স্টাফ রিপোর্টার ॥
কাগজে-কলমে মূল্যস্ফীতি কমার পরিসংখ্যান থাকলেও দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে মিলছে না কোনো স্বস্তির খবর। কাঁচামরিচ ও ডিমের পর এবার নতুন করে বেড়েছে প্যাকেটজাত আটা ও চিনির দাম। পাশাপাশি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে চড়া রয়েছে পোল্ট্রি ও মাছের বাজার। ফলে আয়ের সাথে ব্যয়ের সঙ্গতি মেলাতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ও নিম্ন-আয়ের ক্রেতারা। টাঙ্গাইল শহরের বিভিন্ন বাজারে হুট করেই প্যাকেটজাত আটার দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, কোম্পানি পর্যায় থেকেই দাম বাড়িয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে। একই চিত্র চিনির বাজারেও। প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী মসুর ডালের দরও।
এদিকে সীমিত আয়ের মানুষের প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস ডিমের বাজারও চড়া। প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা দরে। দোকানিদের মতে, লোকসানের মুখে অনেক ছোট খামারি ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ায় বাজারে ডিমের জোগানে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে সাপ্তাহিক ছুটির আঁচ লেগেছে ব্রয়লার মুরগির বাজারেও। প্রতি কেজি ব্রয়লার বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়। ফিডের উচ্চমূল্য না কমলে লেয়ার কিংবা দেশি মুরগির দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। বাজারে মাছের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও বাড়তি পরিবহন খরচের অজুহাতে প্রায় সব ধরনের মাছে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আর চড়া দামের কারণে ইলিশ কেনা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য অনেকটাই নাগালের বাইরে চলে গেছে। বাজারের এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের দাবি, শুধু পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ না থেকে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন পর্যায় থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত পুরো সাপ্লাই চেইনে নিয়মিত ও কঠোর তদারকি জোরদার করা হোক।
শনিবার (২২ আগস্ট) সকালে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শহরের পার্ক বাজারে কেনাকাটা করতে আসেন সরকারি কর্মচারী রিপন মিয়া। তিনি ৭০ টাকায় একটি ছোট আকারের লাউ কেনেন। এছাড়া সোনালি মুরগি ৩৮০ টাকা এবং লেয়ার মুরগি ৩৪০ টাকা কেজি দরে কেনেন। এ সময় তিনি বলেন, সব জিনিসের দামই তো বাড়তির দিকে। মনে হচ্ছে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। বাজারে মুরগির দাম আরো ৬০-৭০ টাকা বেশি। সবজি কেজিতে ২০-৩০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি হয়। বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আলু ও ঢ্যাঁড়শ ছাড়া বর্তমানে বেশিরভাগ সবজিই বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকার বেশি দামে। কাকরোল ১০০ থেকে ১৩০ টাকা, করলা ৮০ থেকে ১০০, বেগুন ৮০ থেকে ১০০, শজিনা ১২০ থেকে ১৪০, পটোল ৭০ থেকে ৮০, শিম ৮০, ঢ্যাঁড়শ ৪০-৫০, টমেটো ৪৫-৫০, গাজর ৪০-৫০, মিষ্টিকুমড়া ৪০-৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। তবে আলুর দাম কিছুটা কমে ১৮-২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শাকের দাম প্রতি আঁটি ২০ থেকে ৪০ টাকা। লাউ বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকায়। এভাবে সব ধরনের সবজি এখন বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে। তবে বাজারগুলো ছাড়াও পাড়া-মহল্লার দোকানেও বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে।
মাসখানেক আগে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হওয়া সোনালি মুরগি মানভেদে ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। হাইব্রিড সোনালি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৪০ টাকায়। ২৮০ টাকার লেয়ার মুরগি বিক্রি হয় ৩৪০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগি বাড়তি দামেই ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। গরুর ও খাসির গোশতের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। বাজারের ব্রয়লার হাউসের সেলিম বলেন, সরবরাহ কম হওয়ায় সোনালি মুরগির দাম বেড়েছে। তবে গত সপ্তাহের তুলনায় ২০-৩০ টাকা কমলেও কিছুদিন আগের তুলনায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। দাম আরো বাড়তে পারে। এদিকে, সবজির পাশাপাশি মাছ ও ডিমের দামও বেড়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে ডিমের ডজনে বেড়েছে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত। মুরগির ডিমের ডজন বিক্রি হয় ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়। তবে পাড়া-মহল্লার দোকানে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা ডজন বিক্রি হতে দেখা গেছে।
মাছ বিক্রেতা সামিউল বলেন, কয়েক দিনের ব্যবধানে সব ধরনের মাছ কেজিতে ৪০-৫০ টাকা বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা এখনো কাটেনি। বোতলজাত সয়াবিন তেল গায়ের দামেই বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটার প্রতি ১০ টাকা বেড়ে ১৯৫ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই ভাবে খোলা পাম তেলের দামও লিটার প্রতি প্রায় ১০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকা। রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী বাচ্চু মিয়া বলেন, নতুন চাল বাজারে আসায় চালের দাম না বাড়লেও ৩০০ বস্তা চালে চার হাজার টাকা পর্যন্ত ট্রাক ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। রাইস এজেন্সির রাসেল মিয়া বলেন, আমাদের চাল আসে নওগাঁ থেকে। ট্রাক প্রতি ভাড়া বেড়েছে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা। যদিও এখনো চালের দাম বাড়েনি, কিছুদিন পর প্রভাব পড়বে।
সিদ্ধ চালের দাম স্থিতিশীল থাকলেও পোলাও চালের দাম বেড়েছে। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্যাকেটজাত পোলাও চালের কেজিতে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে এখন ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা পোলাও চালও কেজিতে পাঁচ থেকে ১০ টাকা বেড়ে ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে খোলা চিনি ১০০ থেকে ১০৫ টাকা আর প্যাকেট চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। নিত্যপণ্যের পাশাপাশি রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের দামও বেড়েছে। সরকার দুদফায় প্রায় ৬০০ টাকার মতো বাড়িয়ে এক হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারিণ করলেও কোথাও এ দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।