আব্দুল লতিফ, ঘাটাইল ॥
শিক্ষার দীপ্ত আলোয় যিনি এক সুদীর্ঘকাল ধরে তিমির বিনাশী আলোক বর্তিকা হয়ে পথ দেখিয়েছেন। যাঁর প্রজ্ঞা, সততা, কর্মনিষ্ঠা আর সুদৃঢ় মাতৃসুলভ শাসনে গড়ে উঠেছে হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। তিনি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পাকুটিয়া পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক সফল ও বরেণ্য অধ্যক্ষ জীবুন নিছা। দীর্ঘ সময়ের এক গৌরবোজ্জ্বল কর্মময় জীবনের সফল সমাপ্তি ঘটিয়ে গত (১ জুন) তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাঁর এই বিদায় কেবলই দাপ্তরিক। একজন আদর্শ শিক্ষকের রেখে যাওয়া মূল্যবোধ, চিরন্তন শিক্ষা আর অম্লান স্মৃতি কখনো অবসর নেয় না। এই মহান শিক্ষাবিদের অবসরজনিত বিদায়কে কেন্দ্র করে গত সোমবার (২৩ জুন) বিকেলে কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি রূপ নিয়েছিল এক অশ্রুসিক্ত, আবেগঘন মহাকাব্যে যেখানে প্রতিটি ধূলিকণা যেন তাঁর বিদায়ের বেদনায় থমকে গিয়েছিল।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এইচ. এম. রইচের সভাপতিত্বে এবং সিনিয়র শিক্ষক কৃষ্ণারানীর অত্যন্ত নিপুণ সঞ্চালনায় আয়োজিত এই বিদায় বেলায় উপস্থিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সাবেক ছাত্রছাত্রী এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের চোখের জল আর হৃদয়ের আকুলতা প্রমাণ করেছেন যে, জীবুন নিছা কেবল একজন সুযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রধানই ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন প্রতিটি শিক্ষার্থীর হৃদয়ের আঙিনায় ভালোবাসার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত এক পরম স্নেহময়ী অভিভাবক। বিগত ২০১০ সালের (৩ অক্টোবর) যখন তিনি এই প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন তখন থেকেই তাঁর হৃদয়ে ছিল প্রতিষ্ঠানটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এক দৃঢ় প্রত্যয়।
সেই থেকে দিনরাত নিরলস শ্রম, মেধা আর বিচক্ষণ দূরদর্শিতার মাধ্যমে তিনি পাকুটিয়া পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজকে শিক্ষা, শৃঙ্খলা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াক্ষেত্রে সাফল্যের এক অনন্য শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন। শিক্ষকতা যে কেবল পাঠ্যপুস্তকের চার দেয়ালে বন্দি কোনো পেশা নয়। বরং তা যে একটি জীবনমুখী সাধনা ও মানবিকতার দীক্ষা। তা তিনি তাঁর কর্ম দিয়ে প্রতি পদে পদে প্রমাণ করেছেন। যার কারণে বিদায়ের এই ক্ষণে সিনিয়র শিক্ষক সুজিত কুমার দত্ত, সহকারী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলামসহ সকলের কণ্ঠেই ঝরে পড়েছে তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও শূন্যতার হাহাকার। কারণ তাঁর মতো এমন এক দক্ষ সংগঠক ও স্বপ্ন গড়ার কারিগরের শূন্যস্থান সহজে পূরণ হবার নয়।
শিক্ষক জীবুন নিছা তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শুধু সুশিক্ষায় শিক্ষিতই করেননি। বরং নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধের আলোয় উদ্ভাসিত করে তুলেছেন। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়িয়ে পুরো প্রতিষ্ঠানকে একটি সুসংগঠিত সুনিবিড় পরিবারে রূপান্তর করেছিলেন। তাঁর এই অতুলনীয় কর্মদক্ষতা, অনন্য নেতৃত্বগুণ এবং শিক্ষার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অসংখ্য সম্মাননা ও মর্যাদাপূর্ণ পদক, যা তাঁর যোগ্যতার এক জাজ্বল্যমান দলিল। তিনি বিগত ২০১৪ সালে লাভ করেন শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী শ্রেষ্ঠ নারী হিসেবে ‘জয়িতা’ পুরস্কার। বিগত ২০১৭ সালে লাভ করেন ‘নায়করাজ রাজ্জাক স্মৃতি পদক’ ও বিশেষ মানবাধিকার ফাউন্ডেশন কর্তৃক ‘মাদার তেরেসা গোল্ড মেডেল’। বিগত ২০১৯ সালে অর্জন করেন ‘মাদার তেরেসা সম্মাননা’, ‘পার্সোনালিটি অ্যাওয়ার্ড’ ও ‘বিজয় গোল্ড অ্যাওয়ার্ড’। ২০২০ সালে পুনরায় উপজেলা পর্যায়ে ‘শ্রেষ্ঠ জয়িতা’ এবং আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও ‘বেগম রোকেয়া দিবস’ সম্মাননা লাভ করেন। এখানেই তাঁর যোগ্যতার খতিয়ান শেষ নয়। বিগত ২০২১ সালে তিনি লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ ‘সার্ক পার্সোনালিটি অ্যাওয়ার্ড’। বিগত ২০২২ সালে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদকে উপজেলা পর্যায়ে ‘শ্রেষ্ঠ সভাপতি’ নির্বাচিত হন। অত্যন্ত গৌরবজনকভাবে বিগত ২০২৪ সালের জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে ঘাটাইল উপজেলার কলেজ পর্যায়ে ‘শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান’ হিসেবে ভূষিত হন।

পাশাপাশি শিক্ষা ও সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য ‘কাজী নজরুল ইসলাম গোল্ড অ্যাওয়ার্ড’, ‘ওয়ান্ডার ওম্যান অ্যাওয়ার্ড-২০২৪’ এবং ‘একুশে স্মৃতিপদক অ্যাওয়ার্ড’ তাঁর ঝুলিকে করেছে সমৃদ্ধ। আর সবশেষে তাঁর পরম ভালোবাসার পাকুটিয়া পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ তাঁকে দিয়েছে ‘বেস্ট প্রিন্সিপাল’ উপাধি ও বিশেষ সম্মাননা স্মারক। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও স্কাউটিং আন্দোলনে তাঁর অবদান ছিল আকাশচুম্বী। যেখানে তিনি গ্রুপ সভাপতি হিসেবে বেসিক কোর্স, এডভান্স কোর্স, স্কীল কোর্স এবং উড ব্যাজ অর্জনসহ রোভার স্কাউটের টাঙ্গাইল জেলা সহ-সভাপতি হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। সমাজ রূপান্তরের এই অগ্রযাত্রায় তিনি ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি ঘাটাইল উপজেলা শাখার নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি মুক্তাগাছা-১ ময়মনসিংহের মহিলা পরিচালক হিসেবে বিগত ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছর আলো ছড়িয়েছেন।
জাতীয় মহিলা সংস্থা ঘাটাইল উপজেলার চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘ ১২ বছর নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করেছেন। তথ্য আপা অফিস ঘাটাইল উপজেলা শাখার চেয়ারম্যান হিসেবে পর পর তিনবার। কাল্ব ঘাটাইল উপজেলা শাখার চেয়ারম্যান হিসেবে পর পর দুই মেয়াদে দীর্ঘ ৬ বছর অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে একজন সফল সমাজ সংস্কারক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিদায়ের এই ক্ষণে যখন শিক্ষার্থীরা প্রাঙ্গণজুড়ে অশ্রুসজল চোখে ফুল দিয়ে তাঁদের প্রিয় ম্যাডামকে বরণ করে নিচ্ছিল। সম্মাননা স্মারক তুলে দিচ্ছিল তখন পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে এক নীরব কান্নার রোল পড়ে যায়। যা প্রমাণ করে ছাত্রছাত্রীদের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ কতটা গভীর ছিল।
অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায়ী বক্তব্যে এই মহান গুণীজন আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, এই প্রতিষ্ঠানটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন এবং শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। যা তিনি আজীবন হৃদয়ে ধারণ করবেন। বিদায়ের ঘণ্টা বেজে উঠলেও এবং তিনি ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর আদর্শের যে সুদৃঢ় ভিত্তি তিনি স্থাপন করে গেছেন। তাঁর সেই মানবিক গুণাবলি, শৃঙ্খলাবোধ এবং অনুপ্রেরণা যুগের পর যুগ ধরে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শিক্ষার্থীর পথচলার পাথেয় এবং আলোর দিশারী হয়ে থাকবে। পাকুটিয়া পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ পরিবারের পক্ষ থেকে বিদায়ের এই অন্তিম মুহূর্তে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও চিরন্তন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে এই প্রার্থনা করা হয় যেন শিক্ষার এই মহীয়সী আলোকবর্তিকা শিক্ষাকা জীবুন নিছাকে সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, মানসিক পরম প্রশান্তি এবং একটি অত্যন্ত আনন্দময় ও কল্যাণময় অবসর জীবন দান করেন। তাঁর আগামী দিনগুলো যেন সুখ, শান্তি ও অনাবিল সাফল্যে ভরপুর থাকে।