মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল ॥
সময়ের পরিক্রমায় সমাজ বিবর্তিত হয়, কিন্তু সেই বিবর্তন যখন নেতিবাচক বাঁক নেয়, তখন তা জাতির জন্য অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়ায়। একটি জাতির প্রাণশক্তি হলো তার তরুণ প্রজন্ম। সেই তারুণ্য যখন সৃজনশীলতার পথ ছেড়ে ধ্বংসাত্মক ‘গ্যাং কালচার’-এর জালে জড়িয়ে পড়ে, তখন তা কেবল একটি সামাজিক সমস্যা থাকে না বরং জাতীয় অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে বাংলাদেশে ‘কিশোরগ্যাং’ শব্দটি একটি গভীর ক্ষত ও আতঙ্কের সমার্থক হয়ে উঠেছে। তুচ্ছ ঘটনা থেকে রক্তপাত, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং ইভটিজিংয়ের মতো ভয়াবহ অপরাধে কিশোরদের জড়িয়ে পড়া এখন প্রাত্যহিক খবরে পরিণত হয়েছে। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের করিডোর- সর্বত্রই এদের দাপট।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিশোর অপরাধের মাত্রা ও ধরণ উভয়ই আমূল বদলে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, বর্তমানে রাজধানী ঢাকাতেই অন্তত ৮০টির বেশি কিশোরগ্যাং সক্রিয় রয়েছে। পুলিশি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকা মহানগরীর আটটি বিভাগে অন্তত ৫২টি গ্যাং চিহ্নিত করা হয়েছে- যার মধ্যে মিরপুর বিভাগে সবচেয়ে বেশি (১৩টি গ্যাং এবং ১৭২ জন সদস্য) কিশোর অপরাধীর দৌরাত্ম্য বিদ্যমান। ২০২৩ সালে সারা দেশে পুলিশ রেকর্ডভুক্ত সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১,৩৮২ জন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের শুরুর দিকে র্যাব ও পুলিশি অভিযানে শত শত কিশোর আটক হলেও অপরাধের গতি থামেনি বরং তা নিত্যনতুন এলাকায় ডালপালা মেলছে। ঢাকা শিশু আদালতের গত ১৫ বছরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে কেবল কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বেই সংঘটিত হয়েছে প্রায় ২০০টি হত্যাকাণ্ড। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে সংকটটি এখন আর ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ নয় বরং গভীর এক কাঠামোগত সমস্যা।
কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার আঁতুড়ঘর বিশ্লেষণ করলে তিনটি ধারাকে আমরা আনতে পারি। যথা- ১. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার অন্যতম প্রাথমিক কেন্দ্র হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করিডোর ও খেলার মাঠ। বন্ধুত্বের আড়ালে গ্যাংস্টার হওয়ার পাঠ শুরু এখানেই। অনেক ক্ষেত্রে একই স্কুলের সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব বা ‘হিরোইজম’ জাহির করার মানসিকতা থেকে ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি হয়। পড়াশোনার চেয়ে ‘আধিপত্য বিস্তার’ যেখানে মূখ্য হয়ে দাঁড়ায়- সেখানেই জন্ম নেয় গ্যাং কালচার। পরিসংখ্যান বলছে, গ্যাং সদস্যদের একটি বিশাল অংশই স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী- যারা মূলত সহপাঠী বা বড় ভাইদের কুপ্রভাবে বিপথে ধাবিত হয়েছে। অনেক সময় কোচিং সেন্টারের আড্ডাতেও এসব গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ২. রাজনৈতিক ছত্রছায়া: কিশোর গ্যাং কালচার ফুলেফেঁপে ওঠার পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী জ্বালানি হলো অপরাজনীতি। স্থানীয় পর্যায়ের ‘বড় ভাই’ বা
রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের মিছিলে লোক বাড়ানো, প্রভাব বিস্তার এবং প্রতিপক্ষকে দমানোর হাতিয়ার হিসেবে কিশোরদের ব্যবহার করে। রাজনৈতিক ছত্রছায়া পাওয়ার কারণে এসব কিশোর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে বলে মনে করে। রাজনৈতিক এই মদদ কিশোর অপরাধীদের মনে ‘দায়মুক্তির’ ধারণা তৈরি করে- যা তাদের বেপরোয়া ও খুনি করে তুলছে।
