স্টাফ রিপোর্টার ॥
দীর্ঘ ৩২ বছর আগে বিলপাড়া বাজারে ছোট্ট একটি মিষ্টির দোকান চালু করেন সুজন মিয়া। দেড় বছরে দোকানটিতে ব্যবসা তেমন জমাতে পারেননি। তাই চাকুরি নিয়ে চলে যান মালোয়শিয়া। ছেলের দোকানের হাল ধরেন বাবা নেওয়াজ আলী। তিনি খাঁটি ছানা দিয়ে সাদা চমচম তৈরি শুরু করেন। কয়েক বছরের মধ্যেই এই চমচমের সুনাম ছড়িয়ে পরে সারা জেলায়। এখন নেওয়াজ আলীর এই সাদা চমচমের জন্যেই বিলপাড়াকে একনামে চেনে সবাই। বিলপাড়া গ্রামটি টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার দক্ষিণ প্রান্তে। কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের এই গ্রামের পরেই মির্জাপুর উপজেলা শুরু। নেওয়াজ আলীর সাদা চমচমের জন্য প্রত্যন্ত এই গ্রামটিতে অনেক দুর থেকে মানুষ আসেন।
স্থানীয়রা জানায়, বিগত ১৯৯৪ সালে নওয়াজ আলীর ছেলে সুজন মিয়া বিলপাড়া বাজারে মিষ্টির দোকান চালু করেন। তখন গ্রামটিতে যাতায়াতের রাস্তা ছিলো কাঁচা। নদীতে সেতু ছিলো না। তাই উপজেলা সদরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ছিলো না। সারা দিনে চার-পাঁচ কেজি মিষ্টি বিক্রি হতো। ব্যবসায় সুবিধা করতে না পেরে সুজন চলে যান মালোয়শিয়া। তখন নেওয়াজ আলী দোকানটি পরিচালনায় হাত দেন। ওই এলাকায় প্রচুর দেশি গরুর দুধ পাওয়া যেত। সেই দুধ থেকে ছানা তৈরি করে সাদা চমচম তৈরি শুরু করেন নেওয়াজ আলী। এতে বিক্রি বাড়তে থাকে। এই চমচমের নাম ছড়াতে থাকে আশেপাশের এলাকায়। এখন শুধু টাঙ্গাইল জেলা নয়, আশেপাশের জেলাতেও বিলপাড়ার নেওয়াজ আলীর সাদা চমচমের সুনাম ছড়িয়ে পরেছে।
সরেজমিন বিলপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর ধারে ছোট্ট একটি বাজার। বাজরটি পূর্বদিকে বটগাছের তলায় নেওয়াজ আলীর দোকান। সেখানে বসেই ৭৩ বছর বসয়ী নেওয়াজ আলী বেচা-কেনা করছেন। একপাশে ছানা মাখাচ্ছেন একজন কর্মচারী। মাখানোর কাজ শেষ হলে ছানান পাত্র এনে রাখলেন নেওয়াজ আলীর সামনে। নেওয়াজ আলী ছানার উপর কিছু ময়দা ও এলাচের গুড়া ছিটিয়ে দিলেন। তারপর সেই ছানা থেকে চমচমের আকার তৈরি করলেন কারিগররা। পরে দোকানের পিছনে চুলায় চিনির শিরাতে সিদ্ধ করে সাদা চমচম তৈরি করা হলো।
নেওয়াজ আলী বলেন, খাঁটি দুধ দিয়ে ছানা তৈরি করা হয়। পরে চিনির শিরাতে সিদ্ধ করা হয়। অন্যান্য স্থানে মিষ্টিতে ময়দা ব্যবহার করা হয় বেশি। কিন্তু আমরা ময়দা কম ব্যবহার করি। পাঁচ কেজি ছানাতে একশত গ্রাম ময়দা দেই। তাই আমাদের মিষ্টি খুব সুস্বাধু হয়। তিনি আরো বলেন, ‘আল্লার রহমাত আছে, তাই আমাগো চমচমের এতো সুনাম।’
এই দোকানেই কথা হয় ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমানের সাথে। তিনি সাত কিলোমিটার দুরে মির্জাপুর উপজেলার পাকুল্লা থেকে এসেছেন সাদা চমচম কিনতে। মাহবুবুর রহমান জানান, তার নিজ এলাকাতেও অনেক মিষ্টির দোকান আছে। কিন্তু বিলপাড়ার সাদা মিষ্টির আলাদা স্বাদ। আত্মীয় বাড়ি যাবেন তাই এত দুরে এসেছেন সাদা চমচম কিনতে।
নেওয়াজ আলীর ছেলে সুজন মিয়া জানান, দোকানটি চালু করার দেড় বছর পরেই বিদেশ চলে যান। কয়েক বছর পর ফিরে এসে দেখেন তার বাবা সাদা চমচম তৈরি করে ব্যবসা জমিয়ে ফেলেছেন। পরে বিদেশ থেকে বিগত ২০০৬ সালে একেবারে চলে আসেন। বিদেশের চেয়ে অনেক বেশি আয় করা যায় এই সাদা চমচম তৈরি করে।
স্থানীয়রা জানান, বিলপাড়া থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দক্ষিণে মির্জাপুরের মহেড়া গ্রাম। সেখানে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার (পিটিসি) অবস্থান। সারা দেশ থেকে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা এখানে প্রশিক্ষণে আসেন। এছাড়া পুলিশের ওই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি একটি পর্যটন কেন্দ্র ও শুটিং স্পট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ট্রেনিং নিতে আসা পুলিশ এবং সেখানে ঘুরতে আসা পর্যটকদের অনেকেই ফেরার পথে বিলপাড়ায় যান। তারা বিলপাড়ার সাদা চমচম কিনে নিয়ে যান। আর এদের মাধ্যমে বিলপাড়ার সাদা চমচমের নাম ছড়িয়ে পরেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
এ বিষয়ে কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামীম আল মামুন বলেন, নেওয়াজ আলীর সাদা চমচম আমাদের এলাকার গর্ব। এই চমচমের কারণেই প্রত্যন্ত গ্রাম বিলপাগার নাম ছড়িয়েছে চারদিকে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) টাঙ্গাইল শাখার সভাপতি মুসলিম উদ্দিন বলেন, আগে চমচম বলতে টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ী গ্রামকে বুঝাতো। এখন নেওয়াজ আলীর সাদা চমচমের সুনাম পোড়াবাড়ীর চমচমের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।