স্টাফ রিপোর্টার ॥
দেশের সবচেয়ে জমজমাট ও বর্ণাঢ্য দুর্গাপূজার যে কয়টি আয়োজন হয়, তার অন্যতম একটি হয় টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায়। দানবীর রনদা প্রসাদ সাহার পূজা মণ্ডপে দেশি-বিদেশী অতিথিসহ হাজারও মানুষের ঢল নামে প্রতিবছর। এবারও পূজার আয়োজন হয়েছে রনদা প্রসাদ সাহার বাড়িতে। দানবীর রনদা প্রসাদ সাহা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কুমুদিনী কল্যাণ সংস্থা। এই কল্যাণ সংস্থার অধীনে পরিচালিত শিক্ষা ও সেবামূল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মীরা এই পূজার আয়োজন সফল করতে ভূমিকা রাখেন।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার পৈত্রিক বাড়িতে ১৯৪২ সাল থেকে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে রণদা প্রসাদ সাহা নিজে ১৯৪২ সালে এখানে প্রথম ধুমধাম করে দুর্গাপূজার প্রচলন করেন। লৌহজং নদীর তীরে অবস্থিত তাঁর এই বাড়ির পূজামণ্ডপটি টাঙ্গাইলের একটি ঐতিহ্যবাহী পূজামণ্ডপ হিসেবে পরিচিত। এলাকাবাসী জানায়, তোরণ নেই, নেই আলোকসজ্জা। প্রতিমা ও মণ্ডপটিও সাদামাটা। তবু সাদামাটা এ মণ্ডপটি দুর্গোৎসবের সময় এখনো মির্জাপুর তথা টাঙ্গাইলের মূল আকর্ষণ। রণদা প্রসাদ সাহার এ বাড়ির মণ্ডপ প্রায় ৮৪ বছরের ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে রয়েছে। আগে এখানে সবাই ক্ষুদ্র পরিসরে পূজা করতেন। এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৪২ সাল থেকে রণদা প্রসাদ সাহা এখানে ধুমধাম পূজা শুরু করেন।
মির্জাপুর উপজেলা সদরের উপর দিয়ে বয়ে গেছে লৌহজং নদ। এই নদের উত্তর প্রান্তে কুমুদিনী কমপ্লেক্স। এই কপ্লেক্সের মধ্যেই ভারতেশ্বরী হোমস, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং কলেজসহ শিক্ষা ও সেবামূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আর নদের দক্ষিণ প্রান্তে রনদা প্রসাদ সাহার পৈত্রিক বাড়ি। এই বাড়ির প্রাঙ্গণেই দেশের অন্যতম জৌলুসপূর্ণ দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। পূজার সময় কুমুদিনী কপ্লেক্স থেকে অতিথিদের নৌকার পাড় করে নেওয়া হয় উৎসব প্রাঙ্গণে।
কুমুদিনী কল্যান সংস্থার উপ পরিচালক (অপারেশনস) অনিমেষ ভৌমিক কলেন, প্রতিদিন আরতি, সাংস্কৃতি অনুষ্ঠান হচ্ছে। রাজনীতিক, কূটনীতিকসহ দেশি-বিদেশী অতিথি এবং এই অঞ্চল ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাধারণ অতিথিরা প্রতিবছর আসেন। এবারও অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছি আমরা। ভারতেশ্বরী হোমসের নৃত্য প্রশিক্ষক হারুন অর রশিদ বলেন, এবার পূজায় ৩০ জনের অধিক শিক্ষার্থী নৃত্য পরিবেশন করবেন। সঙ্গীত পরিবেশনেও থাকবেন প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী।
