স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়সহ সমতল এলাকায় বসবাসরত গারো সম্প্রদায়ের আদি ঐতিহ্য ‘সেরেজিং’ পালাগান হারিয়ে যেতে বসেছে। একসময় গারোদের নানা পার্বণে বাদ্যযন্ত্রের সুর আর তালের মূর্ছনায় সেরেজিংয়ের আসর বসলেও এখন তা বিলুপ্তির পথে। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, আধুনিক জীবনধারা এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পী ও সংগঠকের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এই লোকসংগীত।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ে বসবাসরত মান্দি বা গারো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে। তাদের ‘সাংসারেক’ (আদি ধর্ম) ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো সেরেজিং। বিয়ে, পূজা ও নবান্ন উৎসব ‘ওয়ানগালা’সহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে একসময় এই পালাগান পরিবেশন করা হতো। এর মাধ্যমে প্রকৃতি, প্রেম, বিরহ ও গারো সংস্কৃতির নানা দিক ফুটে উঠত।
নেত্রকোনার বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমির গবেষক লাকী আরেং জানান, সেরেজিং শুধু লোকসংগীত নয়, এটি গারোদের জীবনদর্শন ও ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। তবে কালের পরিক্রমায় খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়া, শহরমুখী প্রবণতা এবং পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এখন এ গান আর আগের মতো শোনা যায় না। বর্তমানে পুরো অঞ্চলে মাত্র দুই-তিনটি দল এই গান টিকিয়ে রেখেছে।
মধুপুরের চুনিয়া গ্রামের বাসিন্দারা আক্ষেপ করে বলেন, একসময় রাতভর সেরেজিংয়ের আসর চলত। এখন সেই জৌলুস আর নেই। কুড়াগাছা ইউনিয়নের নয়নপুর গ্রামের শিল্পী বিচিত্রা ম্রং বলেন, আগে গ্রামে অনেক শিল্পী ছিলেন। এখন নতুন কোনো গায়ক তৈরি হচ্ছে না। নিজেদের লেখা গানও হারিয়ে যাচ্ছে। সরকারি সহায়তা না পেলে আমাদের এই নিজস্ব সংস্কৃতি চিরতরে হারিয়ে যাবে।
বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমির পরিচালক ও কবি পরাগ রিছিল বলেন, সেরেজিং গারো সংস্কৃতির এক অনন্য সম্পদ। ঐতিহ্যটি টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে হবে। এই গান সংরক্ষণ করা গেলে আমাদের লোকজ ভান্ডার আরও সমৃদ্ধ হবে।