মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল ॥
বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে পহেলা বৈশাখ কেবল একটি পঞ্জিকার পাতা উল্টানো নয়। বরং এটি একটি জাতিসত্তার পুনর্জাগরণ। বাঙালির সম্প্রীতির শ্রেষ্ঠ উৎসব পহেলা বৈশাখ। এই উৎসবের মূলে রয়েছে যেমন ফসলি ঐতিহ্যের ইতিহাস। তেমনি জড়িয়ে আছে বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের চেতনা। মোগল সম্রাট আকবরের ‘ফসলি সন’ থেকে শুরু করে আজকের ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ পর্যন্ত বৈশাখের যে বিবর্তন, তার সমান্তরাল এক ধারা বয়ে চলেছে বাংলা কবিতায়।
পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে রচিত কবিতাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈশাখ এসেছে দ্বিবিধ রূপে- একদিকে জীর্ণকে মুছে ফেলার প্রলয়ংকরী শক্তি হিসেবে। অন্যদিকে নতুনের আবাহনে প্রশান্তির স্নিগ্ধতা নিয়ে। এখানে কবিরা কেবল ঋতু পরিবর্তনের বন্দনা করেননি, বরং এর আড়ালে লুকিয়ে রেখেছেন দ্রোহ, দেশপ্রেম এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক গভীর দর্শন। যুগ যুগ ধরে বাংলা সাহিত্যে বৈশাখ বহুমাত্রিকতা বজায় রেখেছে। মূলত: বৈশাখের দীর্ঘ পথপরিক্রমার শ্রেষ্ঠ রূপকার আমাদের কবিরা। বাংলা কবিতায় দ্রোহ, শুদ্ধি এবং জীর্ণতা ঝরানো নতুনের আবাহনে এক চিরন্তন শক্তির উৎস খুঁজে পাওয়া যায়। মধ্যযুগের কাব্য থেকে আধুনিক কালের নাগরিক পঙক্তিমালা- সবখানেই বৈশাখ তার আপন মহিমায় উদ্ভাসিত।
ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজ-বাস্তবতায় নীল দর্পণ ও বৈশাখের তপ্ত রূপ ধরা পড়েছে কবি ও নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের কলমে। তিনি বৈশাখকে দেখেছেন বাংলার সাধারণ কৃষকের হাহাকার ও নীলকরদের শোষণের প্রেক্ষাপটে। তাঁর কবিতায় বৈশাখ কেবল প্রকৃতির রুদ্র রূপ নয়- বরং শোষিত মানুষের তপ্ত নিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। বৈশাখের সেই দাবদাহের বর্ণনায় তিনি লিখেছেন-
‘বৈশাখের রৌদ্রে যেন অগ্নিবৃষ্টি হয়,
তপ্ত বালুকারাশি অঙ্গে দহে অতিশয়।’
দীনবন্ধুর বৈশাখ ছিল প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল।
বৈশাখী কবিতার আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল অনিবার্য। রবীন্দ্রনাথের ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থের ‘বৈশাখ’ কবিতায় বৈশাখ এক ‘নিরাসক্ত সন্ন্যাসী’, যে জীর্ণতাকে মুছে দিয়ে ধরাকে শুচি করে। অন্যদিকে নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যের ‘প্রলয়োল্লাস’-এ বৈশাখ হলো ‘কাল্-বোশেখির ঝড়’, যা পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রতীক। নজরুলের কাছে বৈশাখ মানেই- ‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখির ঝড়/তোরা সব জয়ধ্বনি কর!’ বাংলা কবিতায় বৈশাখকে এক পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বৈশাখকে দেখেছেন এক ‘তাপস’ রূপে, যে তার নিশ্বাস দিয়ে মরণোন্মুখ সমাজকে জাগিয়ে তোলে। তাঁর কালজয়ী গান ও কবিতায় বৈশাখ এভাবেই মূর্ত হয়েছে-
‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।
তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥’
আবার ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থের বিখ্যাত ‘বৈশাখ’ কবিতায় আমরা দেখি সেই অমোঘ আহ্বান-
‘ওগো দুর্দম, ওগো নির্মল, ওগো মুক্ত,
তোমার চরম দীপ্তির সাথে আমাদের করো যুক্ত।’
