স্টাফ রিপোর্টার ॥
শহরের ব্যস্ততা, সময়ের অভাব আর জীবনযাত্রার ধরণ বদলের সাথে সাথে মানুষের খাওয়া-দাওয়ার ধরণও পাল্টে গেছে। এক সময়ের হোটেল-রেস্তোরাঁর জায়গা এখন ধীরে ধীরে দখল নিচ্ছে ফুড কার্ট। শপিং মল, অফিস কমপ্লেক্স, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ সব জায়গাতেই ফুড কার্ট এখন জীবনযাপনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। এখন এর ব্যতিক্রম নয় টাঙ্গাইল শহরও।
টাঙ্গাইল পৌর শহরের জেলা সদর রোড, ৯০ বাড়ি রোড, থানাপাড়া ছয়আনি পুকুর পাড়, ক্যাপসুল মার্কেটের সামনেসহ কয়েকটি ব্যস্ত পয়েন্টেই এখন গড়ে উঠেছে বেশকয়েকটি ফুড কার্ট। তরুণ-তরুণী, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থীরা এখানে বিকেল-সন্ধ্যার পর সবার ভিড় লেগেই থাকে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই চিত্রটা কিছুটা বদলেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টাঙ্গাইল শহরে আগমন উপলক্ষে শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির অংশ হিসেবে সদর উপজেলা (ভূমি) অফিসের দক্ষিণ পাশে, ঢাকা রোড, রেজিস্ট্রি পাড়ার রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা বেশকয়েকটি ফুড কার্ট উচ্ছেদ করা হয়েছে। ফলে শহরের খাবার মানচিত্রে এখন নতুন ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে।
ফুড কার্ট এখন শুধু খাওয়ার জায়গা না, এটা আড্ডার জায়গাও হয়েছে। বন্ধুদের সাথে দেখা, পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়ে হালকা কিছু খাওয়া, প্রেমিক প্রেমিকার সময় কাটানোর মতো অন্যতম স্থান হয়ে উঠেছে। অস্থায়ী হলেও বসার ভাল ব্যবস্থা থাকায় তরুণ-তরুণীদের কাছে এটা একটা আড্ডার “থার্ড প্লেস” হয়ে উঠেছে। বাসা আর অফিসের বাইরে তৃতীয় ঠিকানা।
আধুনিক এই সময়ে মানুষের হাতে সময় কম। অফিসের এক ঘণ্টার লাঞ্চ ব্রেক, ক্লাসের ফাঁকে, কিংবা শপিংয়ের মাঝে বসে খাওয়ার জন্য ফুড কার্ট আদর্শ। ফাস্ট ফুড, চাইনিজ, দেশি খাবার, কফি সব পাওয়া যায়। অর্ডার দাও, বসো, খাও। রান্না, ওয়েটিং কোন ঝামেলা নেই। ছোট ছোট উদ্যোক্তাদের জন্যও ফুড কার্ট একটা সহজ প্ল্যাটফর্ম। আলাদা দোকান ভাড়া না নিয়ে একটা কিয়স্ক দিয়েই ব্যবসা শুরু করা যায়। আবার ভোক্তার জন্যও বাজেট-ফ্রেন্ডলি। ৮০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা পর্যন্ত খাবার মেলে। একা খেলে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় ভালো পেট ভরে যায়, যা আলাদা রেস্তোরাঁয় সম্ভব না।

