মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল ॥
একবিংশ শতাব্দীর এই লগ্নে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় বিপ্লব আমাদের প্রাত্যহিক জীবনধারাকে আমূল বদলে দিয়েছে। এই বদলের অন্যতম সারথি হলো ‘মোবাইল জার্নালিজম’ বা সংক্ষেপে ‘মোজো’ (MOJO)। হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনটি এখন আর কেবল কথা বলার যন্ত্র নয় বরং এটি হয়ে উঠেছে আস্ত একটি প্রোডাকশন হাউস। পকেটে থাকা এই ক্ষুদ্র যন্ত্রটি দিয়ে সংবাদ সংগ্রহ, ভিডিও এডিটিং এবং তাৎক্ষণিক সম্প্রচারের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা সাংবাদিকতাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। মোজো সাংবাদিকতার এই জয়যাত্রার সমান্তরালে প্রকট হয়ে উঠেছে ‘ডিজিটাল হয়রানি’ ও অপসাংবাদিকতার কালো ছায়া। পেশাদারিত্বের অভাব এবং নীতিমালার তোয়াক্কা না করায় এই মোবাইল সাংবাদিকতাই বর্তমান সময়ে আমাদের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নৈতিক মূল্যবোধের সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মোবাইল সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর গতি এবং সহজলভ্যতা। প্রথাগত সাংবাদিকতায় যেখানে বড় ক্যামেরা, ওবি ভ্যান এবং বিশাল জনবলের প্রয়োজন হতো, সেখানে একজন মোজো সাংবাদিক একাই পুরো কাজটি সম্পন্ন করতে পারছেন। একজন নাগরিক বা সংবাদকর্মী এখন শুধু একটি স্মার্টফোন ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যেই ভিডিও ধারণ, সম্পাদনা ও সরাসরি সম্প্রচার করতে পারছেন। অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা কোনো জনদুর্ভোগের সংবাদ, দুর্নীতি কিংবা প্রান্তিক জনপদের অবহেলিত খবরগুলো অনেক ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনও আনছে। একে বলা হয় ‘সাংবাদিকতার গণতন্ত্রীকরণ’। কিন্তু এই সহজলভ্যতাই এখন গলার কাঁটা হয়ে বিঁধছে। বর্তমানে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও নৈতিক জ্ঞান ছাড়াই হাতে একটি স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের সংযোগ থাকলেই অনেকে নিজেকে ‘সাংবাদিক’ বলে দাবি করছেন। এখান থেকেই শুরু হচ্ছে ডিজিটাল হয়রানি।
ডিজিটাল হয়রানির চিত্রটি এখন বহুমাত্রিক। যখন সাংবাদিকতার এই অবারিত সুযোগকে অপব্যবহার করা হয় তখনই সমস্যা শুরু হয়। বর্তমানে ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকের ভিউ বাড়ানোর নেশায় এক শ্রেণির ‘তথাকথিত’ সাংবাদিক তৈরি হয়েছে, যাদের সাংবাদিকতার বুনিয়াদি শিক্ষা বা নৈতিকতা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ভিউ কিংবা ফলোয়ার বাড়ানোর নেশায় তথাকথিত মোজো সাংবাদিক মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। কারও অনুমতি ছাড়াই ভিডিও ধারণ করা, অপ্রাসঙ্গিক ও আক্রমণাত্মক প্রশ্ন করে কাউকে নাজেহাল করা কিংবা খণ্ডিত ভিডিও প্রচার করে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই ডিজিটাল হয়রানির মাত্রা ভয়াবহ। কোনো একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিলকে তাল বানিয়ে চটকদার শিরোনামে ভিডিও প্রকাশ করে সামাজিক মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফেসবুক ও ইউটিউব কেন্দ্রিক ‘ক্লিকবেইট’ সাংবাদিকতা সুস্থ ধারার গণমাধ্যমকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে মুহূর্তেই সাধারণ মানুষের সম্মান ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ প্রমাণিত হলেও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া সেই অপবাদের দাগ থেকে তিনি আর মুক্তি পান না।
আরেকটি আশঙ্কাজনক দিক হলো ‘বুলিং’ এবং অনলাইন হ্যারাসমেন্ট। কোনো একটি ঘটনার গভীরতা বিচার না করে কেবল উত্তেজনাকর শিরোনাম দিয়ে ভিডিও প্রকাশ করায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। দেখা যায়, মূলধারার গণমাধ্যম যে নৈতিকতা বা এথিকস মেনে সংবাদ প্রচার করে, মোজো সাংবাদিকতার নামে অপেশাদার ব্যক্তিরা তার তোয়াক্কাই করছেন না। প্রেস কাউন্সিলের নীতিমালা কিংবা ডিজিটাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা না থাকায় এরা তথ্য অধিকারের অপব্যবহার করছেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে কি মোবাইল সাংবাদিকতা অভিশাপ? উত্তরটি মোটেও তা নয়। প্রযুক্তির দোষ নেই, দোষ হলো প্রয়োগকারীর। মোবাইল সাংবাদিকতা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এবং আধুনিক সাংবাদিকতার এক অনিবার্য অংশ। বিবিসি, আল-জাজিরা কিংবা সিএনএন -এর মতো বিশ্বসেরা সংবাদমাধ্যমগুলো এখন মোজো সাংবাদিকতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সমস্যাটা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে নৈতিকতার অভাব এবং যথাযথ তদারকির ঘাটতি।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও সাইবার ক্রাইম ইউনিটের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হয়রানির হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ‘সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন’ (সিসিএ ফাউন্ডেশন)-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাইবার অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই কিশোরী ও নারী। এর মধ্যে একটি বড় অংশই হয়রানির শিকার হন ভিত্তিহীন ভিডিও বা অপতথ্যের মাধ্যমে- যা অনেক সময় ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত হয়।
