
এরশাদ মিঞা, মির্জাপুর ॥
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে নতুন কহেলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা দাবিদার নাসির উদ্দিন বাবলু ও অধ্যক্ষ ঈমাম হোসেন মো. ফারুকের মধ্যে বিরোধের কারণে দিনকে দিন সুনাম হারাচ্ছে কলেজটি। সেই সাথে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রতি বছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং ফলাফলেও অবনতি হচ্ছে। তাদের পরস্পর বিরোধী অভিযোগের কারনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থা।
এছাড়া বিগত ২০০৪ সালের মে মাস হতে বিগত ২০১০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত উত্তোলিত সমুদয় অর্থ ৫ লাখ ২৫ টাকা ৬৮ পয়সা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ঈমান হোসেন মো. ফারুককে সরকারি কোষাগারে জমা প্রদানের জন্য কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পিআইডব্লিউ) (যুগ্ম সচিব) ফরিদা ইয়াসমিন গত বছরের (১৩ জুলাই) এক পত্রের মাধ্যমে নির্দেশনা দেন।
অন্যদিকে ময়মনসিংহ অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক চলতি বছরের গত (৩১ মার্চ) স্মারক নং- ৩৭.০২.০০০০.০০০.১২৫.০৮.০০০২.২৬-৫১৯ এক পত্রের মাধ্যমে বিগত ২০১৭ সালের (১৯ ডিসেম্বর) হতে চলতি বছরের (৩১ জানুয়ারি) পর্যন্ত (বেতন ভাতাদিও এমপিও অংশ) সরকারি কোষাগারে ফেরতের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করেছেন। ঈমাম হোসেন মো. ফারুক পত্র পাওয়ার পরও সমুদয় টাকা ফেরত দেননি। উল্টো তার বেতন চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, শিক্ষা অধিদপ্তরের উচ্চমান সহকারী (সম্প্রতি বদলী হওয়া ভোলার লালমোহন সরকারি কলেজের প্রধান সহকারী) নাসির উদ্দিন বাবলুর সহায়তায় তার শশুর বাড়ি মির্জাপুর উপজেলার ওয়ার্শী ইউনিয়নের নতুন কহেলা গ্রামে বিগত ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠা হয় সাধারণ ও কারিগরি শাখার নতুন কহেলা কলেজ। বিগত ২০০৯ সাল থেকে কলেজটিতে কৃষি ডিপ্লোমাও চালু করা হয়েছে। বিগত ২০০৩ সাল থেকে কলেজটিতে পাঠ দান শুরু হয়। উপজেলার নিভৃত পল্লী এলাকায় প্রতিষ্ঠিত কলেজটিতে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে কলেজের দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হয়।
বিগত ২০০৩ সালের (২৭ জুন) রেজুলেশনে সাধারণ শাখায় মাগুড়া জেলার বাসিন্দা ঈমাম হোসেন মো. ফারুক অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পান। একই সালের (২২ সেপ্টেম্বর) রেজুলেশনে বিএম কারিগরি শাখায় অধ্যক্ষ হিসেবে আবার নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বিএম কারিগরি শাখায় নিয়োগ লাভের কোন রেকর্ড কলেজে রক্ষিত নাই। একই কলেজে দুই শাখায় অধ্যক্ষের নিয়োগের বিষয়টি জানাজানি হলে কলেজে রক্ষিত সকল কাগজপত্র সরিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে কলেজের অধ্যক্ষ ঈমাম হোসেন মো. ফারুকের বিরুদ্ধে।
বিগত ২০০৪ সালে কলেজের কারিগরি শাখা এবং বিগত ২০১৭ সালে সাধারণ শাখা এমপিওভুক্ত হলে প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে কলেজে শ্রম দেওয়া শিক্ষকদের কষ্টের অবসান হয়।
কলেজের অধ্যক্ষ জেনারেল শাখায় নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও বিগত ২০০৪ সালে কারিগরি শাখায় এমপিওভুক্ত হয়ে বিগত ২০০৪ সালের মে মাস হতে বিগত ২০১০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত বেতন ভাতা নেন ঈমাম হোসেন মো. ফারুক। তার বিরুদ্ধে আরো কিছু দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ পান কলেজ কর্তৃপক্ষ। পরে তিনি স্বেচ্ছায় বিগত ২০১০ সালের (৮ মার্চ) অধ্যক্ষের পদ থেকে অব্যহতি নিয়ে একই সালের (১ এপ্রিল) উত্তরার ক্রিডেন্স কলেজে অধ্যক্ষের চাকরি নেন এবং ৮ মাস পর পদত্যাগ করেন। বিগত ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন টাঙ্গাইল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান খান ফারুকের মাধ্যমে জেনারেল শাখায় যোগদান করেন। বিগত ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তার এমপিও চালু হয় এবং বিগত ২০১৮ সারের মে মাস থেকে বেতন শুরু হয় বলে জানা গেছে। যোগদানের পর তিনি কলেজে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে প্রায় ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন বলে নাসির উদ্দিন বাবলু অভিযোগ করেছেন। এ নিয়ে অধ্যক্ষ ঈমাম হোসেন মো. ফারুক এবং প্রতিষ্ঠাতা দাবিদার নাসির উদ্দিন বাবলুর সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
এরই মধ্যে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কলেজের ৪০টি গাছ কাটা এবং পুরাতন একটি টিনসেড ঘর একক সিদ্ধান্তে বিক্রির অভিযোগে আদালতে মামলা করেন নাসির উদ্দিন বাবলু। কলেজ অধ্যক্ষ ঈমান হোসেন মো. ফারুকের নানা অনিয়ম দুর্র্নীতির বিরুদ্ধে কলেজ অভ্যন্তরীণ চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা তার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।
