
তানিয়া অনুপম ॥
ঈদের আনন্দটা সবথেকে বেশি শিশুদের। ঈদকে ঘিরে উৎসাহটাও তাই তাদেরই বেশি। শিশুদের কাছে ঈদের আকর্ষণীয় বিষয় হলো- ঈদি। অর্থাৎ ঈদের দিন বড়দের সালাম করে আদায় করা ঈদ সেলামি। ঈদের দিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে নতুন পাঞ্জাবি পরে নামাজে যাওয়া। নামাজ শেষে কোলাকুলি। এরপরই গুরুজনদের পায়ে হাত লাগিয়ে সালাম করে সেলামির জন্য অপেক্ষা। আবার ঘরে থাকা মেয়েরা সকালে ঘুম থেকে উঠেই পরিপাটি হয়ে বড়দের সালাম করেই সেলামির জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়ার মধ্যেই ঈদের অন্যরকম আনন্দ ফুটে উঠে। কারো উপহার ২০ টাকা, কারো বা ৫০। কেউবা আবার ১০০ বা ৫০০ অথবা হাজার টাকা। সম্পর্ক আর ভালোবাসার ওপর ভিত্তি করে নির্ভর করে সেলামির টাকার পরিমান। আর এই সেলামিতেই ঈদের খুশি বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
নুতন জামা পরে ঈদের সেলামি জোগাড় করতে বের হওয়ার মতো শৈশব যাদের কেটেছে তারা এখনও সেসব দিনের কথা চিন্তা করে সুখস্মৃতিতে ভোগেন। সময় ও ধরন বর্তমানে বদলে গেলেও সেলামি আনন্দের অনুভূতি আছে একই রকম। ল্যান্ডফোন আমলের সেলামির সকাল- যখনকার কথা বলা হচ্ছে তখন স্মার্টফোন বলে কিছু ছিল না। কারও কারও বাসায় ল্যান্ডফোন ছিল। টেলিভিশনের চ্যানেল মাত্র একটা, বিটিভি। রাতের আনন্দমেলা আর ঈদের নাটক দেখার আনন্দ নেওয়ার আগেই ঈদের উৎসবটা শুরু হতো সেলামি জোগাড়ের মধ্যে দিয়ে। এগুলো এখন সবই স্মৃতির পাতায় পড়ে আছে। ছোটবেলায় ঈদের দিন মানেই ঘুম থেকে উঠে নতুন জামা পরে সেলামি নেওয়া। নতুন কচকচে টাকা, সেই টাকার গন্ধ, ভাঁজ না খোলা নোটের ঝকঝকে ভাব সবকিছুই আলাদা আনন্দের।
ঈদের দিন সকালে পরিবারের বড় সদস্যদের কাছ থেকে রীতিতে পরিণত হওয়া ঈদ সেলামি চাই-ই চাই। কার কাছ থেকে কত আদায় করবে, তা আগে থেকেও হিসাব কষে রাখে অনেকে। শুধু কি ছোটরা, পরিবারের গুরুজনদের কাছে সেলামির আবদার থাকে বড়দেরও। আর হ্যাঁ, এক্ষেত্রে পুরোনো টাকা কিন্তু একদমই চলবে না। সেলামি হিসেবে চাই কড়কড়ে নতুন টাকার নোট। পাড়ামহল্লায় ঘোরা ছাড়াও বাসায় কখন মামা-চাচা-খালুরা বেড়াতে আসে আর তাদের কাছে সেলামি নেওয়া, সেই আনন্দ অপেক্ষাতেই কেটে যেত ঈদের পুরোটা দিন। পুরানো সময়ে ১০, ২০ কিংবা ৫০ টাকার নোট পেলেই মনে হতো বিশাল কিছু পাওয়া গেছে। আবার ঈদের টাকা জমিয়ে রাখা, সেটা কখনও মেলায় বা দোকানে খরচ করা, খাবার খাওয়ার বিষয়গুলোই তৈরি করত বড় আনন্দ। সময়ের সঙ্গে বদলেছে টাকার পরিমাণ। বর্তমানে সেলামির টাকার পরিমাণও অনেক বেড়েছে। আগে ১০ বা ২০ টাকাই ছিল বড় পাওয়া। এখন সেখানে ১০০, ২০০, ৫শ’ এমনকি ১ হাজার টাকার নোটও সেলামিতে দেওয়া হয়। তবে নতুন কচকচে নোট দেওয়ার প্রবণতা এখনও রয়েছে। তাই ঈদের আগে ব্যাংক থেকে নতুন নোট সংগ্রহ করা শুধু সেলামি দেওয়ার জন্য। আর ছোট বিষয়টিই সেলামিকে আরও বিশেষ করে।