বিটিআরসি-র তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে কয়েক কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সামনে যখন কোনো অর্ধসত্য বা অসত্য তথ্য ‘সাংবাদিকতা’র নামে পরিবেশন করা হয়, তখন তার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। কয়েক বছর আগে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে ঘিরে ছড়ানো ভুল তথ্যের জেরে তাকে গণপিটুনির শিকার হতে হয়েছিল- যা মোবাইল সাংবাদিকতার অপব্যবহারের এক চরম উদাহরণ। সাংবাদিকতার প্রধান শর্ত হলো তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং নিরপেক্ষতা। কিন্তু মোবাইল সাংবাদিকতার নামে এখন যা ঘটছে, তার অনেকটা জুড়েই থাকে হুজুগ। একটি ছোট ঘটনাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে ভিডিও করা এবং সেখানে ব্যাকগ্রাউন্ডে চড়া সুরের মিউজিক যোগ করে নাটকীয়তা তৈরি করা হচ্ছে। জনস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা বাণিজ্যিক লাভই এখানে মুখ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এতে মূলধারার সৎ সাংবাদিকতাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী? প্রথমত, মোজো সাংবাদিকতায় নিয়োজিতদের জন্য সঠিক প্রশিক্ষণ ও নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা। তাই ডিজিটাল স্পেসে কাজ করার জন্য নির্দিষ্ট কোড অব কনডাক্ট বা আচরণবিধি তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিটিআরসি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে অনলাইন পোর্টাল ও সোশ্যাল মিডিয়া পেজগুলোর নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কঠোর হতে হবে। লাইভের নামে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ডিজিটাল বা অনলাইন মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধগুলোর বিচার হয় সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ (পূর্বতন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ রহিত করে প্রণীত) এর অধীনে। মোবাইল সাংবাদিকতার নামে যারা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন বা হয়রানি করছেন, তাদের জন্য এই আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে- (ক) মানহানি ও মিথ্যা তথ্য (ধারা ২৫): কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা বা আক্রমণাত্মক তথ্য প্রচার করলে অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড বা ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। (খ) পরিচয় বা তথ্য চুরি (ধারা ২৬): অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির পরিচিতি তথ্য (যেমন- ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য) সংগ্রহ বা ব্যবহার করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। (গ) ডিজিটাল মানহানি (ধারা ২৯): কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে মানহানিকর তথ্য প্রকাশ করলে তিনি অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। উল্লেখ্য, নতুন আইনে মানহানির ক্ষেত্রে কারাদণ্ড সরিয়ে শুধু অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। (ঘ) ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা (দণ্ডবিধি ৫০৯ ধারা): সাইবার আইনের বাইরেও দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারা অনুযায়ী কোনো নারীর শ্লীলতাহানি বা গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্যে শব্দ বা অঙ্গভঙ্গি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
মোবাইল সাংবাদিকতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে একে শৃঙ্খলায় আনা জরুরি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রেস কাউন্সিলের নজরদারি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতেও বিস্তৃত করা দরকার। একই সাথে সাধারণ পাঠকদেরও সচেতন হতে হবে। কোনো ভিডিও বা খবর দেখলেই তা বিশ্বাস করে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্মার্টফোন হাতে থাকলেই কেউ সাংবাদিক হয়ে যায় না; সাংবাদিক হতে হলে নীতিবোধ ও দায়বদ্ধতা থাকা জরুরি। প্রযুক্তি আমাদের আশীর্বাদ দিয়েছে, কিন্তু তার অপব্যবহার অভিশাপ হয়ে দেখা দিচ্ছে। মোবাইল সাংবাদিকতা হোক শোষিতের কণ্ঠস্বর, তা যেন কারোর চরিত্র হনন বা মানসিক যন্ত্রণার কারণ না হয়। তথ্যের মুক্তি আর ডিজিটাল হয়রানিকে এক করে ফেললে সমাজ এক গভীর সংকটে পড়বে। তাই এখনই সময়, নীতিমালার কাঠামোর ভেতর মোবাইল সাংবাদিকতাকে সংজ্ঞায়িত করা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা নিশ্চিত করা। তবেই ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন স্বার্থক হবে।
পরিশেষে বলা যায়, মোবাইল সাংবাদিকতা হলো তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। একে যদি আমরা সুস্থ ও ইতিবাচক ধারায় পরিচালিত করতে পারি, তবে এটি সমাজ পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে কাজ করবে। আর যদি এই অগ্রযাত্রাকে ব্যক্তিগত স্বার্থে বা কাউকে হয়রানির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তবে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নটি ম্লান হয়ে যাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির উৎকর্ষ যেন মানুষের সম্মান ও সামাজিক শান্তিকে ছাপিয়ে না যায়। সত্যের সন্ধানে ক্ষুরধার লেখনী আর নৈতিকতার সমন্বয়েই গড়ে উঠুক আগামির সুস্থ ধারার সাংবাদিকতা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
নিজস্ব মন্তব্য প্রতিবেদন ।