
মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল ॥
বাংলাদেশ এক অভূতপূর্ব এবং জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণ পার করছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্য দিয়ে দেশে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন এলেও জনমানসের উদ্বেগ আর রাজপথের ধোঁয়াশা পুরোপুরি কাটেনি। বিশেষ করে বছর ঘুরে আরেকটি ‘ডিসেম্বর’ যত ঘনিয়ে আসছে, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আড্ডায় ‘ডিসেম্বরে কী হতে যাচ্ছে’- এই প্রশ্নটি সাধারণে নানামুখী গুঞ্জন, গুজব আর গভীর আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘ডিসেম্বর’ মাসটি সবসময়ই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার পতন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বছরগুলোর নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন এই মাসেই দানা বেঁধেছে। চলমান প্রেক্ষাপটে শাসক দলগুলোর আত্মবিশ্বাস, নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রত্যাবর্তনের প্রোপাগান্ডা এবং খেটে খাওয়া মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রার চরম সংকট- এই তিন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ডিসেম্বরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা জরুরি।
বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা দলগুলোর নীতিনির্ধারণী পর্যায় এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে, ডিসেম্বরে কোনো ধরণের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নেই। তাদের যুক্তি ও অবস্থান মূলত কয়েকটি স্তরে বিন্যস্ত: যেমন- (ক) প্রশাসনিক সুসংহতি: অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের নির্বাচনী ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরায় চালু হয়েছে এবং একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব পালন করছে। পুলিশ, এসআরবি(র্যাব) এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেইন অব কমান্ড এখন অনেকটাই পুনর্বিন্যস্ত ও সুসংহত। ফলে রাজপথে যেকোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা বা অপতৎপরতা কঠোরভাবে দমন করতে প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। (খ) রাজনৈতিক শূন্যতার অবসান: সরকারি দলের নেতারা বলছেন, বিগত বছরগুলোতে বিরোধী শিবিরের যে ক্ষোভ বা রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা যেত, নির্বাচিত সরকার আসায় তা এখন আর নেই। জনগণের একটি বড় অংশের ম্যান্ডেট সরকারের পক্ষে রয়েছে। (গ) পর্দার আড়ালের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ: তবে দৃশ্যমান এই আত্মবিশ্বাসের ভেতরেও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরণের পারস্পরিক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও অবিশ্বাস চলছে। অতি সম্প্রতি ঢাকার শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে পর্দার আড়ালে নিষিদ্ধ বা সাবেক ফ্যাসিবাদী শক্তির সাথে সমঝোতা কিংবা এককভাবে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অভিযোগ তুলছেন। একে অপরকে রাজপথে প্রতিহত করার রাজনৈতিক হুংকার চললেও, তারা কেউই মনে করছেন না যে দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলার কোনো বড় বিপর্যয় ঘটবে। তাদের মূল লক্ষ্য ডিসেম্বরের সম্ভাব্য জমায়েতগুলোকে ঘিরে নিজেদের শক্তির মহড়া দেওয়া।
চলমান রাজনৈতিক বিতর্কে সবচেয়ে বড় কৌতুহল ও গুঞ্জন তৈরি করছে সাবেক স্বৈরাচারী শাসক দল ও বর্তমানে রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বক্তব্য ও প্রচারণা। দলটির তৃণমূল, পলাতক নেতাকর্মী এবং বিশেষ করে প্রবাসী একটি বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করছে যে, ডিসেম্বরেই তাদের নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসবেন। আন্তর্জাতিক কিছু সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনাও চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশে ফেরার একটি সম্ভাব্য সময়সীমার কথা ঘোষণা করেছিলেন। দলটির নেতাকর্মীরা কর্মীদের চাঙ্গা রাখতে বিশ্বাস ছড়াচ্ছেন যে, তিনি ‘বীরের বেশে’ দেশে ফিরে সরাসরি দলের হাল ধরবেন এবং রাজনীতির চিত্র বদলে দেবেন। তবে নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং আইনি উপদেষ্টারা এই দাবির পেছনে কোনো বাস্তব ভিত্তি দেখছেন না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং দেশের বিভিন্ন আদালতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধসহ একাধিক গুরুতর মামলায় সাজা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বহাল রয়েছে। বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ভারত থেকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। আইনি ও বাস্তব প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি যদি কোনোভাবে দেশের সীমান্তে বা বিমানবন্দরে উপস্থিত হন, তবে তাকে তৎক্ষণাৎ গ্রেপ্তার করে সরাসরি আইনি হেফাজতে বা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হবে। রাজপথে তাকে ‘বীরের বেশে’ স্বাগত জানানোর মতো সাংগঠনিক শক্তি বা জনসমর্থন বর্তমানে দলটির নেই বলে অনেকেই মনে করেন। ফলে, এই প্রচারণাটি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল হতে পারে। যার উদ্দেশ্য, ঝিমিয়ে পড়া নেতাকর্মীদের ধরে রাখা এবং বর্তমান সরকারের ওপর একটি কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করা।