৩. সামাজিক অবক্ষয় ও ডিজিটাল অন্ধকার: প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার ও নৈতিক শিক্ষার অভাব কিশোরদের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে। টিকটক, লাইকির মতো প্ল্যাটফর্মে ‘ভাইরাল’ হওয়ার নেশায় কিশোররা বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন ও উগ্র আচরণ করে। এছাড়া মাদকের সহজলভ্যতা এবং পাড়া-মহল্লায় খেলার মাঠের অভাব তাদের সৃজনশীলতা কেড়ে নিচ্ছে। পরিবারের সাথে দূরত্বের কারণে অনেক কিশোর নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে পাড়ার বখাটেদের সাথে মিশে গিয়ে অপরাধের জগতে পা রাখছে। বাংলাদেশে বর্তমানে কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনে বেশ কিছু সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং পারিপার্শ্বিক কারণ দায়ী বলে গন্য করা হয়। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- (ক) সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতা: মা-বাবার মধ্যে দ্বন্দ্ব, সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া বা অতিরিক্ত শাসন ও উদাসীনতা কিশোরদের বাইরে আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য করে। বাবা-মায়ের ব্যস্ততা বা উদাসীনতার কারণে কিশোররা একাকীত্বে ভোগে এবং বাইরের সঙ্গীদের প্রতি বেশি ঝুঁঁকে পড়ে। এছাড়া ঘরে অশান্তি থাকলে কিশোররা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং শান্তির খোঁজে বা ক্ষোভ মেটাতে গ্যাং কালচারে জড়িয়ে যায়। (খ) হিরোইজম বা বীরত্ব প্রদর্শনের ইচ্ছা: এই বয়সে কিশোরদের মধ্যে নিজেকে ‘বড়’ বা ‘ক্ষমতাশালী’ দেখানোর একটি প্রবণতা থাকে। গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করা বা অন্যদের ভয় দেখানোকে তারা বীরত্ব মনে করে। (গ) রাজনৈতিক অপব্যবহার: অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় ‘বড় ভাই’ বা রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার করেন। তাদের প্রশ্রয় এবং ক্ষমতার দাপট কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সাহসী করে তোলে।
(ঘ) আকাশ সংস্কৃতি ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব: বিভিন্ন মুভি বা ওয়েব সিরিজে গ্যাংস্টার লাইফস্টাইলকে গ্ল্যামারাইজড বা আকর্ষণীয়ভাবে দেখানো হয়। টিকটক বা লাইকির মতো প্ল্যাটফর্মে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার নেশাও তাদের গ্যাং গঠনে উৎসাহিত করে। (ঙ) মাদক, সুস্থ বিনোদনের অভাব ও অর্থলিপ্সা: মাঠের অভাব বা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ না থাকায় কিশোররা অলস সময় কাটায়। এই অবসরে তারা মাদকের সংস্পর্শে আসে এবং মাদকের টাকা জোগাড় করতে বা দ্রুত টাকা আয়ের নেশায় তারা ছোটখাটো অপরাধী চক্রে জড়িয়ে পড়ে। ছোট সেই চক্রটিই ছিনতাই বা গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। (চ) এলাকাভিত্তিক আধিপত্য- এলাকায় নিজেদের সিনিয়র প্রমাণ করা বা জুনিয়রদের ওপর দাপট দেখানোর মানসিকতা থেকেও ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি হয়- যা পরে বড় গ্যাংয়ে রূপ নেয়। মূলত পরিচয় সংকট এবং নিরাপত্তাহীনতা থেকে কিশোররা গ্যাং গড়ে তোলে। যখন তারা পরিবার বা সমাজ থেকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। তখন একটি দলের অংশ হয়ে তারা সেই গুরুত্ব বা ‘পাওয়ার’ পাওয়ার চেষ্টা করে।
এছাড়া আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি তাদের এই পথে টিকে থাকতে সাহায্য করছে। স্কুল-কলেজে বড় ভাইদের সালাম না দেওয়া বা ‘সম্মান’ না করা নিয়ে ছোটখাটো বিবাদ থেকে স্কুল বা পাড়ার বন্ধুরাই প্রথমে আড্ডা দিতে দিতে ছোট গ্রুপ তৈরি করে এবং সিনিয়রিটি-জুনিয়রিটি দ্বন্দ্ব শুরু হয়- পরে তা বড় গ্যাং- এ রূপান্তর হয়। ফেসবুক বা মেসেঞ্জার গ্রুপে চ্যাট করতে করতে তারা সংঘবদ্ধ হয় এবং পরে বাস্তবে মারামারি বা বিবাদে জড়ায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে আড্ডা দেওয়া তথাকথিত ‘বড় ভাই’রা জুনিয়রদের প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের দলে ভেড়ায়- এভাবেই কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠে।
