নুর আলম, গোপালপুর ॥
টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ধোপাকান্দি ইউনিয়নে ঘটে গেল এক ব্যতিক্রমী ‘লঙ্কাকাণ্ড’। একজনকে দেয়া হয়েছে দাওয়াত। কিন্তু সেই দাওয়াতে হাজির প্রায় ১০০ জন অতিথি। তবে এতে বিরক্তি নয়, বরং আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন গৃহকর্তা। মুহুর্তেই তিনি বাড়িয়ে দেন আয়োজন। আর সৃষ্টি হয় বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
জানা যায়, গোপালপুর উপজেলার ধোপাকান্দি ইউনিয়নের সাজানপুর বাজারের দুই ব্যবসায়ী ও দীর্ঘদিনের বন্ধু আনিসুর রহমান ও মোহাম্মদ মনসের আলীর মধ্যে তিন দিন আগে কথা হয়। আনিসুর রহমান বন্ধুকে নিজের বাড়িতে আম-কাঁঠালের দাওয়াত দেন। কথা ছিল, মনসের আলী একাই যাবেন। কিন্তু দাওয়াতের দিন সবাইকে চমকে দিয়ে মনসের আলী একা যাননি। এলাকার ব্যবসায়ী, বন্ধু, সহপাঠী, ভাই-ভাতিজাসহ প্রায় ১০০ জনকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হন আনিসুর রহমানের বাড়ির উদ্দেশে। শুধু তাই নয়, তারা সঙ্গে নিয়ে যান এক ভ্যান আম, এক ভ্যান কাঁঠাল, এক ভ্যান দুধ, পান-সুপারিসহ নানা উপহার। আনিসুর রহমানের বাড়ি ধোপাকান্দি ইউনিয়নের গারালিয়াপাড়া এলাকায়। আর মনসের আলীর বাড়ি মিশ্রপট্টি গ্রামে।
এতো বড় বহর আসছে, এমন খবরটি আগে থেকেই পেয়ে যান আনিসুর রহমান। কিন্তু তিনি বিচলিত না হয়ে বরং আনন্দের সঙ্গে ১০০ জন অতিথির আপ্যায়নের জন্য নতুন করে খাবারের ব্যবস্থা করেন। পরে অতিথিদের আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করেন তিনি।
আনিসুর রহমান বলেন, আমি তো শুধু মনসেরকে দাওয়াত দিয়েছিলাম। কিন্তু সে ১০০ জন নিয়ে এসেছে। এতে আমি রাগ করিনি, বরং যতটা খুশি একজন এলে হতাম, তার চেয়ে অনেক বেশি খুশি হয়েছি। এতো মানুষের উপস্থিতিতে আমাদের বন্ধুত্বের বন্ধন আরও গভীর হয়েছে।
অপরদিকে মনসের আলী বলেন, এটা শুধু দাওয়াত নয়, আমাদের পুরোনো গ্রামীণ ঐতিহ্য। ছোটবেলায় দেখেছি বাব-দাদারা বন্ধুর বাড়িতে দল বেঁধে আম-কাঁঠালের দাওয়াতে যেতেন। আধুনিক সময়ে সেই ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মকে সেই ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বের শিক্ষা দিতেই আমি সবাইকে নিয়ে বন্ধুর বাড়িতে এসেছি। বন্ধুত্বের কোনো বয়স নেই, আর এই সম্পর্ক আজীবন অটুট রাখতে চাই।
স্থানীয়রা জানান, বর্তমান সময়ে যেখানে বিভিন্ন এলাকায় নানা কারণে দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগেই থাকে। সেখানে এমন মিলনমেলা ও বন্ধুত্বের এই নজির সত্যিই বিরল। তারা মনে করেন, এমন আয়োজন সমাজে সম্প্রীতি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দাওয়াতটি শেষ পর্যন্ত শুধু খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি পরিণত হয়েছে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ঐতিহ্য, সৌহার্দ্য এবং নিখাদ বন্ধুত্বের এক অনন্য উৎসবে। বর্তমানে এলাকাজুড়ে এই ব্যতিক্রমী ‘লঙ্কাকাণ্ড’ই আলোচনার প্রধান বিষয়।