বৈশাখ স্মরণে তিনি লিখেন-
‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’
এখানে বৈশাখ কেবল একটি মাস নয়, বরং সমাজ-সংসারের ধুলোবালি ও জঞ্জাল পরিষ্কারের এক আধ্যাত্মিক শক্তি।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গানে বৈশাখ কেবল একটি ঋতু নয়- এটি অন্যায় ও জীর্ণতাকে ধ্বংস করার এক বিপ্লবী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নজরুল নিজেই ছিলেন বৈশাখের প্রতীক- অশান্ত, সাহসী এবং বৈরী।
নজরুলের সাহিত্যে বৈশাখের কিছু উল্লেখযোগ্য দিক হলো- ১. কালবৈশাখী ও বিপ্লবের রূপক: নজরুলের কাছে বৈশাখ মানেই ‘কালবৈশাখী’, যা পরাধীনতা ও অবিচারের শৃঙ্খল ভাঙার এক মহাপ্রলয়। প্রলয়োল্লাস কবিতায় তিনি বৈশাখকে ধ্বংস ও সৃষ্টির এক অদম্য শক্তি হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রবল জ্বরের মধ্যে ১৯২৪ সালে রচিত ‘ঝড়ঃ পশ্চিম তরঙ্গ’ কবিতায় বৈশাখী ঝড়ের রুদ্র রূপ ফুটে উঠেছে। ২. জীর্ণতা দূর করে নতুনের আবাহন: রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ যেখানে শান্ত ও আধ্যাত্মিক, নজরুলের বৈশাখ সেখানে বিদ্রোহী ও বৈপ্লবিক। তিনি বৈশাখকে আবাহন করেছেন পুরোনো আবর্জনা ঝেঁটে ফেলে নতুন পৃথিবী গড়ার আহ্বান জানিয়ে। ৩. নজরুল গীতিতে বৈশাখ বন্দনা: নজরুল তাঁর গানে বৈশাখকে বিভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন। নজরুল বৈশাখী ভোরকে ‘রুদ্রাণী জননী’ হিসেবে অভিহিত করে প্রকৃতি ও ঋতুর বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তুলেছেন। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে তিনি লিখেছেন, ‘নওরোজের এই উৎসবে, ওঠ জেগে আজ ওঠ সবে’। ৪. বৈশাখের প্রতীকী উপস্থিতি: নজরুল তাঁর কবিতায় বৈশাখকে ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ রূপে চিত্রায়িত করেছেন। তাঁর মতে, বৈশাখ কেবল দহন করে না বরং এটি মানুষের আত্মাকে জাগিয়ে তোলে এবং সমস্ত শিকল ভেঙে শাশ্বত অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় বৈশাখের কালবৈশাখী ঝড় হয়ে উঠেছে বিপ্লবের প্রতীক। নজরুলের কাছে বৈশাখ মানে স্থিতাবস্থার ভাঙন এবং নতুন এক পৃথিবী সৃষ্টির উন্মাদনা। নজরুল বৈশাখকে গ্রামীণ অভাবী মানুষের হাহাকারের সাথেও মিশিয়েছেন। তাঁর ‘ছায়ানট’ কাব্যের ‘বৈশাখ’ কবিতায় রৌদ্রদগ্ধ দুপুরের এক বিষন্ন কিন্তু শক্তিশালী চিত্র ফুটে ওঠে।
জসীমউদ্দীন বা পল্লীকবিদের কবিতায় বৈশাখ এসেছে গ্রামীণ জীবনের সাধারণ অনুষঙ্গ হিসেবে। গ্রামবাংলার মেলা, মেঠো বাঁশির সুর আর ধুলোমাখা মেঠোপথ তাঁর কবিতায় এক ভিন্ন স্বাদের বৈশাখ উপহার দেয়। বৈশাখী মেলা নিয়ে তাঁর পঙতিমালায় ফুটে ওঠে চিরন্তন বাংলার চিত্র-
‘রঙিন রঙিন মুখোশ পরে নাচে ছেলের দল,
বৈশাখী মেলায় ভিড় করেছে গ্রামবাসী চঞ্চল।’
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কবিদের কলমে বৈশাখ আরও বেশি লোকজ ও রাজনৈতিক তাৎপর্য পায়। জসীমউদ্দীন বৈশাখকে দেখেছেন গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের আনন্দ-বেদনার মিশেলে। অন্যদিকে, কবি ফররুখ আহমদ তাঁর ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যে বৈশাখকে দেখেছেন এক তপ্ত ও তৃষ্ণার্ত পৃথিবীর হাহাকার হিসেবে-
‘বৈশাখী মেঘে জাগে না তো আজো আশার রক্ত-লেখ,
উত্তপ্ত এই পিয়াসি ধূলায় জাগে না তো অভিষেক।’
বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে মৌলবাদবিরোধী এক সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের নাম। কবি শামসুর রাহমান বৈশাখকে নাগরিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর কাছে বৈশাখ মানে রমনার বটমূলের জমায়েত আর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন। তাঁর কবিতায় বৈশাখ বারবার ফিরে এসেছে স্বৈরশাসন ও অপশক্তির বিরুদ্ধে এক বজ্রনিনাদ হয়ে।
কবি আল মাহমুদের কবিতায় বৈশাখ এসেছে চিরন্তন বাংলার মাটির গন্ধে। তাঁর ‘সোনালী কাবিন’ এর আবহে বৈশাখী মেলা, নাগরদোলা আর লোকজ ঐতিহ্যের এক চমৎকার রসায়ন পাওয়া যায়। তিনি বৈশাখকে দেখেছেন উৎপাদনশীলতা ও উর্বরতার প্রতীক হিসেবে।
জননী সাহসিকা সুফিয়া কামালের কবিতায় বৈশাখ এসেছে এক ভিন্ন মাত্রায়। তিনি বৈশাখকে দেখেছেন নারীত্বের মমতা ও সাহসের মিশেলে। তাঁর ‘সাঁঝের মায়া’ বা পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলোতে বৈশাখের রুদ্র রূপের চেয়ে তার সৃজনশীল শক্তির জয়গান গীত হয়েছে। তিনি বৈশাখকে আবাহন করেছেন অশুভ শক্তির বিনাশী হিসেবে। তাঁর পঙক্তিতে ফুটে ওঠে বাংলার চিরন্তন রূপ-
‘এসো বৈশাখ, এসো হে ঋতুরাজ,
মুছে দাও যত কালিমা ও লাজ।’
সুফিয়া কামালের বৈশাখী কবিতা আমাদের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রেরণা জোগায়।
সত্তরের দশকের কালজয়ী কবি নির্মলেন্দু গুণ বৈশাখকে দেখেছেন রাজনীতির উত্তাল প্রেক্ষাপটে। তাঁর কবিতায় বৈশাখ কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ নয় বরং তা বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের সাথে যুক্ত। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘চাষাভুষার কাব্য’-এ তিনি বৈশাখকে মেহনতি মানুষের উৎসব হিসেবে চিত্রিত করেছেন। নির্মলেন্দু গুণের পঙক্তিতে বৈশাখ ধরা দেয় এভাবে-
‘বৈশাখ মানেই কালবৈশাখীর রণতূর্য,
বাংলার আকাশে নতুন এক সূর্য।’
তিনি বৈশাখকে নাগরিক জীবনের কোলাহল থেকে বের করে নিয়ে গেছেন সরাসরি মাটির কাছাকাছি।
আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বর আযাদ কামাল বৈশাখকে দেখেছেন শেকড় সন্ধানী দৃষ্টিতে। তাঁর কবিতায় বৈশাখ একাধারে প্রেম ও দ্রোহের সমীকরণ। সমকালীন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাঙালির পরিচয় সংকটের কালে আযাদ কামালের কবিতা আমাদের ঐতিহ্যমুখী হতে শেখায়। তাঁর কবিতায় বৈশাখের রুদ্রতা ও মেলা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তাঁর কবিতায় বৈশাখী ঝড়ের তান্ডব আর নতুনের আগমনের এক চমৎকার চিত্র ফুটে ওঠে- যা পাঠকদের জাতিগত ঐক্যের দিকে আহ্বান জানায়।
সব সময়ের কবিদের কাছে পহেলা বৈশাখ হয়ে উঠেছে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রেরণা। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধ- সবখানেই বৈশাখের তেজ বাঙালিকে শক্তি জুগিয়েছে। আধুনিক বিশ্বায়নের যুগেও বৈশাখ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় আমাদের শিকড়ের কথা, আমাদের নিজস্ব পরিচয়ের কথা। পহেলা বৈশাখের কবিতা আসলে বাঙালির বিবর্তনেরই দর্পণ। মধ্যযুগের কবিদের বর্ণনা থেকে আধুনিক কবিদের দ্রোহ- সবখানেই বৈশাখ এক অবিনাশী শক্তি। আজ যখন বিশ্বায়ন আর অপসংস্কৃতির ভিড়ে বাঙালির শেকড় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম, তখন এই কবিতাগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয়- আমরা সেই জাতি, যারা ঝড়ের রাতেও প্রদীপ জ্বালিয়ে নতুনের আবাহন গাইতে জানি। তাই পহেলা বৈশাখ কেবল একটি দিন নয়- এটি বাঙালির চিরন্তন লড়াই ও উৎসবের এক কাব্যিক মহাকাব্য।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।