
ডেক্স রিপোর্ট ॥
কার্যক্রম নিষিদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের টাঙ্গাইল জেলা শাখার প্রয়াত সভাপতি ফজলুর রহমান খান ফারুক জেলার আওয়ামী রাজনীতিতে এক সময়ের প্রভাবশালী সিদ্দিকী পরিবার ও খান পরিবারের মধ্যে বিরোধ লাগিয়ে রাখতেন। আর এই দুই পরিবারের বিরোধের সুযোগ নিয়ে তিনি একক ভাবে টাঙ্গাইল আওয়ামী লীগ চালিয়েছেন। টাঙ্গাইল শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সহ সভাপতি ও জেলা বাস মিনিবাস মালিক সমিতির সাবেক মহাসচিব গোলাম কিবরিয়া বড় মনির টেলিফোনে কথোপকথনের একটি রেকর্ড ছড়িয়ে পড়েছে। রোববার (৩ মে) রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই রেকর্ড নিয়ে জেলার সর্বত্র চলছে আলোচনা। ওই কথোপকথনে গোলাম কিবরিয়া বড় মনিকে বলতে শোনা যায়- কীভাবে ফজলুর রহমান খান দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ লাগিয়ে একক রাজনীতি করতেন। এক সময় গোলাম কিবরিয়ার কাছে ফজলুর রহমান খান সেই বর্ণনা দিয়েছিলেন। টেলিফোনে কথোপকথনে গোলাম কিবরিয়া ফজলুর রহমানের উদ্বৃতি দিয়ে সে কথাই জানিয়েছেন অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তিকে। তবে ওই ব্যক্তিকে তা জানা যায় নি।
বিগত ২০২৪ সালে (৫ আগস্ট) শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান খান আত্মগোপনে চলে যান। আত্মগোপন অবস্থাতেই ওই বছর অক্টোবর মাসে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি জেলা পরিষদেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। তার ছেলে খান আহমেদ শুভ টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচতি হয়েছিলেন।
অপরদিকে যার কথোপকথন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সেই গোলাম কিবরিয়া বড় মনির টাঙ্গাইল শহর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। জেলার রজনীতিতে তিনি ফজলুর রহমান ফারুকের ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গত (৫ আগস্টের) পর তিনি ভারতে চলে যান। পরে সেখান থেকে জার্মান যান বলে তার ঘনিষ্ট সুত্র জানিয়েছে। গোলাম কিবরিয়া বড় মনি টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান ছোট মনিরের ভাই।
গোলম কিবরিয়া বড় মনি কার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন, তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। ওই রেকর্ডে গোলাম কিবরিয়া বড় মনিকে বলতে শোনা যায়, শোন ভাই একটা কথা কই, আমরা যাই করি খান পরিবারের রাজনীতির মূল বিরোধীতা করছে ফারুক সাব। তোমারে ব্যাখ্যা দেই, তুমি বুঝতে পারবা। ফারুক সাব নিজে কইছে আমারে যে, ‘মনি দেখো আমি একটা মানুষ। থানাপাড়া থাকি। আমার কোন গুন্ডা বদমাইস পোলাপান কিচ্ছু নাই। কিন্তু আমি টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগ নাচাইছি।
