স্টাফ রিপোর্টার ॥
প্রচন্ড গরমের কারণে চলতি বোরো মৌসুমে ধান কাটতে শ্রমিক সংকটে পড়েছেন টাঙ্গাইলের কৃষকরা। দ্বিগুণ পারিশ্রমিক দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তারা। মাঠে পাকা ধান অথচ ধান কাটার ধুম নেই। মাথায় রোদ আর তাপের মধ্যেই তপ্ত ধানক্ষেতে বাধ্য হয়েই নামছেন কৃষকরা। টানা গরমের মধ্যেই বৃষ্টির আশংকা কৃষকের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গরমে ঠিকমতো কৃষি শ্রমিকও মিলছে না। যা পাওয়া যাচ্ছে তার দামও চড়া দিনে ১২০০ টাকা। এদিকে এই গরমে কৃষকের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো হিটস্ট্রোক হওয়া। তবে অবশ্যই মাথায় ছাতা বা মাথাল থাকলে আশঙ্কা কম হবে। আর একটু পরপর পানি খেতে হবে। আর চোখে মুখে পানি দিতে হবে।
টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার হাবলা ইউনিয়নের হাবলা উত্তরপাড়া গ্রামের প্রবীণ কৃষক মফিজ সরকার। বিলের মাঠে তার ধান পেকেছে। প্রচণ্ড গরম আর তাপ উপেক্ষা করেই ছেলেকে নিয়ে মাঠে নেমেছেন ধান কাটতে।সকাল থেকেই ধান কাটছেন তারা। কখনো মাঠের মধ্যে বসে পড়ছেন ক্লান্ত শরীর নিয়ে। পানি পান করে আবার নেমে পড়ছেন কাজে। তিনি বলেন, কৃষিশ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। তাই এই গরমে মাঠে ধান কাটতে নেমেছি। গরমে শরীরের ঘাম বের হয়ে আরও দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। বর্ষা এসে গেলে তো মাঠের ধান আর ঘরে তুলতে পারবো না। তাই সকাল থেকেই পরিবার মিলে কাজ করছি। অপর কৃষক রমজান সরকার বলেন, প্রচণ্ড গরমে মাঠে বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যাচ্ছে না। নিজের জমির ধান না কাটলে হচ্ছে না, তাই বুড়া-বুড়ি ধান কাটছি। উপায় নেই যত তাপই আসুক মাঠের ফসল তো ঘরে তুলতে হবে।
একটু দূরে পাকা ধানের ক্ষেতে ধান কাটছেন মনির হোসেন আর তনু মিয়া দুই ভাই আর তাদের কলেজ পড়ুয়া দুই ছেলে। ফজরের আজান দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা মাঠে নেমেছেন ধান কাটতে। সকাল ১০টা পর্যন্ত ধানকেটে মাঠে রেখে বিশ্রামে যাচ্ছেন। কলেজ পড়ুয়া ছেলে তলহা হোসেন বলেন, গরমে বমি বমি ভাব চলে আসছে, তবুও বাবা-কাকাকে সাহায্য করতে মাঠে নেমেছি ধানকাটতে। অন্যবার শ্রমিক দিয়ে ধান কাটালেও এ বছর শ্রমিকের অনেক দাম।
একই রকম অবস্থা অন্যান্য গ্রামসহ পুরো জেলায়। মাঠে পাকা ধান পড়ে আছে। কোথাও আবার অর্ধেক জমির ধানকেটে মাঠে ফেলে রাখা হয়েছে বিকেলে রোদ পড়ে গেলে তা আটি বেঁধে ওঠানো হবে। টানা গরম আর রোদ উপেক্ষা করে পাকা ধান কাটছেন কৃষক। গরমে আধাঘণ্টার বেশি রৌদ্রে কাজ করতে পারছেন না তারা। একটু বিশ্রাম নিয়ে ঘর্মাক্ত দেহে আবার মাঠে নামছেন। অন্যান্য সময়ের তুলনায় অর্ধেক কাজ করতে পারছেন। সুস্থতার কথা চিন্তা না করেই বৃষ্টির ভয়ে ধান কাটছেন।
বটগাছের নিচে বিশ্রামে কৃষক রমজান আলী। বাড়ি থেকে স্ত্রী দৌড়ে পানির জগ নিয়ে এলেন। ঢকঢক করে পানি পান করে গায়ের ঘাম মুছতে শুরু করলেন। ক্লান্ত কৃষকের কাজ তখনও শেষ হয়নি। তিনি বলেন, মাঠ থেকে ধানকেটে ঘোড়ার গাড়িতে উঠিয়ে আসলাম, মাঠের মধ্যে মাড়াই করবো। এরপর বিছালী বানতে হবে। যে গরম তাতে অনেক কৃষক হিটেই মারা যাবে এমন অবস্থায়। কয়দিন পরে যখন বৃষ্টি আর গরম একসঙ্গে হবে তখন শুনবেন কৃষকই মারা যাচ্ছে।
জেলার বিভিন্ন মাঠে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবারে কৃষি শ্রমিকের মূল্য দৈনিক ১২০০ টাকা। এই গরমে কৃষি শ্রমিকও ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না। কৃষি শ্রমিক ওবায়দুল্লাহ বলেন, মাঠে নেমে দৈনিক যে কাজ করার কথা তার ৫০ ভাগ করতে পারছি না। সকালের পরেও সন্ধ্যায় কাজ করে গৃহস্থকে পুষিয়ে দেয়া লাগছে।
টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে ৮০ ভাগ ধান কাটা হয়ে গেছে। প্রচণ্ড গরমে কৃষকের ধানকাটতে কষ্ট হচ্ছে এটা ঠিক। তবে এই রৌদ্রজ্জ্বল আবহাওয়া তাদের কাম্য। আমরা আশংকা করছি যেন ঝড়-বৃষ্টির আগেই ধানকাটা সম্পন্ন হয়। হারভেষ্টার মেশিন যেগুলো আছে তা দিয়ে ধান দ্রুত কাটার চেষ্টা করছে কৃষকরা। যেসব এলাকায় হারভেষ্টার মেশিন যেতে পারছে না, সেখানে কষ্ট করতে হচ্ছে কৃষকদের।