কিশোর গ্যাংয়ের কারণে বর্তমানে সাধারণ মানুষের চলাফেরা দুরূহ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। ছিনতাই ও শ্লীলতাহানির মতো ঘটনাগুলো সরাসরি এই গ্যাং কালচারের সাথে যুক্ত। এই কিশোররা এক পর্যায়ে বড় মাপের অপরাধী সিন্ডিকেটে রূপান্তরিত হচ্ছে- যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। কেবল কঠোর আইন বা জেল দিয়ে কিশোর অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। সন্তানদের বন্ধুদের সম্পর্কে খোঁজ রাখা এবং তাদের সাথে গুণগত সময় কাটানো অভিভাবকদের প্রথম দায়িত্ব। পরিবারের সদস্যদের সাথে নৈতিক শিক্ষার চর্চাও বাড়াতে হবে। এজন্য প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ। যেমন- ১. প্রাতিষ্ঠানিক বা স্কুলভিত্তিক পদক্ষেপ- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে শুধুমাত্র পাঠদানের বাইরেও নজরদারি ও সচেতনতায় গুরুত্ব দিতে হবে। স্কুল ও কলেজের প্রবেশপথ, করিডোর এবং আশেপাশের আড্ডার জায়গাগুলোতে সিসিটিভি’র নজরদারি জোরদার করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পেশাদার কাউন্সেলর বা মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ দিতে হবে- যাতে কিশোরদের রাগ, হতাশা বা আচরণগত সমস্যাগুলো শুরুতেই সমাধান করা যায়। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং স্কাউটিংয়ের মতো কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত রাখতে হবে- এটি তাদের দলবদ্ধ হওয়ার শক্তিকে ইতিবাচক দিকে প্রবাহিত করবে। কোনো গ্যাং বা গ্রুপের বিশেষ চিহ্ন, লোগো বা পোশাক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিষিদ্ধ করতে হবে।
২. সরকারি ও আইনি পদক্ষেপ- সরকার বর্তমানে কিশোর অপরাধ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করেছে। বাংলাদেশ পুলিশ বর্তমানে এলাকাভিত্তিক ‘বিট পুলিশিং’ এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে কিশোর গ্যাং-এর ‘গডফাদার’ বা আশ্রয়দাতাদের চিহ্নিত করছে- এটির কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। অপরাধে জড়ানো কিশোরদের সাথে শিশুবান্ধব আচরণ করে তাদের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে প্রতিটি থানায় স্থাপনকৃত চাইল্ড হেল্প ডেস্কের কার্যক্রমের পরিধি বাড়াতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কারণ কিশোর গ্যাং কালচারের সাথে মাদক ওতপ্রোতভাবে জড়িত- এক্ষেত্রে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা- সন্তান কার সাথে মিশছে, অনলাইনে কী করছে এবং কার সাথে বাইরে আড্ডা দিচ্ছে তা নিয়মিত তদারকি করতে অভিভাবক ও পরিবারের সদস্যদের সর্বদা সদর্ক থাকতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতি মাসে অভিভাবক সমাবেশ করে সচেতনতা বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক মিছিল বা শো-ডাউনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহার না করার জন্য কঠোর নির্দেশনা জারি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কিশোররা একটি রাষ্ট্রের স্থপতি। তারা আমাদের জাতীয় সম্পদ- কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তি স্বার্থের হাতিয়ার নয়। তাদের অপরাধের আঁতুড়ঘরগুলো যদি আমরা এখনই চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে এক বুদ্ধিহীন ও অপরাধপ্রবণ প্রজন্মের ভার সইতে হবে। তাদেরকে সুস্থ ধারার শিক্ষায় দীক্ষিত করতে না পারলে আগামির বাংলাদেশ এক মেধাভীতি ও অস্থিরতার সম্মুখীন হবে। সময় এসেছে শিকড় থেকে এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার। আমাদের সন্তানদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতেই হবে। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার- সবাইকে এক হয়ে ‘কিশোর গ্যাং’ নামক এই আগুনের লেলিহান শিখা নেভাতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
নিজস্ব মন্তব্য প্রতিবেদন।