এরপর গোলাম কিবরিয়া বড় মনিকে বলতে শোনা যায়, কয়কি লোকটা (ফজলুর রহমান খান)। শোন, ‘লতিফ সিদ্দিকীকে আমি কোনদিন জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হবার দেই নাই। খান পরিবার-সিদ্দিকী পরিবারের মধ্যে বাজাইয়া রাখছি আমি ফারুক। কারণ যদি খান পরিবার ও সিদ্দিকী পরিবার এক হইয়া যায়, আমার মত ফারুক যেডি আছে যাইয়া গাতায় (গর্ত) পরতো। হয় সিদ্দিকী পরিবার সিনিয়র হইতো খান পরিবার তাগো জুনিয়র হইতো। অথবা খান পরিবার সিনিয়র হইতো মান্নান সাব, শামসুর রহমান খানরা সিনিয়র হইতো। কাদের সিদ্দিকী, লতিফ সিদ্দিকী জুনিয়র হইতো। হেরা হেরাই সব হইতো। শামসুর রহমান খান সভাপতি হইলে লতিফ সিদ্দিকী বা কাদের সিদ্দিকী সাধারণ সম্পাদক হইতো। তাগো দেওন লাগতো। এজন্য আমি ফারুক কোনদিন তাগো এক হইতে দেই নাই। এটা অসম্ভব। আর আমার সাথে কাম করছে মুকুল ভাই (মির্জা তোফাজ্জল হোসেন মুকুল, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি)। তারও কোন এলাকা নাই পোলাপান নাই। সেইও আওয়ামী লীগের নেতা আসিলো আমরা খালি সকালে এক কান কথা লাগাইছি বিকালে এক কথা লাগাইছি।’

বিগত ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর খান পরিবারের চাপে থাকা প্রসঙ্গে ফজলুর রহমান কি বলেছেন সে প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে গোলাম কিবরিয়া বড় মনিকে বলতে শোনা যায়, ফজলুর রহমান খান ফারুক তাকে বলেছে ‘ওয়াক্তে ওয়াক্তে কাকন (খান পরিবারের সন্তান, সাবেক সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানার ভাই) বাঁধা দিতো। তহন আমি চিন্তা করি আরে ভাই আমারতো অস্তিত্ব থাকে না, আমিতো পুতুল হইয়া গেলাম গা। আমি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, আমার কোন স্বাধীনতা নাই। পরে তোমরা আইলা, তোমরাতো বিরুদ্ধেই আছিলা। পরে চিন্তা করলাম, তোমরা নতুন পোলাপান আনাড়ী, নতুন নেতৃত্ব দিবা তোমাগো অনেক ভুল হবো। আমাকেই তোমাগো বাপ তোমাগো মা মানতে হবো।’
শেষের দিকে গোলাম কিবরিয়া বড় মনিকে বলতে শোনা যায়, ফজলুর রহমান খান ফারুক তাকে বলেছিলেন, বিগত ২০১৪ সালে খান পরিবার টাঙ্গাইল থেকে চলে যাওয়ার পর ১০ বছর আমি ফারুক এককভাবে টাঙ্গাইল আওয়ামী লীগ চালিয়ে গেছি। টাঙ্গাইলের ইতিহাসে আর কেউ পারে নাই। টাঙ্গাইলের জন্মের পর থেকে ১৯৭০ এর পর থেকে টাঙ্গাইলের ইতিহাসে কেউ এককভাবে রাজনীতি করতে পারে নাই।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্নস্তরের অন্তত ১০ জন নেতার সাথে। তারা প্রত্যেকেই এক মত প্রকাশ করে বলেন, টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী দুই পরিবার ছিলো খান ও সিদ্দিকী পরিবার। দলের মধ্যে কিছু নেতা এই দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে। এতে উভয় পরিবার রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সহ সভাপতি ও জেলা বাস মিনিবাস মালিক সমিতির সাবেক মহাসচিব গোলাম কিবরিয়া বড় মনির সাথে হোয়াট্স এ্যাপে কথা হয়। তিনি বলেন, তিনি জার্মানিতে আছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিও রেকর্ড তার। তিনি বলেন, টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মৃত্যুবরণ করেছেন। তারা তাদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক পন্থা অবলম্বন করেছেন। যা দলের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। ভবিষ্যতে যারা জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসবেন, তারা ব্যক্তিস্বার্থে দলের মধ্যে বিভাজন না করে বঙ্গবন্ধুর আর্দশে সংগঠন গড়ে তুলবেন- এই আশা করছি।
তথ্যসূত্র, দৈনিক প্রথম আলো।





