টে বলতে হয় ভালো আছি মা। আমাদের প্রত্যেকটা ঈদ চাপা কষ্ট নিয়েই কেটে যায়। তবে যখন শুনি পরিবারের সদস্যরা ভালোভাবে ঈদ কাটাবে, আমার টাকায় কেনাকাটা করছে তখন ভালোই লাগে। আসলে প্রবাসীদের জীবনে ঈদ আছে কিন্তু আনন্দ নেই। রিয়াদ শহরে থাকেন শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঈদ মানে আনন্দ হলেও, প্রবাসীদের কাছে তা কষ্টের। জীবিকার প্রয়োজনে প্রিয়জনদের ছাড়া একাকী ঈদ উদযাপন করতে হয়। সবসময় তো বটেই, ঈদের সময় পরিবারের সবাইকে খুব বেশি মিস করি। ঈদের নামাজ পড়ে এসে একটা ঘুম দেই। বিকেল হলে বন্ধুদের নিয়ে একটু সময় আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরে আসি- এই হলো প্রবাসীদের ঈদ।
মিলন চৌধুরী বলেন, পৃথিবীতে প্রবাসের কষ্টটা একটু অন্য ধরনের। সব আছে, তবু যেন কিছুই নেই। প্রবাসী না হওয়া পর্যন্ত কেউ তাদের কষ্ট অনুভব করতে পারবে না। প্রবাসীদের কষ্টে বাড়তি মাত্রা যোগ করে ঈদ এবং বিশেষ উৎসবের দিনগুলো।। প্রবাস জীবন মানে নিষ্ঠুর, নিঃসঙ্গ জীবনযাপন ও প্রিয়জনের সান্নিধ্য থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে দেয়ালহীন কারাগারে বসবাস। কারও দুঃখ কেউ বুঝতে চেষ্টা করে না। নিজের দুঃখ নিজের অন্তরে রেখে নীরবে কান্না করতে হয়। কাওছার আহমেদ জানান, প্রবাসে এটাই আমার দ্বিতীয় ঈদ। প্রবাসে ঈদ বলতে আলাদা কোনো দিন নেই। সারা মাস কাজ করার পরে একদিন ছুটি পেলে যেমন কাটে ঠিক তেমন। ঈদের আগে বাড়িতে টাকা পাঠিয়েছি, পরিবারের সবার জন্য ঈদের কেনাকাটা করতে বলেছি। তাদের ঈদ আনন্দই আমার ঈদ।
ঈদের দিন কিভাবে কেটেছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সকালে উঠে সেমাই, নুডুলস, খিচুড়ি ও মাংস রান্না করে নামাজ পড়তে যাই। নামাজ থেকে ফিরে খাবার খেয়ে বাড়িতে ফোন দিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলে ঘুমিয়ে পড়ি। সারা মাস কাজ করার ফলে শরীর একটু রেস্ট পেলে ভালো লাগে। তাই বাকি দিন ঘুমিয়ে কাটাই। সোহাগ মিয়া বলেন, আমাদের ঈদ বলতে কিছু নাই। পরিবারের সঙ্গে সকালে কথা বলে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। যদি কোনো বাংলাদেশি পাই তবে তার সঙ্গে গল্প করে কাটিয়ে দেয়। না হলে যথারীতি ঘুমিয়ে কাটাই। তিনি আরও বলেন, প্রবাস জীবনে ঈদের আনন্দ নেই। কবে বাড়িতে যাবো, পরিবারের সাথে ঈদ করতে পারবো সেই ভাবনায় ঈদ কেটে যায়।