স্টাফ রিপোর্টার ॥
দশ বছর আগের এক সড়ক দুর্ঘটনা ওলট পালট করে দিয়েছিল চাঁন মিয়ার সাজানো জীবন। ট্রাক্টর দুর্ঘটনায় ডান পা হারিয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এরপরেও দমে যাননি তিনি। এক পা হারিয়েও অন্যের কাছে হাত না পেতে বেছে নিয়েছেন পরিশ্রমের পথ। এখন টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলা হাটে বাঁশের তৈরি তৈজসপত্র বিক্রি করেই চলছে তার তিনজনের অভাবের সংসার। ধনবাড়ী উপজেলার ধোপাখালী ইউনিয়নের ভাইঘাট স্যান্ডালপুর এলাকার বাসিন্দা চাঁন মিয়া। সপ্তাহে প্রতি সোমবার ধনবাড়ী বাজারে বাঁশের পসরা সাজিয়ে বসেন তিনি। গ্রামগঞ্জের বাড়ি বাড়ি থেকে ডুলি, কুলা, চালুনি, খাঁচা ও ঝাড়ু সংগ্রহ করে হাটে বিক্রি করেন।
চাঁন মিয়া জানান, প্রতি হাটে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করে তার লাভ থাকে এক হাজার থেকে ১৫শ টাকা। এই সামান্য আয়েই স্ত্রী ও এক কন্যা সন্তানকে নিয়ে কোনোমতে দিন কাটে তার। পা হারানোর পর এই ব্যবসাই আমার একমাত্র ভরসা। আগে বেচাকেনা ভালো থাকলেও এখন প্লাস্টিকের পণ্যের কারণে মানুষ আর বাঁশের জিনিস তেমন কেনে না। সরকারি একটু সহায়তা পাইলে হয়তো পরিবার নিয়া একটু ভালোভাবে চলতে পারতাম।
শুধু চাঁন মিয়া নন, ধনবাড়ী এলাকার অর্ধশতাধিক পরিবার এখনো এই বাঁশ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তবে প্লাস্টিকের সহজ লভ্যতা আর বাঁশের দাম বেড়ে যাওয়ায় চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন এই কারিগররা। হাটে ধানের ডুলি কিনতে আসা আজাহার আলী বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই বাঁশের ডুলি বা কুলা ব্যবহার করে আসছি। কিন্তু এখন বাজারে গেলেই প্লাস্টিক দেখা যায়। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের এই দেশি ঐতিহ্য একদিন জাদুঘরে চলে যাবে।
পণ্যের বাজার দর যাচাই করে দেখা যায়, মাটি কাটার ডালি ৭০ থেকে ৯০ টাকা, কুলা ৮০ থেকে ১৫০ টাকা এবং মাছ ধরার পলো ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বিক্রেতা আকবর হোসেন জানান, এক সময় তিনি প্রচুর পণ্য কিনতেন, কিন্তু এখন লাভের অংক কমে যাওয়ায় দিন যাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। কারিগর হযরত আলী আক্ষেপ করে বলেন, এক সময় গ্রামজুড়ে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাঁশের খুটখাট শব্দ শোনা যেত। নারী-পুরুষ সবাই মিলে কাজ করতেন। এখন সেই ব্যস্ততা নেই। অনেকেই অভাবের তাড়নায় এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন।
ধনবাড়ী হাটের ইজারাদার রশিদ জানান, আগে হাটে ২০-৩০টি বাঁশের পণ্যের দোকান বসত, এখন তা কমে ৬-৭টিতে দাঁড়িয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ অংশকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও ঋণ সহায়তা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চাঁন মিয়ার মতো লড়াকু মানুষেরা এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে তাদের এই লড়াই কতদিন স্থায়ী হবে–তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।