স্টাফ রিপোর্টার ॥
মরু এলাকার সুমিষ্ট ফল খেজুর। তাল জাতীয় শাখাবিহীন খেজুর গাছ বাংলাদেশের আর্দ্র জলবায়ুতেও দেখা যায়। স্থানীয় প্রজাতির পাশাপাশি এখন আরবি খেজুরও আবাদ হচ্ছে। ইতিহাস বলে, বঙ্গে স্থানীয় প্রজাতির খেজুরের উৎপত্তি ও বিস্তার হাজার বছরের পুরোনো। খেজুর গাছ থেকে রস আহরণ ও গুড় তৈরি হয়। কিন্তু বুনো খেজুর, যার আকার-আয়তন, ফল দানের সক্ষমতা এবং জীবনচক্র একটু ভিন্ন-সেটি হারিয়ে যেতে বসেছে। এমন দুর্লভ বুনো খেজুরের সন্ধান মিলেছে টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলে।
দীর্ঘ ৪৫ হাজার একর বিশিষ্ট টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনের সিংহভাগ উজাড় হয়ে গেছে। তবুও জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জে এখনো কিছু ঘন বন রয়েছে। এ বনের লহুরিয়া বিটে সংরক্ষিত হরিণ প্রজননকেন্দ্র রয়েছে। হরিণের পাশাপাশি এখানে বেশ কিছু ময়ূর ছাড়া হয়েছে। দেখা মিলে প্রচুর বানর-হনুমানসহ নানা বন্য প্রাণী। চারদিকে বাউন্ডারি দেওয়াল থাকায় জায়গাটা বেশ সুরক্ষিত। বড় গাছপালার পাশাপাশি হাজারো গুল্মলতা ও উদ্ভিদের সমাহার রয়েছে। এখানেই দেখা মিলে বেশ কিছু বুনো খেজুর গাছের।
জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের ডেপুটি ফরেস্টার মোশারফ হোসেন জানান, বুনো খেজুর শালবনের দুর্লভ উদ্ভিদ। মধুপুর বনাঞ্চল ছাড়া আর কোথাও অস্তিত্ব রয়েছে বলে জানা নেই। জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের আওতাধীন লহুরিয়া বিটের হরিণ প্রজনন কেন্দ্রে শতাধিক বুনো খেজুর গাছ রয়েছে। এটি দেশের সবচেয়ে বড় বুনো খেজুর বাগান। বানর-হনুমান ফল খেয়ে এর বীজ ছিটানোয় প্রতি বছর নতুন করে গাছ গজাচ্ছে। মে ও জুন মাসে গাছে ছোট ছোট ফল ধরে। ফল পাখি ও বানর, হনুমানের প্রিয় খাবার। ফল পাকলে গাছতলায় পশুপাখির আনাগোনা বেড়ে যায়। বুনো খেজুর খুবই পুষ্টিকর বলে জানান তিনি।
কৃষিবিদ মৃত্যুঞ্জয় রায় এক গবেষণা প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, খেজুর গাছ অ্যারিকেসি পরিবারের ফিনিক্স মহাজাতিভুক্ত উদ্ভিদ। পৃথিবীতে ১৪ প্রজাতির খেজুর গাছ রয়েছে। বাংলায় রয়েছে পাঁচ প্রজাতির। এর মধ্যে বিপন্ন বুনো খেজুর অন্যতম। এটিকে খুদি খেজুর বা ভূখেজুর নামেও ডাকা হয়। এটি এক বীজপত্রী ও এক লিঙ্গ বিশিষ্ট বৃক্ষ। পুরুষ ও স্ত্রী গাছ আলাদা। স্ত্রী গাছে চিনাবাদামের দানার মতো ফল ধরে। শাখাহীন গাছ লম্বায় ২-৩ মিটার। গাছের বড় বৈশিষ্ট্য এর কাণ্ড থাকে মাটির নিচে। গোড়ায় তীক্ষণ শক্ত কাটা থাকে। প্রায় সাধারণ খেজুর গাছের মতো। যেমন এর গুড়ি নেই। তেমনি পাতা ধনুকের মতো বাকা নয়। এর পাতা উর্ধ্বমুখী এবং অগ্রভাগ সূঁচালো। নারিকেল সুপারি গাছের মতো এর মাথায় পত্রগুচ্ছ জন্মে চৈত্র-বৈশাখে ফুল ফোটে। জৈষ্ঠ-আষাঢ়ে ফল পাকে। কাঁদিতে থাকে অসংখ্য ফল। পাকলে হালকা লালচে হয়। মিষ্টি লাগে। এটি পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। তবে এর গাছ থেকে রস আহরণের সুযোগ নেই।
প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ক লেখক মোকার হোসেন বিপন্ন খুদি খেজুর প্রবন্ধে বুনো খেজুরকে বিপন্ন এবং অচেনা গাছ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, শাল বনে বিক্ষিপ্তভাবে বুনো খেজুর গাছ দেখা যায়। সংখ্যার বিচারে যা একবারেই নগণ্য। এটি কাণ্ডবিহীন বামনাকৃতির পামগাছ। ফল শিশু ও পাখিদের খুব প্রিয়। বাংলাদেশের শাল বন থেকে শুরু করে নেপাল, ভুটান ও ভারতের বিহার ও ছোট নাগপুর পর্যন্ত এক সময়ে বুনো খেজুরের বিস্তৃতি ছিল। তিনি প্রকৃতি ও পরিবেশের স্বাসে বুনো খেজুর গাছ সংরক্ষণ এবং শাল বনের যেসন স্থানে এখনো অস্তিত্ব রয়েছে সেসব এলাকায় বিশেষ নজরদারির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। বিগত ২০০১ সালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ গ্রন্থে বুনো খেজুরকে বিপর প্রজাতির উদ্ভিদ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।