টাঙ্গাইল শহরের ফুড কার্টগুলোতে এখন মোটামুটি সবই পাওয়া যায়। তরুণদের মূল আকর্ষণ বার্গার, পিজ্জা, ফ্রাইড চিকেন, নাগেটস, শর্মা, মম। সাথে আছে ফ্রাইড রাইস, চাউমিন, সিজুয়ান চিকেন, থাই স্যুপের মতো চাইনিজ-থাই আইটেম। হালকা খাওয়ার জন্য চটপটি, ফুচকা, ঝালমুড়ির স্টলও চোখে পড়ে। টাঙ্গাইল শহরের উল্লেখযোগ্য কার্টগুলো হচ্ছে- জেলা সদর রোডে Drip n dip, dumplings, আপ্যায়ন অন্যতম। এছাড়া ৯০ বাড়ি রোডে SAODA'S kitchen, সি ফুড কর্নার, হাংরি প্যালেস, জান্নাতি ফাষ্ট ফুড, ভিক্টোরিয়া রোডের ক্যাপসুল মার্কেটের সামনে হালাল ফুড কর্নারসহ সাতটি ফুড কার্ট রয়েছে। এছাড়া থানাপাড়া ছয়আনি পুকুর পাড়েও গড়ে উঠেছে অনেক ফুড কার্ট।
Drip n dip এর স্বত্বাধিকারী নাফিস আবির খান সাদাব জানান, আমি সাদ'ত কলেজে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ি। পড়ালেখার পাশাপাশি মায়ের অনুপ্রেরণায় এই পেশায় এসেছি। প্রায় ৬ মাস হলো এই পেশায় এসে বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছি। আমার চিকেন শর্মাটি সবচেয়ে বেশি চলে। এছাড়াও এখানে চিকেন বার্গার, হটডগ, চিকেন উইংস ভালোই চলে। ফাস্টফুড প্রেমিদের এখানে আমন্ত্রণ রইল।
এখানে কথা হয় পরিবার নিয়ে খেতে আসা ব্যবসায়ী নাইমুল হাসানের সাথে। তিনি জানান, Drip n dip এর শর্মা অনেক ভাল। তাই তিনি সুযোগ পেলেই পরিবার পরিজন নিয়ে এখানে খেতে আসেন। পাশের dumplings ফুড কার্টের স্বত্বাধিকারী সাদিকুর জানান, তিনি অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়েন। পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি চিকেন বারবিকিউ মম ও চিকেন স্টিম মম বিক্রি করেন। এতে করে যেমন তার পড়ালেখার খরচ নির্বাহ হয়। পাশাপাশি পরিবারের জন্য কিছু খরচ করতে পারেন। তার স্টিম মম সবচেয়ে বেশি চলে।
dumplings ফুড কার্টে মম খেতে আসা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সাদিয়া ও আনিছা জানান, তাঁরা প্রায় সময়ই এখানে মম খেতে আসেন। এখনকার মম’র মান বেশ ভালো ও টেষ্টি। টাঙ্গাইলে ফুড কার্ট সংস্কৃতি দেশের অন্যান্য জেলার মতো সেভাবে এখনও গড়ে উঠেনি। ফুটপাত ছাড়া শহরের বিভিন্ন জায়গায় এসব ফুড কার্ট আরও হলে ব্যস্ত শহরবাসীর জন্য অনেকটাই সাহায্য হবে। পৌর প্রশাসকের এই বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া উচিত।
সব সুবিধার সাথে কিছু সমস্যাও আসে। পুষ্টিবিদের মতে, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার আর অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস মানুষের মাঝে রোগব্যাধি বাড়াচ্ছে। ফাস্টফুডের আধিক্য মুটিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ফুড কার্টের কারণে প্লাস্টিক বর্জ্য বাড়ছে, যা পরিবেশের জন্যও চ্যালেঞ্জিংও বটে। ফুড কার্ট আধুনিক জীবনের গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলা একটা কালচার। এটা শুধু খাবার বিক্রির জায়গা না, এটা সময়, সমাজ আর শহরের ছন্দের প্রতিফলন। স্বাস্থ্যকর খাদ্য বাড়ানো আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে ফুড কার্টের ভূমিকা শহরের জন্য আরও ইতিবাচক হবে। টাঙ্গাইল শহর যত আধুনিক হবে, ফুড কার্টের ছবিটাও ততই বদলাতে থাকবে।