বর্তমানে ডিজিটাল সেলামির নতুন ধারা চালু হয়েছে। প্রযুক্তির এই যুগে সেলামির ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। এখন অনেকেই মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইন লেনদেনের মাধ্যমে ‘ডিজিটাল সেলামি’ দেন। দূরে থাকা আত্মীয়দের কাছে টাকা পাঠানো এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে। তবে ডিজিটাল সেলামি যতই সহজ হোক, হাতে নগদ টাকা পাওয়ার অনুভূতি এখনও অনেকের কাছেই বেশি আনন্দের। এছাড়া অফিস সংস্কৃতিতে সেলামির প্রচলন রয়েছে। আগে সেলামি মূলত পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন অনেক প্রতিষ্ঠানে ঈদের ছুটি শুরুর আগেই কর্মীদের সেলামি দেওয়া হয়। সহকর্মীদের মধ্যেও ছোটখাটো সেলামি বিনিময়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। অনেকেই একে সেলামি উৎসব বলেন। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী নিদিতা ইসলাম বলেন, ঈদ সেলামির অন্য রকম নস্টালজিয়া আছে। এখন তো বাসায় আর সেলামি পাই না। তবে ভালো লাগে যে- অফিসে অনেক সহকর্মীরাই সেলামি দেন। কয়েক বছর ধরেই এই ধারা দেখা যাচ্ছে। ঈদের সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সেলামি নিয়ে নতুন ট্রেন্ড চলে এসেছে। কে, কত টাকা সেলামি পেল, নতুন নোটের ছবি, সাজানো টাকার ছবি শেয়ার করাও ঈদ আনন্দের অংশ হয়েছে এখন।
সেলামি নিয়ে প্রতিযোগিতা তখনও ছিল, এখনও আছে। কে বেশি সেলামি পেল- এই প্রতিযোগিতা নতুন কিছু নয়। আগে যেমন- বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে এই নিয়ে তুলনা হতো, এখনও তা আছে, শুধু মাধ্যম বদলেছে। আগে মুখে মুখে এই আলোচনা হতো, এখন তা চলে গেছে অনলাইনেও। গৃহিনী আফিয়া ইয়াসমীন বলেন, সেলামি শুধু টাকা নয়, বরং ভালোবাসা ও আশীর্বাদের প্রতীক। আর বড় হয়ে নিজে ছোটদের সেলামি দেওয়ার ধারা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এই সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখছে। এ বিষয়ে স্কুলের শিশু শিক্ষার্থী উম্মে তাসনিম ইচ্ছা ও আয়ান ইফতেখার জানান, ঈদ সেলামি পাওয়া সবসময়ই খুব আনন্দের ব্যাপার। নতুন টাকা পেলে তো আনন্দ আরো বেড়ে যায়।বড়দের কাছ থেকে সেলামি হিসেবে যে টাকা আদায় করা হয়, সেগুলো মূলত ঈদের আনন্দ উদযাপনেই খরচ করা হয়। অনেকেই আবার জমিয়ে রাখেন পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কাজে লাগানোর জন্য।
এদিকে ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোগল আমলে ভারতবর্ষ ছিল রত্নভাণ্ডারে পরিপূর্ণ। রাজা বাদশারা কারো ওপর খুশি হলে ও বিশেষ দিনেই তার দিকে ছুড়ে দিতেন মণি-মুক্তার মালা অথবা স্বর্ণমুদ্রার থলি। ঈদ সেলামির উৎপত্তিও সেখান থেকেই এসেছে। মুসলিম রাজারা ঈদের দিনগুলোতে তাদের প্রিয় পাত্র এবং দাস-দাসীদের মধ্যে আনন্দ ভাগ করে নিতে মণি-মুক্তা অথবা স্বর্ণমুদ্রা বিলিয়ে দিতেন। তারই ধারাবাহিকতায় আজকের ঈদ সেলামি। ঈদ সেলামির ব্যাপারে বড়রাও থাকেন হুঁশিয়ার। তারাও সংগ্রহে রাখেন নতুন টাকা। সেলামি দেওয়ার মধ্য দিয়ে তারাও যেন অর্জন করেন এক পরম তৃপ্তি।
এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল মডেল সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সাবেক শিক্ষিকা মনোয়ারা পারভীন জানান, ঈদের দিনে পরিবারের ছোটমনি ও আমার স্নেহের এবং আদরের মানুষদের নতুন টাকার নোট দেওয়ার আনন্দটাই অন্যরকম। এখন অবশ্য সেভাবে সালাম করার প্রথা কিছুটা বিলুপ্তির পথে। কেউ আর এখন আগের মতো বড়দের সালাম করে না, কিন্তু সেলামি ঠিকই চায়। তবে সেলামিটা তার পুরানো রেওয়াজেই বেশি মানানসই বলেও জানান তিনি।