সবচেয়ে সংবেদনশীল, চিন্তার খোরাক এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য বিপদের সংকেত জোগাচ্ছে এদেশের সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে খেটে খাওয়া দিনমজুর, রিকশাচালক, তৈরি পোশাক শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিভঙ্গি। এই বিশাল শ্রেণীর মানুষ রাজনীতির তাত্ত্বিক সংস্কার বা গণতন্ত্রের সংজ্ঞার চেয়ে প্রতিদিনের বাজারের থলে, পকেটের টাকা আর ব্যবসার লাভ-লোকসান দিয়ে দেশের পরিস্থিতি বিচার করেন। কৃষিপ্রধান এই দেশে ডিসেম্বরের রবিশস্য ও বোরো মৌসুমকে সামনে রেখে মাঠপর্যায়ে সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ডিলারদের কারসাজি এবং আমদানির ধীরগতির কারণে প্রান্তিক কৃষকেরা চড়া দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন- যা আগামি দিনের খাদ্য সুরক্ষাকে হুমকির মুখে ফেলছে। অতি সম্প্রতি জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন খরচ এবং শিল্প উৎপাদন ব্যয় এক লাফে অনেক বেড়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। মূল্যস্ফীতির এই আগুনে পুড়ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কেনাবেচায় ভয়াবহ মন্দা চলছে- কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা একদম কমে গেছে। পোশাক খাতের ধারাবাহিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক অর্ডারের ঘাটতির কারণে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও জনমত বিশ্লেষণ করলে তাদের গভীর অসন্তোষের কয়েকটি মূল কারণ ফুটে ওঠে: (১) চরম অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতি: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের (চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ) উচ্চমূল্য ক্ষুদ্র আয়ের মানুষের জীবনকে ওষ্ঠাগত করে তুলেছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা তাদের সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কেনাবেচায় ভয়াবহ মন্দা চলছে। (২) গার্মেন্টস খাতের ধারাবাহিক সংকট: বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতে গত কয়েক মাস ধরে চলা অস্থিরতা, শ্রমিক অসন্তোষ এবং আন্তর্জাতিক অর্ডারের ঘাটতির কারণে অনেক মাঝারি ও ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা লে-অফ ঘোষণা করা হচ্ছে। এর ফলে তৈরি পোশাক শ্রমিক এবং এর ওপর নির্ভরশীল ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ব্যবসাগুলো মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছে। (৩) বিদেশি সহায়তার ধীরগতি: সাধারণ মানুষের মধ্যে এবং অর্থনৈতিক মহলে একটি বড় হতাশা রয়েছে- নতুন সরকার আসার পরও দেশ আশানুরূপ বড় ধরণের বিদেশি আর্থিক সহায়তা, বেলআউট প্যাকেজ বা নতুন কোনো বড় বিনিয়োগ টানতে পারছে না। রেমিট্যান্সের প্রবাহ ইতিবাচক হলেও তা এই বিশাল অর্থনৈতিক গর্ত পূরণের জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না। (৪) বিকল্প হিসেবে ‘সেনা শাসনের’ গুঞ্জন: রাজনীতি নিয়ে চরম হতাশ এবং অর্থনৈতিকভাবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন প্রকাশ্যেই বলতে শুরু করেছে ‘দেশের অবস্থা ভালো নেই’। তারা আশঙ্কা করছেন, এই অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা যদি ডিসেম্বরের রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে সহিংসতায় রূপ নেয়, তবে দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে এবং জানমালের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী সরাসরি হস্তক্ষেপ বা শাসনভার গ্রহণ করার পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
সাধারণ মানুষের এই সেনা শাসনের গুঞ্জন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ বা সামরিক প্রীতির কারণে নয়; বরং এটি চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা থেকে উদ্ভূত একটি মনস্তাত্ত্বিক বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে- যখনই বেসামরিক রাজনীতি সাধারণ মানুষের মৌলিক অর্থনৈতিক ও জানমালের নিরাপত্তা দিতে হিমশিম খায়, তখনই অবদমিত জনমনে অরাজনৈতিক বা সামরিক ব্যবস্থার প্রতি একটি সাময়িক মোহ তৈরি হয়। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান ভূ-রাজনীতি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যের শর্ত এবং খোদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্বের কারণে সরাসরি সামরিক শাসনের বা সামরিক অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। তবে জনমানসের এই গুঞ্জন বর্তমান নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি মারাত্মক রেড অ্যালার্ট বা সতর্কবার্তাও বটে। সামগ্রিক রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সূচক এবং মাঠপর্যায়ের সামাজিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগামি ডিসেম্বরে বাংলাদেশে কোনো আকস্মিক ‘শাসন পরিবর্তন’ বা ‘মহাবিপর্যয়ের’ কোনো বাস্তব পূর্বাভাসের আশঙ্কা নেই। তবে রাজপথের রাজনীতিতে কিছুটা উত্তাপ ছড়াবে। নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা দলগুলো বিচ্ছিন্নভাবে ঝটিকা মিছিল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে এক ধরণের কৃত্রিম আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। তবে সেটিকে প্রতিহত করার মতো সাংগঠনিক সক্ষমতা মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর রয়েছে এবং প্রশাসনিকভাবে সরকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে থাকবে- এটাই বাস্তবতা।
ডিসেম্বরের আসল যুদ্ধটি রাজপথে কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে নয়, বরং সরকারের আসল যুদ্ধ নিজের ‘অর্থনীতি’র সাথে। সরকার যদি দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস, গার্মেন্টস খাতের অসন্তোষ স্থায়ীভাবে দূরীকরণ এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমন করতে না পারে- তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে জনমানসের এই অর্থনৈতিক হাহাকারই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করবে। পরিশেষে বলা যায়, ডিসেম্বরে বাংলাদেশের আকাশে গুজবের মেঘ জমলেও কোনো বড় রাজনৈতিক ঝড়ের আশঙ্কা কম। তবে টেকসই স্থিতিশীলতার জন্য সরকারকে রাজপথ পাহারার চেয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক সংস্কার এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকেই রাষ্ট্রীয় শক্তির শতভাগ মনোযোগ দিতে হবে। অন্যথায়, রাজনীতির মোড়ক পাল্টেও সাধারণ মানুষের ভাগ্য না পাল্টালে, জনঅসন্তোষ যেকোনো সময় নতুন সমীকরণের জন্ম দিতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।