বিগত ২০২৪ সালের (৫ আগস্ট) অধ্যক্ষ ঈমাম হোসেন মো. ফারুক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের সাথে গণভবনে যান এবং বিক্ষোভ করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শিক্ষকদের একটি অংশ, স্থানীয় লোকজন এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে অধ্যক্ষ ঈমাম হোসেন মো. ফারুকের কলেজে যাওয়া বন্ধ হয়। তারপর থেকে গত দুই বছর তিনি কলেজে না গেলেও বেতন পাচ্ছেন নিয়মিত এবং কলেজের অনেক কিছুই এখনো তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। চলতি বছর উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির ক্ষেত্রেও অধ্যক্ষের জন্য ভোগান্তি পোহাতে হয় ভর্তি কার্যক্রমের সাথে দায়িত্বপ্রাপ্তদের।
কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষের এই বিরোধের কারনে কলেজের শিক্ষার পরিবেশে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের চেয়ে কমে গেছে। এইচএসসির ফলাফলও আগের চেয়ে অনেক নিম্নমুখী হয়েছে। আগে যেখানে ওই কলেজ থেকে শতকরা ৯০ বা তার বেশি পাশ করেছে আর গত বছর পাস করেছে শতকরা ৬১ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র একজন। গত বছর সাধারণ শাখার একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয় ৮৬ জন শিক্ষার্থী, এবছর ভর্তি হয়েছে ৭১ জন। কারিগরি শাখার একাদশ শ্রেণিতে গত বছর ভর্তি হয়েছে ৭১ জন আর এবছর ভর্তি হয়েছে ৬২ জন এবং কৃষি ডিপ্লোমা শাখায় গত বছর ভর্তি হয়েছে ৬৫ জন আর এবছর ভর্তি হয়েছে মাত্র ৭ জন। শিক্ষকদের জবাবদিহিতা করার মত কোন জায়গা নেই। তাদের মধ্যেও গাছাড়া মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা বলছেন। এ অবস্থায় কলেজটি তার সুনাম হারাতে বসেছে।
এদিকে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা দাবিদার নাসির উদ্দিন বাবলু বিভিন্ন সময় কলেজের তহবিল হতে ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৩০০ টাকা কোন রেজুলেশন ছাড়া নিয়ম বহির্ভূতভাবে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন অধ্যক্ষ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, প্রতিষ্ঠানের কথা চিন্তা না করে প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ এক অপরকে দুষারোপ করে নানা রকম কাজ করে যাচ্ছেন। এতে কলেজের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছ বলে তারা দাব করেন।
এ ব্যাপারে নাসির উদ্দিন বাবলু বলেন, কলেজের জন্য জমি ক্রয় বাবদ এই টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে কলেজের নামে ২৬ শতাংশ জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া সস্পন্ন করেছেন বলে জানান। অধ্যক্ষ ঈমাম হোসেন মো. ফারুক স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে কিভাবে আবার এই কলেজে আসলো এবং কলেজে না এসে অবৈধভাবে দুই বছর ধরে বতন ভাতা নিচ্ছে। তিনি কলেজে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে এবং কলেজের গাছ ও টিনের ঘর বিক্রি করে কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন। আমরা এর বিচার চাই। আপনি রেজুলেশন ছাড়া কলেজ ফান্ড থেকে কিভাবে টাকা নিলেন জানতে চাইলে বলেন, কলেজে জমি কেনার জন্য নিয়েছেন এবং জমি দিয়েছেন। কমিটি হলে রেজুলেশন করা হবে বলে তিনি জানান।
অধ্যক্ষ ঈমাম হোসেন মো. ফারুকের সাথে যোগাযোগ কথা হলে তিনি বলেন, তৎকালীন সভাপতি জনবল নিয়োগ দিয়েছেন। নাসির উদ্দিন বাবলু কলেজের প্রতিষ্ঠাতা দাবি করেন, তবে নির্বাহী প্রধান বা নীতি নির্ধারক নন। মব সৃষ্টি করে দুই বছর ধরে আমাকে কলেজে যেতে দিচ্ছেন না। আমি কলেজের বাইরে থাকায় নাসির উদ্দিন অবৈধভাবে কলেজ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করছেন। আমি নিয়মিত সরকারি বেতন পাচ্ছি এবং আমার স্বাক্ষরেই কলেজের শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন হচ্ছে এবং অনেক কাজ পরিচালিত হচ্ছে। আমি কলেজে যোগদান করতে পারলে কলেজের সুনাম ফিরিয়ে আনতে পারবো।
কলেজের অধ্যক্ষ পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রভাষক তাজুল ইসলাম বলেন, নাসির উদ্দিন বাবলু কলেজ ফান্ড থেকে বিভিন্ন সময়ে ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৩০০ টাকা নেন। শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। পরে তারা টাকা ফেরতের দাবি জানালে নাসির উদ্দিন বাবলু ২৬ শতাংশ জমি স্ট্যাম্পে লিখে দেন। শুধু স্ট্যাম্পে লিখে দেয়ার বিষয়টিও তারা মেনে নিতে পারেননি। পরে তিনি টাঙ্গাইলে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এই জমি লিখে দেন।
এ ব্যাপারে মির্জাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জুলফিকার হায়দার বলেন, কলেজের অবস্থা বেশ জটিল। আমার প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছি। পরস্পর বিরোধী মামলার কারনে বিষয়টি বেশি জটিল আকার ধারণ করেছে। তবু প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে কলেজটির সমস্যা সমাধানের জন্য।
এ বিষয়ে মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, কলেজের প্রতিষ্ঠাতা দাবিদার নাসির উদ্দিন বাবলু আদালতে মামলা করেছেন। মামলা নিস্পত্তি হলে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।





