
স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক পিকআপ ভর্তি মেয়াদোত্তীর্ণ সরকারি ওষুধ যমুনা নদীতে ফেলার সময় চালককে হাতেনাতে আটক করে স্থানীয়রা। এই ভয়াবহ দূনীতি ও কেলেঙ্কারির ঘটনা ধামাচাপা দিতে ও মূল অপরাধীদের বাঁচাতে পিকআপ চালক আজমতের বিরুদ্ধে চুরির মামলা দেওয়া হয়েছে।
ভূঞাপুর উপজেলায় যমুনা নদীতে ফেলে দেওয়ার সময় ১৮ বস্তা মেয়াদোত্তীর্ণ সরকারি ওষুধ জব্দ করেছে পুলিশ। বুধবার (২৬ আগস্ট) মধ্যরাতে ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী ইউনিয়নের টি-রোড সংলগ্ন কালা সড়ক এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটেছে। স্থানীয়রা ওষুধগুলো বহনকারী একটি পিকআপ আটক করে এর চালক আজমতকে ধরে রাখেন। এ সময় গাড়িতে থাকা অন্যরা পালিয়ে যান। পরে পুলিশ পিকআপভ্যান ও ওষুধগুলো জব্দ করে ভূঞাপুর থানায় নিয়ে যায়।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দিবাগত রাতে ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু নয়িম মোহাম্মদ সোহেল বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। এ ঘটনায় ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টোরকিপারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালের মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. আলমগীর হোসেনকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে মূল অপরাধীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে পিকআপ চালক আজমতের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছে পরিবহন শ্রমিকরা। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বেলা ১১ টার দিকে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ঘাটাইল উপজেলা খাদ্য গুদামের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে তারা। ঘন্টাব্যাপী বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ শেষে মিছিল সহকারে উপজেলা হাসপাতালে মিলিত হয় শ্রমিকরা। এ সময় তারা পিকআপ চালকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তি দাবি করেন।
বাস মালিক সমিতির ঘাটাইল উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন মুকুল বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের লোকজন পিকআপটি ভাড়া নিয়েছে। হাসপাতালের কিছু অসাধু লোক সরকারি ওষুধ জনসাধারণকে না দিয়ে মজুদ রেখে মেয়াদোত্তীর্ণ করেছে। পরে সে ওষুধ তারা যমুনা নদীতে ফেলে দেয়ার পরিকল্পনা করেছিলো। এখানে চালকের কোন দোষ নেই। চালক কেন জেলে থাকবে, জেলে থাকবে মূল অভিযুক্তরা। চালকের মুক্তি দাবি করেন তিনি।

এদিকে ওষুধ কেলেঙ্কারিতে জড়িত প্রধান অভিযুক্তরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক তোলপাড় চলছে। ঘাটাইল উপজেলার বাসিন্দা রায়হান খান বলেন, আইন হচ্ছে মাকড়সার জালের মতো, যেখানে দুর্বল ও গরিবরা আটকে যায়। আর ধনী ও শক্তিশালীরা তার ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়। রুবেল বলেন, ড্রাইভার একজন শ্রমিক মাত্র। তিনি পেটের দায়ে গাড়ি চালান। তাকে কেন এই মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। বড় বড় রাঘব বোয়াল রেখে চুনোপুঁটিকে দায় দিয়ে এই ঘটনা দামাচাপা দেয়া যাবে না। সকল মেহনতি মানুষকে, প্রতিবাদী জনতাকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অসাধু কর্মকর্তা হাসপাতালের যারা তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। তাহসান হাফিজ বলেন, ড্রাইভারকে ফ্রন্ট লাইনে এনে আসল চোরদের বাঁচানোর চেষ্টা চলছে।
গত বুধবার (২৬ আগস্ট) দিবাগত মধ্য রাতে ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভাড়া করা একটি পিকআপ ভর্তি সরকারী ওষুধ ভূঞাপুর উপজেলায় নিয়ে যমুনা নদীতে ফেলার সময় জনতার হাতে আটক হয়। পরে চালককে আটক করে পিকআপসহ ওষুধ থানায় নিয়ে আসে পুলিশ।
এ বিষয়ে গোপালপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফৌজিয়া হাবিব খান বলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। আসামীকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম রেজাউল করিম জানান, জিজ্ঞাসাবাদে চালক পুলিশকে জানিয়েছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধগুলো ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে যমুনা নদীতে ফেলে দেওয়ার জন্য নেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জনকে জানানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু নাঈম মোহাম্মদ সোহেল জানান, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ একটি কমিটির তত্ত্বাবধানে প্রকাশ্যে ধ্বংস করার কথা ছিল। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টোরকিপার মীর সেলিম নিয়ম না মেনে ওষুধগুলো নদীতে ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ডা. আবু নাঈম মোহাম্মদ সোহেল আরও জানান, স্টোরকিপারকে ইতোমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালের মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. আলমগীর হোসেনকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে কীভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধগুলো বের করা হলো এবং কেন সেগুলো নদীতে ফেলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।