কুমুদিনী কল্যান সংস্থার মানব সম্পদ কর্মকর্তা অভিজিত সাহা বলেন, রণদা প্রসাদ সাহার বাগির সামনে ৬০ ফুট উঁচু নকহতখানা তৈরি করা হয়েছে। এন উপর থেকে সাঁনাইয়ের সুর বাজানো হয়। মন্দির প্রাঙ্গণে কথা হয় পাশ্ববর্তি আন্ধরা গ্রামের ৮২ বছর বয়স্ক নৃপেন চন্দ্র সূত্রধরের সাথে। তিনি বলেন, ছোট বেলা থেকেই এই পূজা দেখে আসছি। রনদা প্রসাদ সাহা জীবিত থাকতে পূজার চার দিন সামনের মাঠে শত শত মানুষের খাবারের আয়োজন করা হতো। পূজা উপলক্ষে নাচ-গান, যাত্রাপালার আয়োজন হতো। রনদা প্রসাদ সাহা নিজেও অভিনয় করতেন যাত্রাপালায়। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে উৎসব দেখতো। সবাই প্রসাদ পেতো।

মির্জাপুর সাহা পাড়া গ্রামের প্রবীন নারী নুপুর সাহা বলেন, এ বাড়ির পূজার অন্যতম বৈশিষ্ট হলো এর সব আয়োজনের সাথে নারীরা থাকেন। স্থানীয়রা জানায়, রনদা প্রসাদ সাহার পূর্বপুরুষেরাও বাড়িতে দুর্গাপূজা করতেন। তার বাবা দেবেন্দ্র নাথ পোদ্দারের সময়ে এসে আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় দুর্গাপূজা। শৈশবে মাতৃহারা হয়েছিলেন রনদা প্রসাদ সাহা। মাত্র ১৬ বছর বয়সে চলে যান কলকাতায়। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বেঙ্গল এম্বুলেন্স কোরে। কর্মস্থল ছিলো ইরাকে। যুদ্ধ শেষে কয়লার ব্যবসা শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেক প্রতিষ্ঠিত করেন। ত্রিশের দশকের শুরুতে আবার নিজের বাড়ির মন্দিরে জমজমাট আয়োজনে দুর্গাপূজা শুরু করেন। শুধু পূজা নয়, পূজাকে কেন্দ্র করে যাত্রাপালা, নাটক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন হতো। দরিদ্র মানুষের মাঝে বস্ত্র বিতরণ করতেন।
বিগত ১৯৭১ সালের (৭ মে) রণদা প্রসাদ সাহা ও তার ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। তারপর তারা আর ফিরে আসেনি। বিগত ১৯৭২ সালে তার বড় মেয়ে জয়াপতি কুমুদিনী কল্যান ট্রাস্টের দায়িত্ব নেন। তিনি তার বাবার মতোই আয়োজন অব্যাহত রাখেন। এখন রণদা প্রসাদ সাহার নাতি রাজীব প্রসাদ সাহা কুমুদিনী কল্যান ট্রাস্টের চেয়ারম্যান। তিনিও দাদুর মতো পূজার বর্ণাঢ্য আয়োজন করছেন। রনদা প্রসাদ সাহার পূত্রবধূ শ্রীমতি সাহা ‘রণদা প্রসাদ সাহা স্মারক গ্রন্থে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে লিখেছেন, পূজার সময় দেখেছি সব শ্রেণির হাজার হাজার মানুষের সম্মিলন। পাঁচ দিন ধরে চলতো খাওয়া দাওয়া, সেই সঙ্গে যাত্রাপালা বিনোদন। অপার আনন্দ, পূজা উপলক্ষ মাত্র। বাবা (রণদা প্রসাদ) বলতেন, মানুষ ও মানুষে এই যে মহা মিলন- এইতো পূজার আনন্দ।
কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষ জানান, ৮৪ বছরের ঐতিহ্য বহন করছে পূজামণ্ডপটি। সাদামাটা পূজামণ্ডপটি এখনো দেশের অন্যতম আকর্ষণ। এ বছরও ভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী ছাড়াও দেশি-বিদেশি অতিথিরা মণ্ডপটিতে আসছেন পূজা দেখতে।