
স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার দিঘলকান্দি ইউনিয়নের বেংরোয়া উত্তরপাড়া এলাকায় জমি ও পুকুরের মালিকানা এবং মাটি উত্তোলনকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে সংঘাত, হামলা, ভাঙচুর এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী পক্ষ উপজেলা প্রশাসন ও থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছে। অন্যদিকে ভূমি অফিসও পৃথকভাবে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
অভিযোগকারী মজিবর রহমান খান (৬২) দাবি করেন বেংরোয়া মৌজার বি.আর.এস চূড়ান্ত খতিয়ানের ১৩ নম্বর দাগভুক্ত ৪৮ শতাংশ আয়তনের একটি পুকুরকে ঘিরেই মূল বিরোধের সূত্রপাত। তার ভাষ্য অনুযায়ী বিবাদীপক্ষ নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে ওই পুকুর থেকে এক্সকাভেটর বা ভেকু ব্যবহার করে মাটি উত্তোলনের উদ্যোগ নেয়। উত্তোলিত মাটি বাড়ি নির্মাণের কাজে ব্যবহার এবং বিক্রির উদ্দেশ্য ছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
মজিবর রহমান খান জানান, বিষয়টি প্রথমে স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও কোনো কার্যকর সমাধান না হওয়ায় তিনি বাধ্য হয়ে ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদন করেন। প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের পর থেকেই অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন শুরু করে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, আবেদন জমা দেওয়ার পর থেকে তাকে একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে গত (২২ মে)। অভিযোগ অনুযায়ী ওই দিন দুপুর প্রায় আড়াইটার দিকে অভিযুক্তরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার বাড়ির সামনে এসে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। একপর্যায়ে তারা হামলা চালায় এবং এতে তিনি আহত হন বলে অভিযোগ করেন। মজিবর রহমানের দাবি হামলার সময় তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধর করা হয়। শুধু তাই নয় তার কাছ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ির দরজা ও জানালাসহ বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালানো হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার পর অভিযুক্তরা তার কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করে এবং অর্থ না দিলে আরও ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেয়। অভিযোগে একটি গুরুতর দাবিও করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী হামলাকারীরা তার নাতিকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরিবারের সদস্যরা বাধা দিলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং অভিযুক্তরা প্রাণনাশের হুমকি দেয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন- শরিফুল ইসলাম খান (স্বপন খান), কুদ্দুস খান, রফিকুল ইসলাম মিন্টু, রিপন খান, হারান খান এবং হাফিজুর রহমান। এছাড়া আরও ১০ থেকে ১৫ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকেও অভিযোগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে একই পুকুর থেকে ড্রেজার বা এক্সকাভেটরের মাধ্যমে মাটি উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়ার পর উপজেলা ভূমি অফিস বিষয়টি তদন্ত করে।
ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, অভিযোগের প্রেক্ষিতে কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে সরেজমিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তদন্তে দেখা যায় সংশ্লিষ্ট দাগের জমিতে বসতবাড়ি এবং আবাদি জমি উভয়ই রয়েছে। যদিও তদন্তের সময় পর্যন্ত মাটি কাটার কার্যক্রম শুরু হয়নি। তবে এ ধরনের কাজের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টি তাদের নজরে আসে। তদন্ত প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে ওই এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে গভীরভাবে মাটি উত্তোলন করা হলে আশপাশের জমি ও বসতভিটার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে পুকুরের চারদিকে একাধিক পরিবারের বাড়িঘর থাকায় ভূমিধস বা মাটি ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে স্থানীয় মানুষের বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কোনো ধরনের মাটি উত্তোলন না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালানো হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও পৃথকভাবে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য পুকুর থেকে অতিরিক্ত বা গভীরভাবে মাটি কাটা হলে আশপাশের অন্তত ১০ থেকে ১২টি পরিবারের বসতভিটা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তারা মনে করেন, অপরিকল্পিতভাবে মাটি উত্তোলন করা হলে শুধু জমির ক্ষতি নয় বরং দীর্ঘমেয়াদে বসতবাড়ি ধসে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। স্থানীয়দের দাবি বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। এ কারণে তারা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের মতে, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এলাকার উত্তেজনা প্রশমিত হবে।
বর্তমানে ঘটনাটি নিয়ে বেংরোয়া উত্তরপাড়া এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। জমি ও পুকুরকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া এই বিরোধ স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এলাকাবাসী আশা করছেন, প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।






